পাশ্চাত্যের এক খন্ড বাংলাদেশ

তখন অক্টোবর মাস। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে। এমন হাড়কাঁপানো শীতে দুর্গোৎসবে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ! সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এই উৎসবের আয়োজন চলবে তিন দিন। বঙ্গীয় পূজা পরিষদ, বাংলাদেশ পূজা পরিষদ আর আমরা সবার আয়োজিত শারদীয় দুর্গোৎসবের অনিন্দ্যসুন্দর এই আয়োজন, বিশাল আয়তনের তিন তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ভেন্যুতে। বঙ্গীয় পূজা পরিষদের পক্ষে অভিভাবকতুল্য প্রিয় সুহৃদ কিরণ বণিক শংকর দার আমন্ত্রণ, ‘আমরা সবাই’-এর পক্ষে উৎসব উদযাপন কমিটির কর্ণধার, সিলেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, কমিউনিটির অতি আপনজন রুপক দার বিনয়ী আবেদন, কোনটি-ই অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। প্রকৌশলী সুব্রত বৈরাগীর নেতৃত্বে আয়োজিত পূজা পরিষদের আমন্ত্রণ এটিতে অংশগ্রহণও সামাজিক দায়িত্ববোধের মধ্যেই পড়ে। তাই শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে, অনুসন্ধিৎসু হৃদয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি।

জেনেসিস সেন্টারের বিশাল হল রুম। কয়েক হাজার দর্শক অনায়াসে যে কোনো অনুষ্ঠান স্বাচ্ছন্দ্যে উপভোগ করতে পারে। প্রতিমা মন্দির তো আছেই, সঙ্গে রঙবেরঙের নানারকম দেশীয় খাবারের স্টল, পাশেই বিশাল আকারের অনুষ্ঠান মঞ্চ। সেখানেই বঙ্গীয় পূজা পরিষদের দুর্গোৎসবের আয়োজন। কেলগেরি শহরের পূর্ব-দক্ষিণে সাউথ ভিউ কমিউনিটি হল। বঙ্গীয় পূজা পরিষদ সেখানে দুর্গোৎসবের আয়োজন করেছে। উপাদেয় খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা হয় আমন্ত্রিত অতিথিদের। তিন দিনব্যাপী চলে নানারকম অনুষ্ঠান। পূজা মানেই ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতিকে বিশ্বমন্ডলে ছড়িয়ে দেওয়ার এ যেন এক প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা।

চৈত্রসংক্রান্তি আর বাংলা বর্ষবরণেও ছিল এমন জমকালো আয়োজন। ‘আমরা সবাই’ আয়োজিত বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানটি দেখে তো কবি নজরুলের সেই বিখ্যাত চরণটি-ই মনে পড়ে যায়, ‘গাহি সাম্যের গান যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান’।

ডিসেম্বর, বিজয়ের মাস। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আলবার্টা থেকে প্রকাশিত প্রথম বাংলা নিউজ পোর্টাল ‘প্রবাস বাংলা ভয়েস’ মহান মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানাতে আয়োজন করে ব্যতিক্রমী এক সংবর্ধনা ও স্মারক সম্মাননা অনুষ্ঠান। সেদিন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আবেগঘন স্মৃতিচারণে হলভর্তি দর্শক-শ্রোতারা যেন, একাত্তরের সেই দিনগুলোতেই ফিরে গিয়েছিল। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে বিসিএওসি আয়োজন করে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা। চিত্রাঙ্কন, আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কেলগেরি প্রবাসী বাংলাদেশিরা মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথাকে তুলে ধরে।

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও মহান শহীদ দিবস। বাংলাদেশ-কানাডা অ্যাসোসিয়েশন অব কেলগেরি (বিসিএওসি) এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে। কী নেই পাশ্চাত্যের শেষ সীমানার এই রূপনগরে! নজরুলপ্রেমী যেমন আছেন, রবীন্দ্রভক্তদের সংখ্যাটিও কম নয়। গড়ে উঠেছে টেগোর সোসাইটির মতো সৃজনশীল সংগঠন। মনমাতানো জনপ্রিয় শিল্পী আর কলাকুশলীদের সংখ্যাও কম নয়। নৃত্য, শিল্পকলায় আমাদের সংস্কৃতিকে সদা জাগ্রত রাখে মুক্ত বিহঙ্গের মতো নাট্যগোষ্ঠী। আর শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সেবায় নেপথ্যে থেকে প্রাণভরে আলো সঞ্চার করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সর্বজন শ্রদ্ধেয় মাহফুজুল হক মিনুর মতো গুণীজন। সেই সঙ্গে লেখালেখি আর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে সমাজ, সাহিত্য আর আমাদের জাতীয় মূল্যবোধকে উজ্জীবিত করতে নিয়মিত কাজ করেন প্রকৌশলী আবদুল্লা রফিক, সাইফুল ইসলাম রিপন, বায়াজিদ গালিব, অধ্যাপক কাজী খালিদ হাসানসহ একদল সৃজনশীল কলমসৈনিক।

শুধু সামাজিক আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডই নয়, কৃতী বাঙালিদের ব্যক্তিগত অর্জনেও গর্বিত হয় এ শহরের বাংলাদেশি কমিউনিটি। তাই তো জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে জুবায়ের সিদ্দিকীর হাতে কুইন এলিজাবেথ সম্মানসূচক এওয়ার্ড তুলে দেয় আলবার্টা সরকারের কর্মসংস্থান, অর্থনীতি ও উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী ব্রায়ান জিন, প্রকৌশলী মোহাম্মদ কাদির এপেকের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়ে আলবার্টার প্রকৌশল জগতে বাংলাদেশিদের কৃতিত্বকে তুলে ধরেন। কানাডার অর্থনীতির প্রাণ আলবার্টা প্রদেশ। এ প্রদেশের অর্থনীতির মূলে রয়েছে তেল ও খনিজ সম্পদ। বৃহত্তম রাজস্বের এই সেক্টরে বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও ভূতাত্ত্বিকদের অবদান তো সর্বজন স্বীকৃত। শিক্ষা, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় সরকার, ব্যাংক, বীমা, সেবা প্রশাসন, তথ্যপ্রযুক্তি, রিয়েল এস্টেট ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব সেক্টরেই আজ কৃতী বাঙালিদের সুস্পষ্ট অবস্থান দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। চিকিৎসা ও ওষুধ সেবা খাতের এক ডজনেরও বেশি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে, ড. ইব্রাহিম খান ও তার পরিবার তো এখন আমাদের গর্বিত কমিউনিটির আদর্শ। শিক্ষা উদ্যোক্তা ড. বাতেনকে অনুসরণ করে বাংলাদেশিদের ব্যবস্থাপনায় গড়ে উঠেছে দু-দুটি কমিউনিটি কলেজ। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা ও গবেষণায়ও বীরদর্পেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশি কমিউনিটির মেধাবী সদস্যরা।

গ্রীষ্মে জেগে উঠে শীতের দেশ কানাডা। বাংলাদেশিদের বৃহত্তম সংগঠন বিসিএওসিসহ সিলেট অ্যাসোসিয়েশন অব কেলগেরি, চট্টগ্রাম সমিতি, বগুড়া অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা সমিতি, কুষ্টিয়া সমিতি, কুমিল্লা সমিতি, নোয়াখালী অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও পেশাজীবী সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইগুলোর নানা রকম কর্মসূচিকে ঘিরে সরগরম হয়ে উঠছে কেলগেরির সবুজ শ্যামল মুক্তাঞ্চল। সেই সঙ্গে কমিউনিটির প্রতিটি অনুষ্ঠানে কৃতী গবেষক ও অধ্যাপক ড. রঞ্জন দত্ত ও ড. জেবুন্নেসা চপলার শিশুসন্তান পৃথিবী, প্রার্থনা আর প্রকৃতির গায়ে লাল-সবুজের মানচিত্র আর কণ্ঠে বাংলার গানের সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্যের নৃত্য যেন হতাশায় নিমজ্জিত দেশপ্রেমিকের হৃদয়ে আশার শিহরণ জাগিয়ে তোলে। জেরিন আর্ট স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের রংতুলিতে বাংলার রং, মুক্তিযুদ্ধ আর বাংলার শস্য প্রান্তরের প্রতিচ্ছবি, কবি আবীরের কণ্ঠে ‘স্বাধীনতা তুমি’-এর সবই তো বাংলাকে ভালোবাসার এক জ¦লন্ত প্রতিচ্ছবি। সত্যিই, সবকিছু মিলিয়ে এ যেন পাশ্চাত্যের কাক্সিক্ষত এক মিনি বাংলাদেশ!

লেখক : কলামিস্ট ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক
mahmud_dipu@yahoo.com