দেশের ক্রীড়াঙ্গনে অন্যতম বড় দুই মুখ রোমান সানা ও দিয়া সিদ্দিকী। আরচারিতে তারা জুটি বেঁধে দেশকে সাফল্যে ভাসিয়েছেন অনেকবার। সম্প্রতি দুজন জুটি বেঁধেছেন জীবনের ইনিংসেও। তিন বছর আগে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানো, নানা ঝড় সামলে কীভাবেই বা সেই সম্পর্কের চূড়ান্ত পরিণয়? দেশ রূপান্তরের তোফায়েল আহমেদকে দেওয়া যুগল সাক্ষাৎকারে সে-সবই বিস্তারিত বলছেন এই তারকা দম্পতি
অনেকদিন ধরেই জুটি বেঁধে খেলছিলেন। এবার জীবনেও জুটি। শুনতে চাই আপনাদের প্রেমের শুরুটা কীভাবে? রোমান, আপনিই বলুন প্রথমে...।
রোমান: শুরুটা ২০১৯ সালের শেষের দিকে। দক্ষিণ এশিয়ান গেমস (এসএ গেমস) থেকে ফিরে আমিই দিয়াকে প্রস্তাব দিই প্রথমে। জানেনই তো, মেয়েরা রাজি হতে চায় না (হেসে)। কত কিছু করে মানাতে হয়। আলহামদুলিল্লাহ, সবকিছু ব্যাটে-বলে মিলে গেছে। রিলেশনশিপটা তাই আগাতে থাকে। এই পথে ঝড়-ঝাপটাও অবশ্য কম যায়নি। অপেক্ষায় ছিলাম দিয়ার এইচএসসি পরীক্ষা কবে শেষ হয়। গত বছর ও পাস করার পর আমরা সম্পর্কটাকে সামাজিক পরিণতি দেওয়ার পরিকল্পনা করি। এরপর পরিবারের মাধ্যমেই প্রস্তাব নিয়ে যাওয়া হয়। আলহামদুলিল্লাহ। সবকিছু ঠিকঠাক মতো হয়েছে।
দিয়ার মুখে শুনতে চাই এবার...
দিয়া: জাতীয় দলে আসার পর আমি আসলে কারও সঙ্গে সেভাবে কথা বলতাম না। জুনিয়র ছিলাম, তাই চুপচাপ থাকতাম। ধীরে ধীরে সবার সঙ্গে একটু ফ্রি হতে শিখলাম। আমি এমনিতেই ভীষণ দুষ্টু। ওনার (রোমান) সঙ্গেও তখন টুকটাক দুষ্টামি করতাম। তবে খুব বেশি না। সিনিয়র হিসেবে সেই সম্মান এবং দূরত্বটা বজায় রাখতাম। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে প্রথম আন্তর্জাতিক গেম খেলি আমি। সেই গেম থেকে ওনার সঙ্গে বেশি ফ্রি হওয়া শুরু। পরে একদিন হুট করে তিনি আমার নম্বর নিলেন। যদিও আমি নম্বর দিতে চাইনি (হেসে)। পরে আমাদের নিয়মিত কথা হতে থাকল। এভাবে কখন যে সেটা ভালোলাগা ও ভালোবাসায় রূপ নিল, বুঝে উঠতেই পারিনি।
তাহলে প্রেমের প্রস্তাবটা রোমানই দিয়েছিলেন দিয়াকে?
দিয়া: হ্যাঁ। আমি অনেক মুডি একটা মেয়ে ছিলাম (হেসে)। ইগোও ছিল আমার মধ্যে। কোনো ছেলেকেই পাত্তা দিতাম না। রোমান সানা যে এত ভালো খেলত, তবু আমি ওনার সঙ্গে কথা বলতাম না।
তার মানে রোমানকে পাত্তাই দিতে চাননি!
দিয়া: আমি এরকমই ছিলাম। সবার সঙ্গে একটু ভাব নিয়ে চলতাম আরকি (হেসে)।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত রোমান আপনার মন জয় করেই ছাড়ল...
দিয়া: উনি কল দিয়ে কথা বলত। আমি আগে তাকে একরকম ভাবতাম। যেহেতু উনি অনেক ভালো খেলত। হয়তো ইগো বেশি হবে, অনেক রাগী হবে। কিন্তু পরে আমার ধারণাটা বদলে গেছে। কথা বলতে বলতে তার ক্যারেক্টারটা আমার ভালো লেগে গিয়েছিল। অনেক বেশি কেয়ারিং। সুন্দর করে কথা বলতে পারে। এক পর্যায়ে উনাকে আমার ভালো লেগে গেলেও কখনো বলিনি। উনি যখন অ্যাপ্রোচ করেছে, তখন বলেছি, আচ্ছা ঠিক আছে। তবে আমি একটা শর্ত দিয়ে রেখেছিলাম।
কী সেটা?
দিয়া: আমি বলেছিলাম, যদি বিয়ে করার ইচ্ছে থাকে তবেই আমি রিলেশন করব। যদি বিয়ের উদ্দেশ্য না থাকে তাহলে আমি রিলেশনে যাব না। কারণ আমার প্রথম থেকেই মনোভাব ছিল রিলেশন একটাই করব। যার সঙ্গে করব তাকে পিওর ভালোবাসব এবং তাকেই বিয়ে করব। আমি তাকে আমার কথাটা তাই বলেছিলাম, যদি মনে করেন বিয়ে করবেন না। তাহলে সম্পর্কে আগাবো না।
রোমান, ২০১৯ সাল তো খুব সুন্দর কেটেছে আপনার। মনের মানুষও ওই বছরই খুঁজে পাওয়া। আপনার মুখে শুনতে চাই, ভালোলাগাটা কীভাবে তৈরি হলো।
রোমান: সবকিছু হুট করেই হয়ে যায়। চিন্তাভাবনা ছিল না যে কোনো সম্পর্কে জড়াব। বলতে পারেন এটা অন্যরকমভাবে তৈরি হওয়া। যখন সম্পর্কে জড়ালাম, নিজেরাও আসলে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না কীভাবে কী হলো।
অনেকদিন ধরেই জুটি বেঁধে খেলছেন আপনারা। সম্পর্কে জড়ানোর প্রভাব কি খেলায় পড়েছে কখনো?
রোমান: নেতিবাচক প্রভাব কখনো পড়েনি। বরং ভালো হয়েছে। সাফল্যের দিক থেকে যদি দেখেন, মিক্স টিমে বাংলাদেশের সবচেয়ে সেরা সাফল্য দিয়া ও আমার হাত ধরেই। ওয়ার্ল্ড কাপে আমরা রুপা পেয়েছি। অলিম্পিকে খেললাম একসঙ্গে। মেয়েদের অনেকের সঙ্গে খেলার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। আমি মনে করি দিয়ার সঙ্গেই সবচেয়ে বেস্ট জুটি আমার।
দিয়া: আমার তো মনে হয় সম্পর্কের ইতিবাচক প্রভাবই পড়েছে। ২০১৯ সালে দুটি গেমে ভালো করার পরও এসএ গেমসের দলে আমার থাকা হয়নি। অনেকে তখন বলত হুট করে ভালো করে হারিয়ে গেছে। এই কথাগুলো খুব কানে বাজত। মনের মধ্যে তাই জেদ ছিল। করোনার সময়ের বিরতিতে সবকিছু নতুন করে শুরু করতে চেয়েছিলাম। ২০২১ সালের আগে আমি নিজেকে এমনভাবে তৈরি করেছি, যেন প্রত্যেকটা আন্তর্জাতিক আসরে আমি এক নম্বর হই। তখন থেকে আর আটকায়নি। আর উনার (রোমান) সঙ্গে আমার রিলেশন কিন্তু করোনার ওই সময়ে ছিল। তখন অবশ্য কেউ জানত না। ২০২১ সাল থেকে তো ধারাবাহিকভাবে আমার অর্জন আছে। তাই বলব সম্পর্কের নেতিবাচক প্রভাব এখন পর্যন্ত পড়েনি। আশা করব ভবিষ্যতেও পড়বে না।
রোমান, ঝড়-ঝাপটার কথা বলছিলেন শুরুতে। একটু বিস্তারিত বলবেন...
রোমান: একটা রিলেশনে মনোমালিন্য, ঝগড়াঝাটি থাকতেই পারে। ন্যাচারাল একটা বিষয়। ওগুলো ভুলে এখন নতুনভাবে জীবন শুরু করেছি। ঝগড়াঝাটি বরং ভালোবাসা আরও বাড়ায় বলে বিশ্বাস করি। এগুলো ছোট্ট বিষয়। তেমন বড় কিছু না।
দিয়া কী বলবেন...
দিয়া: সম্পর্কের ক্ষেত্রে তো অনেক কিছুই হয়। একটা ব্যাপার কি, উনি আমাকে নিয়ে খুবই সিরিয়াস। অনেক বেশি পজেসিভ মাইন্ডের। তাই ছোট ছোট জিনিস নিয়েও হয়তো আমার সঙ্গে রাগারাগি করত। এসব নিয়ে ঝামেলা হতো। তবে এখন তেমন কিছু হয় না (হেসে)।
খেলার জুটিতে দিয়াকে সেরা বললেন রোমান। বউ হিসেবে দিয়াকে কেমন মার্কস দেবেন?
রোমান: সে সবদিক থেকেই খুব কেয়ারিং। আর পড়াশোনা, খেলাধুলা, রান্না কোনো দিকেই তার কোনো কমতি নেই।
দিয়া কী বলবেন রোমানকে নিয়ে?
দিয়া: অবশ্য ভালো। আমি বলব খুবই ভালো। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আমাকে জানে ও বুঝে। এতটুকুই আমার জন্য অনেক। তবে ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি একটু ইন্ট্রোভার্ট। আমি আবার এক্সট্রোভার্ট।
দুজনের স্বপ্নের কথা দিয়ে শেষ করতে চাই...
দিয়া: আগে ইচ্ছা ছিল আমি যেন অলিম্পিকে খেলতে পারি। সেই স্বপ্ন তো পূরণ হয়েছে। এখন স্বপ্ন দুজন একসঙ্গে যেন অলিম্পিকে পদক জিততে পারি।
রোমান: চাওয়া একটাই, সুন্দরমতো লাইফটা সেটল হোক। যেন সুখেশান্তিতে থাকতে পারি। খেলোয়াড়ি জীবনটাও যতটা সম্ভব আরও সুন্দর করতে চাই।