সংকটের সমাধান ‘উত্তরণ’

করোনা মহামারীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী আর্থিক সংকটে পড়ে যান। এই সংকট এতই তীব্র যে, তাদের অনেকেই অনাহারে দিন কাটাচ্ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি জেনে এগিয়ে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষার্থী। তখনও জানতেন না এই সমস্যার সমাধান কী। কিন্তু পথ চলতে চলতেই সৃষ্টি করেছেন পথ, বের করেছেন সংকট থেকে উত্তরণের পথ। ইচ্ছা থাকলে যে উপায় হয়ই, তারই দৃষ্টান্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংকটের সহায়তা প্রদানকারী সংগঠন ‘উত্তরণ’। সংকটের সমাধানের নাম এখন ‘উত্তরণ’। লিখেছেন অহিদুল ইসলাম অন্তর

‘মানুষ মানুষের জন্যে/জীবন জীবনের জন্যে

একটু সহানুভূতি কি/মানুষ পেতে পারে না, ও বন্ধু’- ভূপেন হাজারিকার কালজয়ী গান। বিখ্যাত সেই গানের সুরে সুর মিলিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন তরুণ। তারা আর্থিক ও মানসিক সংকটাপন্ন শিক্ষার্থীদের প্রতি বাড়িয়ে দিয়েছেন সহযোগিতার হাত। তারা তাদের সংগঠন ‘উত্তরণ’-এর মাধ্যমে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আর্থিক ও মানসিক সহযোগিতা করেন। তাদের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ‘উত্তরণ’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক।

যেভাবে উত্তরণ-এর শুরু

কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে প্রায় দুবছর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার পর চালু হয় স্বাভাবিক কার্যক্রম। পরিবর্তন আসে শিক্ষার্থীদের আয়ের উৎসেও। টিউশনি অথবা খ-কালীন চাকরি করে পড়াশোনার খরচ চালানো বহু শিক্ষার্থীর হাতছাড়া হয়ে যায় একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম। আবার অনেকে পরিবার থেকে পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা না পেয়ে অর্ধাহারে বা অনাহারে দিনযাপন করছিলেন। কেউবা দিন কাটাচ্ছিলেন শুধু ডাল-ভাত খেয়ে। আর্থিক সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়ে এসব শিক্ষার্থী। নিরুপায় হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পেজে জানান দেয় তারা। খাবারের অভাবে পড়াশোনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে, এমন খবরে মর্মাহত হন যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী নুর নবী রবিন। শিক্ষার্থীদের এই সাময়িক সংকটে এগিয়ে আসেন তিনি। যোগ দেন একই বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মাহমুদুল হাসান মারুফ। তিন তরুণ শিক্ষার্থীর এমন কার্যক্রমে আশার আলো দেখান যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম। যৌথভাবে গঠন করেন স্বেচ্ছাসেবী প্ল্যাটফরম উত্তরণ। খাবার প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যাত্রা শুরু উত্তরণের। সক্রিয় কর্মীর সংখ্যা এখন ২০ জনের মতো। এ পর্যন্ত এক হাজারেরও অধিক শিক্ষার্থীকে প্রায় দুই লাখ টাকার সহায়তা দিয়েছে উত্তরণ।

প্রথম প্রকল্প

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খাবারের অভাবে ভুগবে এমনটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না উত্তরণের প্রধান সমন্বয়ক নুর নবী রবিন ও তার সংগঠনের অন্যরা। তাই খাবারের সমস্যা সমাধান চেষ্টার মাধ্যমে উত্তরণের কার্যক্রম শুরু করেন তারা। অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের সংকোচ কাটাতে বেছে নেন সাহায্যের ভিন্ন পন্থা। সরাসরি আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্ন হলের ডাইনিংয়ে শিক্ষার্থীদের খাবার বিল পরিশোধ করে যাচ্ছে উত্তরণ। পবিত্র রমজান মাসে বিনামূল্যে চালু রেখেছিলেন ইফতারি ও সেহেরি কার্যক্রম।

উত্তরণের কার্যক্রম

প্রথম দিকে শুধু খাবার প্রকল্পের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে যুক্ত হয় অন্যান্য প্রকল্প। শিক্ষার্থীদের যে কোনো ধরনের সংকটে পাশে থাকতে চায় উত্তরণের উদ্যোক্তারা।

আয়েশা সিদ্দিকা শিক্ষা মেধাবৃত্তি

অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের আর্থিক সাহায্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বৃত্তি পেতে সহায়তা করতেন উত্তরণের উপদেষ্টা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। পরে উত্তরণ গঠন করেছে বার্ষিক শিক্ষাবৃত্তি প্রকল্প। এই শিক্ষাবৃত্তির আওতায় রয়েছে টিউশন ফি, পরীক্ষার ফি, ফরম ফিলাপসহ একজন শিক্ষার্থীর এক বছরের যাবতীয় খরচ। প্রতি বছরে পাঁচজন অসচ্ছল শিক্ষার্থীকে এই শিক্ষা মেধাবৃত্তি দেওয়া হয়।

জরুরি রক্তদান সেবা

জরুরি রক্তের প্রয়োজনে যেকোনো শিক্ষার্থীর সংকটে এগিয়ে আসেন তারা। দ্রুত চেষ্টা করেন রক্ত সরবরাহ করার। এ জন্য উত্তরণের রয়েছে আলাদা প্রকল্প ও সমন্বয়ক।

মানসিক সেবা

কভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সে সময় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় আত্মহত্যা প্রবণতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কাউন্সিলিং সেবা না থাকায় এই সংকটেও হাত বাড়ায় উত্তরণ। মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাউন্সিলিং সেবার মধ্যস্থতা করে যাচ্ছেন তারা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কাউন্সিলিং শুরু হলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প স্থগিত রাখবে উত্তরণ।

টিউশন সেবা

অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের তালিকা করে টিউশন সেবা দিয়ে যাচ্ছে উত্তরণ। এতে করে শিক্ষার্থীরা আর্থিক সংকট থেকে মুক্তি পাচ্ছে। পাশাপাশি সংগঠনেও অনুদান প্রদান করে অন্যদের পাশে এগিয়ে আসছে।

সচেতনতামূলক কর্মকান্ড

বিভিন্ন সচেতনতায় উত্তরণকে এগিয়ে আসতে দেখা গেছে। সম্প্রীতি ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্যাম্পাসে সচেতনতামূলক কর্মকান্ড চালাচ্ছে উত্তরণ।

আইটি উদ্যোক্তা তৈরি

আইটি সেবায় প্রশিক্ষণ কিংবা ব্যাংক থেকে ঋণের ব্যবস্থা করে শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী করে গড়ার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। খুব শিগগিরই উত্তরণ বাস্তবায়ন করবে আইটি সেবা প্রকল্প। ইতিমধ্যে আইটি সেবা প্রকল্প হাতে নিয়েছে তারা।

আর্থিক ব্যয়ের উৎস

উত্তরণের আর্থিক ব্যয়ের উৎস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সাবেক শিক্ষার্থীরা। প্রতি মাসের খরচের হিসাব অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবক ও উপদেষ্টা শিক্ষকরা আর্থিক অনুদান প্রদান করেন। এই অর্থ দিয়েই চলছে উত্তরণের কার্যক্রম। উদ্যোক্তারা মনে করেন শিক্ষার্থীদের এই সংকট সাময়িক। সংকট শেষে একদিন সেবাগ্রহীতারাও সেবা দিয়ে যাবেন। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষকের দান করা পুরস্কারের অর্থে এগিয়ে যাচ্ছে উত্তরণ।

উত্তরণকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা এবং যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক শওকত আরা বেগম, চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ফরিদউদ্দীন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এসএম মনিরুল হাসান, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাধব দাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সেকান্দর চৌধুরী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শহীদুল হকসহ অন্যান্য শিক্ষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। তা ছাড়া প্রতি মাসের খরচের হিসাব অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবক ও উপদেষ্টা শিক্ষকরা আর্থিক অনুদান প্রদান করেন। এসব অর্থ দিয়েই চলছে উত্তরণের কার্যক্রম। উল্লেখ্য, গত বছর উত্তরণের সেবা নেওয়া এক শিক্ষার্থী এ বছরই সাহায্য করেছেন উত্তরণকে। প্রাপ্ত অর্থের প্রায় পুরোটা দিয়ে খাবার বিল পরিশোধ করা হয়। বিভিন্ন বিশেষ ইভেন্ট যেমন ইফতার, সেহরির বা শীতবস্ত্রের জন্য কেউ অর্থ পাঠালে সেই অর্থের পুরোটাই সেই নির্দিষ্ট ইভেন্টে ব্যয় করা হয়।

উদ্দেশ্য

অর্থের অভাব, খাদ্যের অভাব কিংবা মানসিক চাপে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা যেন বিঘিœত না হয় সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে উত্তরণ। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা প্রসারে সর্বোচ্চ সহায়তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কাজ করছে তারা। শিক্ষার্থীদের কল্যাণই উত্তরণের একমাত্র লক্ষ্য। এ জন্য তারা প্রচারবিমুখ। কার্যক্রম অনেক হলেও নেই কোনো তার আলোকচিত্র। তাছাড়া সেবাগ্রহীতা শিক্ষার্থীদের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয় তাদের। তাই ছবি তোলার বিষয়টি এড়িয়েই যান তারা। নিঃস্বার্থভাবে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

কাজ করার পরিধি আরও বৃদ্ধি করার ইচ্ছা আছে তাদের। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও ভবিষ্যতে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যক্রম বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে উত্তরণের। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে চাইলে স্বাগত জানাবেন তারা।

নুর নবী রবিন জানান, এটি কোনো পরিকল্পিত উদ্যোগ ছিল না। আমাদেরই একজন ভাই বা বোন না খেয়ে থাকবেন এটি মেনে নিতে পারিনি। সে জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া। এটি যে এত বড় একটি সংগঠন বা প্ল্যাটফরম হয়ে উঠবে বুঝতে পারিনি বা আশা করিনি। আমরা কোনো প্রত্যাশা ছাড়া কাজ শুরু করেছি। কিন্তু সৎ উদ্দেশ্য জেনে অনেকেই স্বাগত জানিয়েছেন। ভালোবেসে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমরা শিক্ষার্থীদের নতুন যেকোনো সমস্যা জানলে সেটির সমাধান খুঁজি, উত্তরণ এভাবেই কাজ করে। ভবিষ্যতেও এভাবেই এগিয়ে যাবে, সংকট থেকে উত্তরণের চেষ্টা করবে।

সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে এলে যে যূথবদ্ধতার শক্তি যেকোনো সংকটকে পরাহত করতে সক্ষম তা প্রমাণ আবারও করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘উত্তরণ’।