মাঠের উত্তাপ ছড়াল বাইরেও

দিনটা শ্রাবণ মেঘের হলেও রোদটা চৈত্রদিনের মতোই। ভরদুপুরে ছায়াহীন ২২ গজে হেলমেট মাথায় দাঁড়িয়ে থাকলে মগজটা ফুটতে বাধ্য। হারমানপ্রিত কৌরের বুঝি মাথাটা একটু বেশিই গরম হয়েছিল। নাহিদা আক্তারের বলে আউট হওয়ার পর ক্ষোভে ব্যাটের আঘাতে ভাঙেন স্টাম্প। এজন্য বড় শাস্তি অপেক্ষা করে আছে জেনেই কি ম্যাচশেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এতটা কড়া মন্তব্য ভারতীয় অধিনায়কের? আম্পায়ারদের নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন হারমানপ্রিত, যার রেশ ছড়িয়েছে পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনেও।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের প্রশ্নে হারামনপ্রিত বলেছেন, ‘এই ম্যাচ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে, বিশেষ করে খেলার বাইরে। এখানে যে মানের আম্পায়ারিং হয়েছে তাতে আমি খুবই অবাক। পরেরবার যখন বাংলাদেশে আসব, আমাদের নিশ্চিত হয়ে আসতে হবে যে আমরা যেন এই ধরনের আম্পায়ারিংয়ের মুখোমুখি না হই। আমরা সেভাবেই নিজেদের তৈরি করব।’ এখানেই থেমে যাননি হারমানপ্রিতÑ পরের প্রশ্নের উত্তরেই বলেন, ‘ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতেই ছিল, কিন্তু এরপর কিছু দুর্বিষহ আম্পায়ারিং দেখলাম আমরা, তাদের বেশ কিছু সিদ্ধান্তে আমরা খুবই হতাশ হয়েছি।’ পুরস্কার প্রদানে আগত অতিথিদের মধ্যে ভারতের হাইকমিশনারকে না রাখারও সমালোচনা করেন হরমানপ্রিত, ‘আমাদের ভারতীয় হাইকমিশনারও ওখানে আছেন (ভারতীয় দলের খেলোয়াড়দের পাশে), আমার মনে হয় তাকেও এখানে (পুরস্কার প্রদানকারী অতিথিদের সঙ্গে) আমন্ত্রণ জানানো যেত।’ ট্রফি প্রদান শেষে দুই দলকে নিয়ে যখন ছবি তোলা হবে, তখন সেখানে বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেটাররা একসঙ্গে দাঁড়ালেও একসময় নিগার সুলতানা জ্যোতি সেখান থেকে সরে আসেন। কারণ সে সময় ভারতীয় ক্রিকেটাররা বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বলছিলেন ‘প্রতারক’। ‘এখানে আম্পায়ারদেরও নিয়ে আসা দরকার, ওরাও তো খেলেছে’ এমন কথাও উড়ে আসছিল। ‘এই ট্রফি তোমরা জেতোনি’Ñ এমন সব কথা উড়ে আসছিল ভারতীয় খেলোয়াড়দের জটলা থেকে। তখন জ্যোতি তার দল নিয়ে ড্রেসিংরুমে চলে যান। পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনে এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জ্যোতি বলেন, ‘কিছু কথা সবসময় তো আর সবকিছু বলা যায় না। যা হয়েছে, আমার কাছে মনে হয়নি দল নিয়ে ওখানে থাকব। আমি চলে এসেছি। কিছু কথা ছিল যেগুলো শুনে আমার মনে হয়নি ওখানে থাকা উচিত হবে দল নিয়ে। ক্রিকেট খুবই সম্মানের একটা জায়গা, শৃঙ্খলার জায়গা। সবচেয়ে বড় কথা এটা ভদ্রলোকের খেলা। আমার কাছে মনে হয় ওই পরিবেশ ছিল না তাই দল নিয়ে চলে এসেছি।’

হারমানপ্রিত আম্পায়ারিং নিয়ে যেসব সমালোচনা করেছেন, সেটারও জবাব দিয়েছেন জ্যোতি, ‘আমি এটা পুরোপুরি বলব ও যেটা বলেছে সেটা ওরই, সেটা আমাদের কোনো কিছু না। আমার মনে হয় ক্রিকেটার হিসেবে ও আরেকটু ভালোভাবে, পরিশীলিত আচরণে কথাগুলো বলতে পারত। যেটা আমার কাছে মনে হয় ও করেছে, ওর ব্যাপার। আমার এটা নিয়ে কথা বলা উচিত হবে না।’

আম্পায়ারিং নিয়ে হারমানপ্রিতের তীব্র ক্ষোভের কারণটাই অজানা জ্যোতির কাছে, ‘তারা আউট না হলে তো আম্পায়াররা আউট দিতেন না, নাকি? অন্যতম সেরা আম্পায়ারদের দেওয়া হয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছেলেদের আম্পায়ারিং করে। অবশ্যই চিন্তা-ভাবনা করে ওদের দেওয়া হয়েছে। আমরা সম্মান করেছি তাদের সিদ্ধান্ত। আমরা আউট হলে ওরকম করলাম না কেন। খেলোয়াড় হিসেবে আমাদের সিদ্ধান্ত মানা উচিত। আউট হই বা না হই। যেগুলো রান আউট বা ক্যাচ হয়েছে, সেগুলো নিয়ে কী বলবেন তারা।’

ভারতীয় দলের সহ-অধিনায়ক স্মৃতি মান্দানাকেও অনেক প্রশ্ন শুনতে হয়েছে এই প্রসঙ্গে। আম্পায়ারিং নিয়ে তার মন্তব্য, ‘আমরা যখন ব্যাট করছিলাম, তখন এক সেকেন্ড না ভেবেই আম্পায়ার আউট দিয়ে দিচ্ছেন। তবে আমার  মনে হয় এসব খেলারই অংশ আর সেসব দেখার জন্য বিসিবি, বিসিসিআই বা আইসিসি আছে। হয়তো সামনের দিনগুলোতে আমরা নিরপেক্ষ আম্পায়ার দেখব যাতে ম্যাচের পর আম্পায়ারিং নিয়ে বেশি আলোচনা করতে না হয়।’

মাঠে উপস্থিত বিসিবি পরিচালক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, মাহবুব আনাম, নজীব আহমেদসহ অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হারমানপ্রিতের এমন আচরণে। শুধু এই ম্যাচেই নয়, শুক্রবার শ্রীলঙ্কায় হয়ে যাওয়া ইমার্জিং এশিয়া কাপে ভারত ‘এ’ বনাম বাংলাদেশ ‘এ’ ম্যাচেও আম্পায়ারিং ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। যখনই ভারত-বাংলাদেশ মুখোমুখি হয়, সেটা বিশ্বের যে কোনো জায়গায় তখন কেন এমন উত্তপ্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়, জানতে চাওয়া হয়েছিল স্মৃতির কাছে। তার উত্তর, ‘আসলে আমরা যখন ভারতের নীল জার্সিটা গায়ে চাপিয়ে খেলতে নামি আর কিছু ক্লোজ ম্যাচ খেলি, তখন এরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়। ছেলেদের অ্যাশেজে দেখুন, অনেক বিতর্কেরই জন্ম হচ্ছে কারণ দুই দলই জিততে মরিয়া। আমি ব্যাপারটাকে বাংলাদেশ-ভারত বৈরিতায় সীমাবদ্ধ করতে চাই না, এটাই বলতে চাই যে খুব টানটান উত্তেজনার একটা ম্যাচ হয়েছে। যে কোনো রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি, উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে এমন মাথা গরম করা ঘটনা ঘটবেই। আমাদের মনে হয়েছে কিছু কিছু সময়ে কিছু কিছু মুহূর্তে কিছু কিছু সিদ্ধান্ত আমাদের পক্ষে যায়নি, আর মাঠে এমন অনুভূতি আমাদের হতেই পারে।’