আল্লাহতায়ালা যে চার মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ এবং বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন- মহররম তার অন্যতম। এটি হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস। মহররম মাসের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। জাহেলি যুগে প্রাচীন আরবদের মধ্যে গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হতো এদিনটি। আশুরার দিন মক্কার মানুষরা রোজা রাখত এবং কাবা ঘরের গিলাফ পরিবর্তন করত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিনে রোজা রাখেন এবং অন্যদের রোজা রাখার উৎসাহ ও নির্দেশ দেন। তাছাড়া রমজানের রোজার আগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল। রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা মোস্তাহাব পর্যায়ের ঐচ্ছিক ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়।
আশুরা স্মরণীয় যেভাবে
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখেন, ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছেন। তিনি তাদের কাছে এর কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, এটি একটি মহান দিন। এদিনে আল্লাহতায়ালা হজরত মুসা (আ.) ও তার জাতিকে (ফেরাউনের কবল থেকে) মুক্তি দেন এবং ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়কে (সাগরে) নিমজ্জিত করেন। এ জন্য হজরত মুসা (আ.) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এদিন রোজা রাখেন। তাই আমরাও এদিনে রোজা রাখি। তখন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হজরত মুসা (আ.)-এর অনুসরণে আমরা তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার। এরপর তিনি রোজা রাখেন এবং অন্যদেরও রোজা রাখতে নির্দেশ দেন।’ -সহিহ মুসলিম : ১১৩০
৬১ হিজরির মহররম মাসের ঘটনা। এ মাসের দশ তারিখে আশুরার দিন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাতি হজরত হুসাইন ইবনে আলি (রা.) ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে স্বীয় পরিবার ও অনুসারীদের সঙ্গে শাহাদাত বরণ করেন। -আল বিদায়া : ৮/৩২৩
আশুরায় করণীয়
মহররম ও আশুরা সম্পর্কে বিস্তর আলোচনা-পর্যালোচনা থাকলেও আমলযোগ্য দুটি বিষয় সামনে আসে-
রোজা রাখা: মহররম মাসে রোজা রাখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে হাদিসে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত এক হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রমজানের পর আল্লাহর মাস মহররমের রোজা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ।’ -সহিহ মুসলিম : ১১৬২
তওবা করা: তওবা কবুল হওয়া এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তি, নিরাপত্তা এবং সাহায্য লাভ করার ইতিহাসজুড়ে আছে মহররম মাসের সঙ্গে। হজরত আলি (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, রমজানের পর আপনি কোন মাসে রোজা রাখতে নির্দেশ দেন? হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তুমি যদি রমজানের পর রোজা রাখতে চাও তাহলে মহররমে রোজা রেখো। কেননা মহররম আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন রয়েছে, যেদিন আল্লাহতায়ালা (অতীতে) অনেকের তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অনেকের তওবা কবুল করবেন।’ -জামে তিরমিজি : ৭৪১
হাদিস বিশারদদের মতে- হাদিসে যেদিনের কথা ইঙ্গিত করা হয়েছে সেটি খুব সম্ভব আশুরার দিন। তবে মানুষের উচিত প্রাত্যহিক জীবনে তওবা-ইস্তিগফারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া।
আশুরায় বর্জনীয়
মহররম ও আশুরাকে ঘিরে মুসলিম সমাজে এমন কিছু রীতি ও কল্পকথার প্রচলন রয়েছে, যার নির্ভরযোগ্য কোনো বর্ণনা বা সূত্র কোরআন-হাদিসে পাওয়া যায় না। এর কয়েকটি হলো-
কারবালার শহীদদের স্মরণে শোক প্রকাশ: হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাতি হজরত হোসাইন (রা.) ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে স্বীয় পরিবার ও অনুসারীদের সঙ্গে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। ঘটনাক্রমে দিনটি ছিল ৬১ হিজরির ১০ মহররম বা আশুরার দিন। বিষয়টি মুসলিম উম্মাহর কাছে সহনীয় নয়।
তবে একটা শ্রেণি এমন রয়েছে, যারা ১০ মহররম কারবালার শহীদদের স্মরণে শোক প্রকাশ অনুষ্ঠান, মর্সিয়া গাওয়ার ব্যবস্থা এবং তাজিয়া মিছিলের আয়োজন করেন। সেই সঙ্গে বিলাপ-মাতম করে ও বুক চাপড়ে শোক প্রকাশের রীতি পালন করেন। এগুলো কাম্য নয়।
এ জাতীয় কর্মকাণ্ড ইসলাম সমর্থিত নয় এবং আশুরার সঙ্গে এসবের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। উপরন্তু এ ব্যাপারে ইসলামের কঠিন হুঁশিয়ারির বর্ণনা এসেছে।
ভিত্তিহীন ও দুর্বল হাদিস বর্ণনা: অনেকে মহররম ও আশুরার গুরুত্ব ও ফজিলত আলোচনা করতে গিয়ে অসখ্য কল্পকথা ও দুর্বল হাদিস অবতরণ করে থাকেন। এমন একটি কথা হলো- ‘যে ব্যক্তি মহররমের প্রথম দশ দিন রোজা রাখে, সে দশ হাজার বছর যাবৎ দিনে রোজা ও রাতে ইবাদতের সাওয়াব পাবে।’ এটি একটি বানোয়াট বর্ণনা। নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে তা পাওয়া যায় না। -আল্-লাআলি, ইমাম সুয়ূতি : ২/১০৮-১০৯
এ জাতীয় আরেকটি বর্ণনা হলো- ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিনে চোখে ‘ইসমিদ’ সুরমা ব্যবহার করবে কখনোই তার চোখ উঠবে না।’ হাদিসটি কয়েকটি সনদে বর্ণিত হয়েছে। প্রত্যেকটি সনদ অত্যন্ত দুর্বল। -আল্-আসার, আব্দুল হাই লাখনবি : ৯৭
আশুরার বিশেষ নামাজ সম্পর্কে একটি ভিত্তিহীন বর্ণনা পাওয়া যায়- ‘যে ব্যক্তি আশুরার রাত্রে চার রাকাত নফল নামাজ আদায় করবে এবং নামাজের প্রতি রাকাতে সুরা ফাতেহার সঙ্গে ৫০ বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে, আল্লাহ তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ৫০ বছরের গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন...।’ -আল-মাওদুয়াত, ইবনুল জাওজি : ২/১২২
এ জাতীয় আরও অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলোর পরিশুদ্ধতার বিষয়ে যাচাই-বাছাই ছাড়াই নিঃসংকোচে রাসুলের হাদিস হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়। যা অত্যন্ত অন্যায় কাজ। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমার প্রতি মিথ্যারোপ করা অন্য কারও প্রতি মিথ্যারোপ করার মতো নয়। যে ব্যক্তি আমার প্রতি মিথ্যারোপ করে সে নিজেই তার ঠিকানা জাহান্নামে করে নেয়।’ -সহিহ বোখারি : ১২৯১
ইসলামের শোভা-সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে সহজতা, স্বাভাবিকতা ও মধ্যমপন্থার মধ্যদিয়ে। সত্যকে আঁকড়ে ধরা এবং প্রকৃত সুন্নাহ মোতাবেক জীবন গড়া মুমিনের একান্ত কর্তব্য। মহররম ও আশুরাকে ঘিরে মুসলিম জাতির অনেক ইতিহাস, শিক্ষা, আবেগ ও ভালোবাসা জড়িয়ে আছে। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা ও সঠিক তথ্য জেনে আমল করা অত্যন্ত জরুরি।