টাকা রুপিতে লেনদেন

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে সংকট চলছেই। কারণ হিসেবে নানা কথা বলা হলেও, ডলারের সঙ্গে টাকার মানের পতন ঠেকানো যাচ্ছে না। একবছরে টাকার দাম ডলারের তুলনায় কমেছে ২৫ টাকারও বেশি। এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। ডলারকে মান মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করলে আমদানি ব্যয় বাড়ছে। আগে এক ডলারের পণ্য আমদানি করতে ৮৫ টাকা দিতে হতো। এখন দিতে হয় ১০৮ টাকা। রিজার্ভ কেন কমে, টাকার মান কেন কমে, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মুদ্রা বিনিময় কীভাবে করা হবে সে সব বিষয় নিয়েও আলোচনা করছেন সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য টাকা বনাম রুপিতে হবে। এর ফল কী বর্তাবে দেশের অর্থনীতিতে?

নিয়ম অনুযায়ী, দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের আমানত হিসেবে নেওয়া মোট অর্থের একটি অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে (বাংলাদেশ ব্যাংক) জমা রাখতে হয়। এই অর্থ তারা ঋণ বা অন্য কোনো কাজে খরচ করতে পারে না। আর রপ্তানি, রেমিট্যান্স, ঋণ বা অন্যান্য উৎস থেকে আসা বৈদেশিক মুদ্রা থেকে আমদানি, ঋণ ও সুদ পরিশোধ, বিদেশে শিক্ষা ইত্যাদি নানা খাতে যাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা বাদ দেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চিত থাকে তা হলো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ।

এই রিজার্ভ রাখতে হয় কেন? কারণ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে লেনদেন করতে হলে, বৈদেশিক মুদ্রা বিশেষত গ্রহণযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা দরকার হয়। আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক ঋণের সুদ প্রদান ইত্যাদিতে এই মুদ্রা ব্যবহৃত হয়। ফলে জোগান না থাকলে একটা দেশ সংকটে পড়ে যায়। আর ভালো পরিমাণে থাকলে, দেশ স্বস্তিতে থাকে। এই ভালো পরিমাণ অর্থ হলো, কমপক্ষে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার। বাংলাদেশে গড়ে মাসিক আমদানি ৮ বিলিয়ন ডলারের মতো। তাই ২৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে রিজার্ভ নেমে যাওয়া, সংকট বলে বিবেচিত হয়। বৈদেশিক মুদ্রার যথেষ্ট সঞ্চয় যদি থাকে, তখন বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার সময় কম চিন্তা করতে হয়। আমদানির মূল্য পরিশোধ করার জন্য যথেষ্ট বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় থাকলে, আমদানি নিয়েও চিন্তা করতে হয় না। বাংলাদেশে যেহেতু রপ্তানির তুলনায় আমদানি অনেক বেশি ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেশি থাকা দরকার।

বাংলাদেশ বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করে ডলারের মাধ্যমে। আর রপ্তানি যা করে, তার মূল্যও বুঝে নেয় ডলারের মাধ্যমে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীতে যত লেনদেন হয় তার ৮০ ভাগেরও বেশি হয় ডলারের মাধ্যমে। ফলে বলা যায়, বিশ্ব বাণিজ্য অনেকটাই নির্ভরশীল ডলারের ওপর।

দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠছে, এর কি কোনো বিকল্প নেই? বিশ্ব অর্থনীতিতে চীন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও কম নয়। ফলে ডলারের বিপরীতে, ইউরো বা চীনের মুদ্রা ইউয়ান কিংবা রাশিয়ার মুদ্রা রুবল কি বিকল্প হতে পারবে? ইউক্রেন যুদ্ধের পর এই প্রচেষ্টা আরও জোরেশোরে শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য এবং বাণিজ্য বহির্ভূত লেনদেন হয় ভারতের সঙ্গে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে মার্কিন ডলারের দর ব্যাপক ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়েছে। বাড়তি দামেও ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ডলারের ওপর চাপ কমাতে, সরাসরি টাকা ও রুপির মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অবশ্য নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের এই উদ্যোগ এক দশক আগেই নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নানা ঝুঁকি বিবেচনায় এর বাস্তবায়ন ঘটেনি। বর্তমানে ভারতে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ এবং প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে।

আবার বাংলাদেশি নাগরিকরা ভারতে চিকিৎসা, পর্যটন ও কেনাকাটা বাবদ প্রচুর ব্যয় করেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট আমদানির ১৪ শতাংশ হয় ভারত থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে ২০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ ভারত থেকে পণ্য আমদানি করেছে এক হাজার ৬১৯ কোটি ডলারের। ঘাটতির পরিমাণ এক হাজার ৪১৯ কোটি ডলার। টাকা-রুপিতে লেনদেন হলে সমস্যার কি সমাধান হবে না জটিলতা আরও বাড়বে তা নিয়ে বিতর্ক আছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বিপুল এবং বাংলাদেশের হাতে যেহেতু যথেষ্ট পরিমাণ রুপি নেই, এ কারণে দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রুপিতে বাণিজ্যিক লেনদেন করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ ২০০ কোটি ডলারের যে রপ্তানি আয় বাংলাদেশ করছে, সে পরিমাণ বাণিজ্য ভারতীয় মুদ্রার মাধ্যমে করা যেতে পারে। এর বেশি পণ্য রুপিতে কেনা যাবে না, কারণ রপ্তানি ছাড়া বাংলাদেশ রুপি পাবে কোথা থেকে? তাহলে বাংলাদেশকে আমদানি মূল্যের বাকি অংশ অর্থাৎ ১৪শ কোটি ডলারের আমদানি ব্যয় আগের মতোই মার্কিন ডলারে পরিশোধ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে, রুপিতে লেনদেন কোনো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তৈরিতে সাহায্য করবে না, যতক্ষণ না সংস্থাটি তার এসডিআর (স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস) বাস্কেটে এ মুদ্রা অন্তর্ভুক্ত করে। এসডিআর বাস্কেটে অন্তর্ভুক্তির অর্থ হলো, মুদ্রাটি একটি আন্তর্জাতিক রূপান্তরযোগ্য মুদ্রা হিসেবে গণ্য হবে। এই বিষয়টা মনে রাখতে হবে, ভারতীয় রুপি আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাস্কেটে নেই। চীনের ইউয়ান আছে। এখানে ইউয়ানেও এলসি খোলা যায়। কিন্তু তারপরও সাড়া কম। ফলে ভারতীয় মুদ্রার বাণিজ্য ততটা সহজ হবে কি? যেমন, ভারতে যে পোশাক রপ্তানি করে সে কাঁচামাল আমদানি করে অন্য দেশ থেকে ডলারে। সেই দেশ তো রুপি নেবে না। কারণ রুপিতে নিলে তাকে তো আবার কাঁচামাল আমদানি করতে রুপিকে আবার ডলারে পরিবর্তন করতে হবে। আর তা করতে হলে তার ক্ষতি হবে। শুধু ভারতের সঙ্গে যার আমদানি ও রপ্তানি দুটি ব্যবসা আছে যে রুপিতে করতে পারবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা দুই বিলিয়ন ডলার হতে পারে। আবার আমরা যা আমদানি করি, তার বিনিময়ে ভারত বাংলাদেশি টাকা নেবে না। কারণ আমরা ডেফিসিট কান্ট্রি। ডেফিসিট কান্ট্রির মুদ্রা টাকা দিয়ে ভারত কী করবে? এতে শক্তিশালী দেশ হিসেবে ভারতের লাভ হবে। তার রুপির গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। ভারতকে আর ডলারে পেমেন্ট করতে হবে না। এর ফলে রুপির বাজারও সৃষ্টি হতে পারে। যদিও রুপি আমাদের টাকার মতোই এখনো একটি দুর্বল মুদ্রা। কাজেই একটা ঝুঁকিও থাকবে। ধরা যাক! আমরা রপ্তানি করে রুপি আনলাম। ডলারের সঙ্গে যদি রুপির দামের অবমূল্যায়ন হয় তাহলে বাংলাদেশের ক্ষতি। ডলারে বাণিজ্য হলে সেই ঝুঁকি কম। তাই অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি থাকায় রুপিতে লেনদেনে বাংলাদেশ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া গত বছর তাদের রপ্তানিকারকদের বাংলাদেশের সঙ্গে ডলার এবং অন্যান্য প্রধান মুদ্রায় লেনদেন এড়িয়ে যেতে বলেছিল। বাংলাদেশের রিজার্ভ কমে যাওয়া রোধ করতে এ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভেবেছে তারা। এদিকে ডলার সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সেপ্টেম্বরে দেশে টাকা-রুপি ভিত্তিক ডেবিট কার্ড চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে কার্ডের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা টাকা দিয়ে যেমন দেশের মধ্যে কেনাকাটা করতে পারবেন, তেমনি একই কার্ড দিয়ে ভারতে রুপিতেও কেনাকাটা করতে পারবেন। এই কার্ডের মাধ্যমে ডাবল কারেন্সি এক্সচেঞ্জের প্রয়োজনীয়তা মিটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যার ফলে টাকাকে ডলারে এবং এরপর ডলারকে রুপিতে রূপান্তর করতে যে এক্সপেন্ডিচার লস হয়, তা সাশ্রয় হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেছিলেন, যেসব বাংলাদেশি পর্যটক ঘন ঘন ভারতে ভ্রমণে যান তাদের জন্য এটি বিশেষভাবে উপকারী হবে। একটা তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, ২০১৯ সালে ২৫ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ট্যুরিস্ট ভিসায় ভারতে গিয়েছিলেন। তাদের ভ্রমণের প্রধান গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, অবসর কাটানো, ঘুরে বেড়ানো ও চিকিৎসা। ফলে যদি রুপি-টাকায় লেনদেন একবার শুরু হয় তাহলে এটি শুধুমাত্র স্থানীয় পণ্যের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং বিভিন্ন সেবামূলক বাণিজ্য যেমন ভ্রমণ, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়বে, যা বাংলাদেশকে ঝুঁকিতে ফেলবে।

ডলার বা অন্য কোনো হার্ড কারেন্সিকে এড়িয়ে দুটি দেশ যখন নিজেদের মধ্যে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য চালায়, সেটিকে আর্থিক পরিভাষায় ‘কারেন্সি সোয়াপ অ্যারেঞ্জমেন্ট’ বলা হয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের এ ধরনের ‘রুপি সোয়াপ’ প্রস্তাবনা প্রশ্নে দুটি জটিলতা দেখা দেবে । প্রথমত, ডলার ব্যবসার হোতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়কে কীভাবে দেখবে? দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতির রুপি জোগাড় করবে কীভাবে এবং কোথা থেকে? কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজার এমন যে সেখান থেকে বাংলাদেশ যা আমদানি করে, তার ১৮ থেকে ২০ গুণ বেশি রপ্তানি করে। আয় করা ডলার পুরোটাই তো বাজারে খরচ হয়ে যায় না। আনুমানিক ৭০০ মিলিয়ন ডলারের আমদানির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে বছরভেদে ১৪ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি বাংলাদেশের।

অন্যদিকে, ভারতের ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানির হিসাবটা যুক্তরাষ্ট্রের পুরো উল্টো। বাংলাদেশ ভারতের বাজারে যা রপ্তানি করে, তার পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি আমদানি করে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ডলার আয়ের উৎস হলেও ভারতের বাজার আমাদের ডলার খরচের জায়গা। তাহলে বাণিজ্যবৈষম্যের অন্তত ছয় বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে রুপির উৎস কী হবে?

আমদানি-রপ্তানির ঘাটতি পূরণে প্রবাসী আয় একটা বড় ভূমিকা পালন করে। তাহলে বাংলাদেশ কি প্রবাসী আয় থেকে অর্জিত ডলারকে রুপিতে পরিবর্তন করে তারপর রুপিতে আমদানি করবে? যে ডলার সংরক্ষণের জন্যই ‘মুদ্রা বিনিময়ের’ প্রস্তাব, সেই রিজার্ভ মুদ্রা খরচ হয়ে গেলে আমাদের কী লাভ হবে? আবার বাণিজ্যে ভারত খুব রক্ষণশীল। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি পণ্যে আমদানি নিষেধাজ্ঞা আছে ভারতের। শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা না দিলে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়বে না এবং রুপিও আয় হবে না। ভারত পাট, পাটজাত পণ্য, বাংলাদেশে তৈরি হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ও মাছ ধরার জালের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করায় বাংলাদেশের কিছু খাতে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রুপি সোয়াপ চাইলে ভারতকে পণ্যভিত্তিক যাবতীয় প্রত্যক্ষ বাণিজ্য বাধা, পরোক্ষ বাণিজ্য বাধা এবং বাংলাদেশি পণ্যে যাবতীয় অ্যান্টি-ডাম্পিং নিষেধাজ্ঞা সরাতে হবে। ভারত কি তা করবে? ডলারের সংকট মেটাতে যা করা দরকার, সেটা না করে রুপিতে বাণিজ্য করতে গেলে সমস্যা কমবে না বাড়বে? নতুন সংকটের জালে কি বাংলাদেশ আবার জড়িয়ে পড়বে? নাকি সেই কথাটাই সতর্ক বাণীর মতো মনে রাখতে হবে কুইনাইন জ্বর সারাবে বটে তবে কুইনাইন সারাবে কে?

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট

rratan.spb@gmail.com