‘ছাতা’ নিয়ে একটি পুরনো লোককৌতুক প্রচলিত আছে। ‘ছাতা’ হারানোর ভয়ে, একজন মানুষ ছাতার গায়ে নিজের নাম-ঠিকানা লিখে রেখেছিলেন। ভেবেছিলেন, হারিয়ে গেলে কোনো সৎ মানুষ হয়তো ফেরত দিয়ে যাবে। কিন্তু কয়েক দিন পর থেকে তার ঠিকানায় প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত কিছু টাকা আসতে শুরু করল! ছাতা নিয়ে আমাদের সম্পর্কটা বেশ অদ্ভুত। পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের সঙ্গে ছাতার সম্পর্ক আজীবনের। আর আমার সঙ্গে ছাতার সম্পর্ক চিরস্থায়ী বিচ্ছেদের। আমি যদি বাউ-ুলে হিউয়েন সাং হতাম, তাহলে হয়তো ছাতা হারাত না। লোকমুখে শোনা যায়, তার পিঠে নাকি অটোমেটিক ছাতা বাঁধা থাকত। কিন্তু এই জীবনে ছাতা ব্যবহার করতে পারলাম না। ফলে ছাতার প্রতি আমার এক ধরনের প্রবল বিদ্বেষ জন্মেছে। অবশ্য ছাতাকে শুধু বর্ষার উপকরণ ভাবলে ভুল হবে। আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন, তারাও একটি চলমান ছাতা। যেদিকে বৃষ্টি, সেদিকে তারা ছত্রধর। বৃষ্টির প্রতিকূলে ছাতা ধরেন না, এমন মানুষ পৃথিবীতে বিরল। আমাদের রাজনৈতিক অভিধানে ছাতার বেশ কদর আছে। চীন বা রাশিয়ায় বৃষ্টি হলে, বাংলাদেশেও কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের মাথায় ছাতা দেখা যায়। এমন রসিকতা বহুদিন ধরে প্রচলিত। পৃথিবীর আবহাওয়া বিভাগ এখনো এই রহস্যের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
বর্ষাকাল এলে বাংলাদেশে অন্য ধরনের ছাতা দেখা যায়। এগুলো হাতে ধরা ছাতা নয়, অবস্থান বদলের ছাতা। বৃষ্টি কোথায় হচ্ছে, সেটা দেখে অনেকের মতামত বদলে যায়। টেলিভিশনের টকশো থেকে শুরু করে, সামাজিক মাধ্যমের টাইমলাইন সবখানে তখন নতুন প্রজাতির ছত্রধর আবির্ভূত হন। সকালবেলার অবস্থান বিকেলে বদলে যায়, আর রাতের মধ্যে তারা এমনভাবে নতুন ছাতার নিচে চলে যান, যেন কখনো অন্য কোথাও ছিলেনই না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাতার গুরুত্ব অনেক পুরনো। এখানে অনেকেই আদর্শের চেয়ে আশ্রয়কে বেশি ভালোবাসেন। ক্ষমতা যেখানে, ছাতাও সেখানে। বৃষ্টি যত তীব্র, ছাতার নিচে ভিড়ও তত বেশি। মজার ব্যাপার হলো, রোদ উঠলেই আবার সেই ভিড় কমে যায়। তখন অনেকে এমন ভাব করেন, যেন তারা কোনো দিনই ওই ছাতার নিচে দাঁড়াননি। আমাদের রাজনৈতিক স্মৃতিশক্তি যেমন দুর্বল, ছাতার কাপড়ও বোধহয় তেমন জলরোধী।
মিডিয়ারও নিজস্ব ছাতা সংস্কৃতি আছে। কোনো একটি ইস্যুতে একদিন সবাই ঝড় তুলবে, পরদিন নতুন মেঘ আসতেই পুরনো বৃষ্টিকে ভুলে যাবে। নিউজফিডে একেকটি ট্রেন্ডিং বিষয় একেকটি মৌসুমি ছাতা। কয়েক ঘণ্টা মাথার ওপর ঘুরে বেড়াবে, তারপর আরেকটি এসে জায়গা দখল করবে। মনে হবে, ঘটনাগুলোর চেয়ে অ্যালগরিদম আমাদের আবহাওয়া অধিদপ্তর। নিউ মিডিয়া তো ছাতার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। আগে রাজাবাদশাহদের জন্য আলাদা রাজছত্র ছিল, এখন প্রত্যেকের হাতে একটি করে ডিজিটাল ছাতা। কেউ লাইক দিয়ে ছাতা ধরছেন, কেউ শেয়ার দিয়ে, কেউ আবার মন্তব্যের ভেতর আশ্রয় খুঁজছেন। এমনকি বৃষ্টি না হলেও অনেকে আগে থেকেই ছাতা খুলে প্রস্তুত থাকেন। যদি কোনো ঝড় আসে, যদি কোনো পক্ষ শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাহলে যেন সঙ্গে সঙ্গে সেই ছাতার নিচে দাঁড়ানো যায়। মনে হয়, আমরা ধীরে ধীরে বর্ষাকালের মানুষ থেকে ‘বর্ষাকেন্দ্রিক’ মানুষ হয়ে উঠছি। এখন আর শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির পূর্বাভাস মেলে না; ফেসবুকের নিউজফিড দেখেও বোঝা যায়, আজ কোন দিকে ছাতা ধরতে হবে। আসলে ছাতা মানেই আশ্রয়। ছাতা মানেই কারও মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা। একসময় বিয়ের ঘটকালি যারা করতেন, তাদের হাতেও ছাতা ছিল অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। ঘটকরা শুধু পাত্র-পাত্রীর সম্পর্ক জোড়া লাগাতেন না, দুই পরিবারের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক আশ্রয়ও তৈরি করতেন। তাই ছাতা ছিল তাদের পরিচয়ের অংশ। ২০১২ সালে ‘দ্য আমব্রেলা স্কাই’ প্রকল্পের আওতায় অ্যাগুয়েডা শহরকে এভাবেই সাজানো হয়েছিল। পরে সেই ছবিগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আর তারপর থেকেই পর্যটকদের ঢল নামে সেখানে। দেখা গেল, ছাতা শুধু বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে না; শহরকেও রঙিন করে তুলতে পারে। তবু আমার আপত্তি রয়েই যায়। ছাতা জিনিসটাই ভয়াবহ এক বোঝা। মাথার ওপর যখন বিশাল আকাশ আছে, তখন আরেকটি ছোট আকাশ কেন তার মাঝখানে আড়াল হয়ে দাঁড়াবে?
বৃষ্টির বন্ধু কখনোই ছাতা হতে পারে না। যদিও রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’য় যতই মধ্যবিত্ত অমিত ঘুম থেকে উঠে দেখুক, ‘ডান হাতে ছাতা দোলাতে দোলাতে ওপরের রাস্তা দিয়ে আসছে লাবণ্য’, তবুও আমার চোখে ছাতা বরাবর ক্ষমতার অলংকার। আমি ছাতা দেখি, হীরক রাজার শিক্ষামন্ত্রীর মাথার ওপর। দেখি রাজদরবারের ছত্রবাহকদের ঘুরঘুর করতে। রাজাবাদশাহদের মাথার ওপর ভৃত্যরা উঁচু করে রাজছত্র তুলে ধরত। এটি ছিল ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও মর্যাদার প্রতীক। সে সময় একটি দৃশ্য খুবই স্বাভাবিক ছিল। রাজা আগে আগে হাঁটছেন আর পেছনে ছত্রধর ভৃত্য ছাতা মেলে চলেছে। সেই দৃশ্যের কথা ভাবলে, আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে ‘হীরক রাজার দেশে’র শিক্ষামন্ত্রী। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকাটাই যেন, প্রধান যোগ্যতা।
আমার বরং ছাতাবিহীন বৃষ্টি বেশি পছন্দ। বৃষ্টি যখন অনিবার্য, তখন তাকে উপভোগ করা ভালো। পথিমধ্যে জল হয়ে অঝোরে ঝরার বাইরে মেঘেরও অনেক কাজ আছে। তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার কী দরকার? ছাতা অবশ্য শুধু বৃষ্টির হাতিয়ার নয়, সিনেমার ভাষায় এটি বহুদিন ধরেই এক শক্তিশালী মেটাফোর। কখনো প্রেম, কখনো ক্ষমতা, কখনো নিঃসঙ্গতা, আবার কখনো আশ্রয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে এটি। ‘সিঙ্গিন ইন দ্য রেইন’-এ বৃষ্টির মধ্যে ছাতা প্রায় অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়; আনন্দই সেখানে প্রধান চরিত্র। আবার মেরি পপিন্স আকাশ থেকে ছাতা নিয়ে নেমে এসে কল্পনা ও বিস্ময়ের জগৎ তৈরি করেন। জাপানি, কোরীয় কিংবা ইউরোপীয় অনেক চলচ্চিত্রে একটি ছাতার নিচে দুই মানুষের পাশাপাশি হাঁটা মানেই সম্পর্কের দূরত্ব কমে আসা। অথচ আমাদের বাস্তব জীবনে ছাতার রাজনীতি ভিন্ন। এখানে এক ছাতার নিচে দাঁড়ানো মানেই প্রায়ই কোনো না কোনো পক্ষ বেছে নেওয়া। সিনেমা ছাতাকে রোমান্টিক করেছে, আর আমরা তাকে বানিয়েছি অবস্থানগত অস্ত্র। ফলে ছাতা আর নিছক ছাতা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে পরিচয়, পক্ষ, আশ্রয় এবং সুবিধাবাদের চলমান স্থাপত্য। ভারতীয় সিনেমাতেও ছাতা এক বিশেষ নান্দনিক ভাষা তৈরি করেছে। বর্ষা, প্রেম আর ছাতা এই তিন যেন বলিউডের দীর্ঘদিনের সহযাত্রী। গুরু দত্ত থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায়, শ্যাম বেনেগাল থেকে সমকালীন নির্মাতাদের সিনেমাতে ছাতা কখনো প্রেমের দূরত্ব কমিয়েছে, কখনো সামাজিক শ্রেণিবিভাজনের প্রতীক হয়েছে। বিশেষ করে, বর্ষার দৃশ্যে একটি ছাতার নিচে নায়ক-নায়িকার পাশাপাশি হাঁটা ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রায় চিরন্তন দৃশ্যভাষা। মজার ব্যাপার হলো, সিনেমায় ছাতা মানুষকে কাছাকাছি আনে, কিন্তু বাস্তব জীবনে অনেক সময় ছাতা মানুষকে আলাদা করে দেয়। কেউ নিজের ছাতার ব্যাসার্ধ বড় করতে ব্যস্ত, কেউ আবার অন্যের ছাতার নিচে জায়গা খুঁজছেন। ভারতীয় সিনেমা আমাদের শিখিয়েছে, ছাতা কেবল বৃষ্টিকে ঠেকায় না; মানুষের সম্পর্ক, সংকোচ, শ্রেণি ও আবেগও দৃশ্যমান করে তোলে। তাই বলিউডের বর্ষা মানে শুধু মেঘ আর গান নয়, একটি ছাতার নিচে সাময়িকভাবে ছোট হয়ে আসা পৃথিবীও। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায়, ছাতা কখনো কেবল বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার উপকরণ নয়; এটি তার বাস্তবতাবাদী দৃশ্যভাষার অংশ। তিনি ছাতাকে খুব সচেতনভাবে মধ্যবিত্ত জীবনের অনুষঙ্গ, সামাজিক অবস্থান ও চরিত্রের মানসিক দূরত্ব বোঝাতে ব্যবহার করেছেন। ‘মহানগর’-এ কলকাতার নগরজীবন, অফিসযাত্রা ও মধ্যবিত্তের দৈনন্দিনতার ভেতরে ছাতা প্রায় অবিচ্ছেদ্য উপস্থিতি। আবার ‘জন অরণ্য’ বা ‘সীমাবদ্ধ’র নগরবাস্তবতায় ছাতা হয়ে ওঠে এক ধরনের নাগরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মানুষ যেন শুধু বৃষ্টি নয় শহরের অনিশ্চয়তা, ভিড় ও সামাজিক চাপ থেকেও নিজেকে আড়ালে রাখছে। মজার বিষয় হলো, সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে ছাতা খুব কমই নাটকীয় প্রতীক হিসেবে সামনে আসে। বরং নীরবে চরিত্রগুলোর সঙ্গে মিশে যায়। এই নীরবতাই তাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। তার সিনেমায় ছাতা ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, বরং মধ্যবিত্ত অস্তিত্বের এক বিনয়ী অনুষঙ্গ যেখানে মানুষ প্রতিদিন আকাশের সঙ্গে নয়, জীবনের সঙ্গে সমঝোতা করতে বের হয়।
কবি আবুল হাসান লিখেছিলেন ‘মেঘেরও রয়েছে কাজ/ ওকে ছুটি দাও/ ওকে দিয়ে দাও ওর কালো আমব্রেলাটি,/ ফিরে যাক ও তার তল্লাটে!/ প্রকৃতির সবচেয়ে নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারী/ ঐ মেঘ,/ ওরও তো রয়েছে বহু শিল্পকর্ম,/ এবং বাসনা!/ ওকে ছুটি দাও,/ ওকে দিয়ে দাও ওর কালো আমব্রেলাটি,/ ফিরে যাক ও তার তল্লাটে!’ আসলে ছাতার বিরুদ্ধে আপত্তি বৃষ্টি ঠেকানো নিয়ে নয়, বরং অতি-আশ্রয়ের সংস্কৃতি নিয়ে। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে সবাই কোনো না কোনো ছাতার নিচে যেতে চাই। রাজনীতির ছাতা, মতাদর্শের ছাতা, প্রতিষ্ঠানের ছাতা, সামাজিক মর্যাদার ছাতা, ডিজিটাল জনপ্রিয়তার ছাতা। যেন খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকার সাহসটুকু ক্রমে হারিয়ে ফেলছি। তাই আবুল হাসানের কবিতাটি শেষ পর্যন্ত মেঘের নয়, আমাদের কথাই বলে। তিনি মেঘকে তার কালো আমব্রেলাটি ফিরিয়ে নিজ তল্লাটে পাঠিয়ে দিতে বলেছিলেন। হয়তো বলতে চেয়েছিলেন, প্রকৃতির মতো মানুষকেও স্বাভাবিক স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে হবে। সব কিছুকে মাথার ওপর টাঙিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। কিছু মেঘকে মেঘ থাকতে দিতে হয়, কিছু বৃষ্টিকে বৃষ্টি, আর কিছু মানুষকে ছাতাবিহীনভাবেই পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়াতে দিতে হয়। কারণ শেষ পর্যন্ত আকাশই সবচেয়ে বড় আশ্রয়, ছাতা নয়।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক