স্বপ্ন ছিল সুখী-সুন্দর সমৃদ্ধ জীবনের। কিন্তু বাল্যবিয়ে নামের অভিশাপ কেড়ে নিয়েছে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার কমরপুর জেলেপল্লীর হালিমার সে প্রত্যাশা। তের বছর বয়সে বিয়ে। ১৪ বছরে প্রথম সন্তান। জন্মের ৬ মাসের মাথায় ওই সন্তানের মৃত্যু হয়। এরপরে আরও ২ সন্তানের পর ২ যমজ সন্তানের জন্মদান। এখন ১৮ বছর বয়সেই ৪ সন্তানের জননী। চার সন্তানসহ নিজে এখন অপুষ্টিসহ নানা রোগেশোকে জর্জরিত। পরিবারে অশান্তি আর অভাব নিত্যসঙ্গী। চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাবার দূরের কথা, জেলে স্বামীর সামান্য রোজগারে এখন অর্ধাহারে-অনাহারে সন্তানদের নিয়ে কাটছে তার দিন।
হালিমার মা শাহিনুরেরও বিয়ে হয়েছিল ১৪ বছর বয়সে। ১৫ বছর বয়সেই জন্ম হয় হালিমার। এরপর আরও চার সন্তান। ৩৮ বছর বয়সেই এ নারীর চেহারা, শরীরে পড়েছে বয়স্ক মানুষের ছাপ। বিয়ের পর থেকেই অভাব-অনটনের সংসারে চিকিৎসা কিংবা পুষ্টিকর খাবার তার ভাগ্যে জোটেনি। খেয়ে না খেয়েই সেই থেকে এখনো কাটছে তার দিন। রুগ্ণ শরীর নিয়ে স্বামী-সন্তান সামলানোর মধ্যে সংসারে বাড়তি জোগান দিতে কাজও করেছেন। অপরদিকে, যমজ সন্তানদের লালন-পালনের অতিরিক্ত যতœও করতে হচ্ছে।
একই গ্রামের রাবেয়ার বিয়ে হয়েছিল ১৪ বছর বয়সে। বাবার অভাব-অনটনের সংসার, প্রতিবেশী ছেলেদের অর্থপূর্ণ চাহনীর কারণে কিশোরী বধূ হতে হয়েছিল তাকে। এখন সে চার সন্তানের জননী। রুগ্ণ শরীর নিয়ে জেলে স্বামীর সংসারে রাতদিন চলছে তার নিরন্তর শ্রম।
শুধু হালিমা, রাবেয়া কিংবা হালিমার মা শাহিনুর নয় পটুয়াখালীর গ্রামীণ উপকূল থেকে শহুরে অনগ্রসর জনপদে রয়েছে এমন হাজারো কিশোরী মা। পরিবারের দারিদ্র্য, অশিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, দায় থেকে মুক্তি, যৌন হয়রানিসহ পরিবারের মেয়ে শিশুরা উপার্জন অক্ষম মনে করার কারণে বাল্যবিয়ের অভিশাপ এসব কিশোরীর জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। আর এসব কারণেই বাল্যবিয়ের খড়গ থেকে মুক্ত হতে পারছে না পটুয়াখালীর গ্রামীণ উপকূল থেকে শহুরে জনপদ। ফলে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে নানা রোগে আক্রান্ত কিশোরী মাসহ অপুষ্টিজনিত রোগাক্রান্ত শিশুর সংখ্যা।
জনপ্রতিনিধিসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনায় জানা যায়, করোনা মহামারীর সময় এ এলাকায় যত বিয়ে হয়েছে, এর প্রায় ৬৫ ভাগই ছিল বাল্যবিয়ে। কিছু ইউপি সদস্য ভোটের চিন্তা করে বাল্যবিয়েতে মৌন সম্মতি দিয়ে থাকেন। প্রশাসন যাতে বাল্যবিয়ের খবর না পায় সেজন্য গ্রাম পুলিশদের ম্যানেজ করা হয়। অনেক পরিবার ভুয়া জন্মনিবন্ধন সনদ বানিয়ে কাজীসহ মসজিদের কিছু ইমাম কিংবা মোয়াজ্জেমকে দিয়ে বিয়ে পড়িয়ে থাকে।
কলাপাড়া উপজেলার কমরপুর গ্রামের হালিমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাবার অভাবের সংসার। কোনো কিছু বোঝার আগেই বিয়ে হয়ে গেল। নতুন পরিবেশ, নতুন জীবন। সামলে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। বাবার সংসারে যে অভাব দেখেছি স্বামীর সংসারেও তাই। এখন চার সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে চলছে জীবন। সারা বছর অসুস্থতায় ভুগছি। এ বয়সেই এখন শরীর চলে না। এ নিয়ে স্বামী ও শ্বশুর পরিবারের সঙ্গে বিত-া লেগেই থাকে।
হালিমা আরও বলেন, ইচ্ছে ছিল পঞ্চম শ্রেণি পাস দেব। হাই স্কুল, কলেজ পাস দিয়ে চাকরি করব। দীর্ঘ নিঃশ্বাস আর চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলেন, এজন্য প্রথম দিকে বাবার ওপর ভীষণ রাগ হতো। এখন ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছি। সন্তানদের পড়াও মনে হয় হবে না।
কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. চিন্ময় হাওলাদার বলেন, বাল্যবিয়ের পরিণতিতে কিশোরী মা হওয়ায় বাড়ছে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার। উন্নত জাতি গঠনে যা প্রধান বাধা।