নিউজ অ্যাঙ্গেল

অমিতস্পর্শে তৈরি হতো নিউজ অ্যাঙ্গেল

‘আগামীকালের জন্য একটা নিউজ বানান পাভেল। কোনো নিউজ জমা নেই। কালকের ভরসা আপনি।’

‘কী নিউজ দাদা?’

‘পলিটিক্যাল নিউজ। বললেন, আপনি তো সবসময় নিউজ নিয়েই ঘোরেন। পুরনো নোটবুকে চোখ বোলান, ভালো নিউজ অ্যাঙ্গেল বের হয়ে যাবে।’

পুরো সপ্তাহে কী করি, না করি তা নিয়ে কোনো কথাই চলত না। তার রুমে যাওয়া হতো দিনে কমপক্ষে একবার। তখন গল্প হতো, নিউজ নিয়েও কথা হতো। তবুও সপ্তাহের বৃহস্পতিবার নিউজরুমে আমার টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াতে কখনো ভুল হয়নি তার। বৃহস্পতিবার অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে নিউজ অ্যাঙ্গেল দিয়ে চলে যেতেন। শুক্রবারের পত্রিকায় পলিটিক্যাল নিউজ রাখার চেষ্টা করতেন তিনি। সংবাদপত্র মানে পরের দিনের কাগজে পাঠককে কী দেওয়া হবে সেই প্রস্তুতি আগের দিনই নিতে হয়। সে অনুযায়ী বৃহস্পতিবারের জন্য আমাকেই ভরসায় রাখতেন। তার এ ভরসা রাখার জায়গাটি আমি কখনো অমর্যাদা করিনি। নিউজ অ্যাঙ্গেল পেয়ে গেলে নিউজও হয়ে যেত। তার ভরসাটা আরও পোক্ত হতে থাকল। কাজ দিয়ে দিনে দিনে আমার ওপর ভরসা করা বাড়িয়েছি। আমারও শত, লক্ষ ও কোটিগুণ ভরসা বেড়েছে অমিতদার ওপর।

একজন রিপোর্টার হিসেবে আমার ওপর যিনি খুব ভরসা করতেন বলে জানাতে চেয়েছি তিনি আর কেউ নন, সংবাদপত্র জগতে আড়ালের কারিগর হিসেবে সুখ্যাতি পাওয়া দেশ রূপান্তর সম্পাদক অমিত হাবিব। মিডিয়াকর্মীদের কাছে সুপরিচিত ‘অমিত দা’ বলেই। আমি দাদা বলেই ডেকেছি। গত বছর (২০২২) ২৮ জুলাই রাতে চির আড়ালে চলে যান অমিদ দা (অমিত হাবিব)। কালের কণ্ঠ দিয়ে পথচলা শুরু অমিতদার সঙ্গে। পথ চলেছি দেশ রূপান্তরেও। শেষ পর্যন্ত পথচলা ধরে রাখতে পারিনি। নিয়তির নিয়মে পাড়ি জমিয়েছেন ওপারে, চির আড়ালে। কফিনে মুড়িয়ে অ্যাম্বুলেন্সে বিদায় জানিয়েছি অনন্ত যাত্রায়, অচেনা নগরে।

২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরের ২১-২২ তারিখ হবে। আমি তখন ভোরের ডাক পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে কাজ করি। দেশে সংবাদপত্র জগতে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি পত্রিকা কালের কণ্ঠ। খুব আওয়াজ দিয়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ চলছে। বড় বাজেটের পত্রিকা হওয়ায় নামিদামি সব রিপোর্টার চাকরির চেষ্টা করতে থাকেন নতুন এ প্রতিষ্ঠানে। নামিদামি রিপোর্টারদের অনেকের চাকরিও হয়ে যায়। অমিতদা কালের কণ্ঠের দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুত পত্রিকা বাজারে আনার উদ্যোগ চলে। ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি আত্মপ্রকাশ ঘটে কালের কণ্ঠের। সংবাদপত্র জগতে কিছুসংখ্যক নামিদামি নিয়োগ দিয়ে কিছু উদীয়মান রিপোর্টার খুঁজতে থাকেন অমিতদা। সাংবাদিক সুমন মাহবুব আমার সন্ধান দিলেন অমিতদাকে। ফোন করে সুমন ভাই আমাকে জানালেন, ‘কালকে অমিতদার সঙ্গে দেখা করবেন।’ অমিতদার নাম জানা থাকলেও সামনাসামনি কখনো পরিচিত ছিল না।

সে অনুযায়ী বসুন্ধরা শপিং মলের বেজমেন্টে (কালের কণ্ঠ অফিস) চলে যাই। ভেতরে আনন্দ অনুভূতি হচ্ছিল। বাঘা বাঘা রিপোর্টার সেখানে চেষ্টা করছেন অথচ ডাক পেয়েছি আমি। চাকরি হবে কি হবে না সেই ভয় মোটেও ছিল না। অমিতদার রুমে ঢুকি। অমিতদা নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে সমকাল ছেড়ে কালের কণ্ঠে যোগ দিয়েছেন। দাদা কিছুই বললেন না। জানতে চাইলেন, ‘সিভি (জীবনবৃত্তান্ত) এনেছেন সঙ্গে?’

আমি বললাম, ‘জি দাদা এনেছি।’

জানতে চাইলেন, ‘কত টাকা বেতন পান এখন?’ জানিয়ে দিলাম।

‘কাজ করতে পারবেন তো?’ জিজ্ঞাসা করলেন।

‘পারব’ বলে সায় দিলাম। বেশিদূর গড়ায়নি সে আলোচনা। আমার সায় পেয়েই আস্থা রাখলেন অমিতদা। অবিশ্বাস্য মনে হলেও চাকরি হয়ে গেল কালের কণ্ঠে। সেই থেকে যখন যে নিউজ অ্যাঙ্গেল বলেছেন, একইভাবে সায় দিয়ে গেছি। অমিতদা, কালের কণ্ঠে আমার রিপোর্টার হওয়ার পেছনে অন্যতম ‘ব্রেক থ্রু’। নিউজ অ্যাঙ্গেল দিয়ে মাঠে পাঠিয়ে দিতেন, কাজ শেষ করে নিউজ জমা দিতাম। তার নিউজ অ্যাঙ্গেল নিয়ে কাজ করে রাজনৈতিক অনেক নিউজ আমার আলোচিত হয়েছে। আমাকে কমবেশি পরিচিতি এনে দিয়েছে।

২০১৪ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি একদিন বিকেলে দাদা তার নিজের রুমে ডাকলেন। জানতে চাইলেন ‘দেশের অবস্থা কী? রাজনীতির খবরাখবর কী? এমপি-মন্ত্রীদের অবস্থা দায়িত্ব পালন এসব কোন দিকে।’ জবাবে জানালাম, ‘এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ভীষণ দূরত্ব চলছে। আছে ক্ষমতার দ্বন্দ্বও।’ প্রায় ঘণ্টাখানেক আড্ডা চলছিল দাদার সঙ্গে। ওই আড্ডায় কয়েকজন রিপোর্টারও ছিলেন। এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ভীষণ দূরত্ব ধরে কাজ করেন, দেখেন কী পাওয়া যায়। দাদার দেওয়া অ্যাঙ্গেল ধরে সপ্তাহখানেক কাজ করে শিরোনাম ছাড়া নিউজ জমা দিলাম কালের কণ্ঠের চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব পালন করা আবদুল্লাহ আল ফারুক (সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান) ভাইয়ের হাতে। দুদিন পর এক বিকেলে নিউজটি দাদা হাতে নিয়ে নিউজ রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে পড়ছিলেন আর সিগারেটে ফুঁক দিতে থাকেন। আমাকে বললেন, ‘আরও কিছু কমেন্ট প্রয়োজন।’ এক দিন পরেই তা যোগ করলাম।

২২ অক্টোবর রাতে আমার লেখা নিউজটি ছাপার প্রস্তুতি চলছে কালের কণ্ঠে। কোনো এক ফাঁকে দাদার দেওয়া শিরোনাম দেখলাম ‘চার প্রতিমন্ত্রী, এক উপমন্ত্রী তৃণমূলের কাঠগড়ায়’। প্রতিমন্ত্রীরা হলেন তৎকালীন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও যুব-ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়। ২৩ অক্টোবর কালের কণ্ঠের লিড হলো। সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করল এ নিউজ। বিভিন্ন অচেনা নাম্বার থেকে ফোনে ভয়ভীতি, হুমকিধমকি আসতে থাকল। সাহসের তারিফ ও প্রশংসাও জুটেছে সমানতালে। নিউজে উল্লেখ করা প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর ক্ষমতার চাপে ওই বছরের ৬ নভেম্বর আমাকে চাকরিচ্যুত হতে হয়েছে কালের কণ্ঠ থেকে। কালের কণ্ঠে দাদার সঙ্গে পথচলার অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। কিছুদিন পর দাদাও কালের কণ্ঠের সঙ্গে সম্পর্কের ছেদ ঘটালেন।

২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ। দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে শেষ বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে দলের চূড়ান্ত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন। দেখা যায়, ঘোষিত অনেক প্রার্থীর নাম বদলে যেতে থাকে ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর থেকে। রাজনীতি বিটে কাজ করলেও তখন এত বোঝা হয়নি মনোনয়ন দিয়ে বদলে দেওয়াও একটি খবর। রাতে নিউজরুম থেকে আমাকে রুমে ডেকে পাঠালেন দাদা।

রুমে যাওয়ার পর জানালেন, ‘আওয়ামী লীগ যেসব চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে সেগুলো বদলে যাচ্ছে কেন, জানিয়েছে?’ আমি বললাম, ‘জানায়নি তো।’ বললেন, ‘এটা কেমন কথা? আওয়ামী লীগের মতো দলের কাছে এটা কি জনগণ প্রত্যাশা করে? কাল সারা দিন খোঁজ নেন। কী পাওয়া যায় দেখেন।’ অ্যাঙ্গেল ধরিয়ে দিলেন। পরের দিন দুপুর পর্যন্ত দাদার দেওয়া নিউজ অ্যাঙ্গেল ধরে কাজ করি। খোঁজখবর নিয়ে যেসব তথ্য পেয়েছি, তা দিয়ে মোটামুটি নিউজ তৈরি করি।

দাদা বললেন, ‘নিউজটা আমার হাতে দেবেন।’

কথা অনুযায়ী দাদার হাতেই জমা দিলাম। নিউজের কপি হাতে নিয়ে চোখ বোলাতে শুরু করেন অমিতদা। নিউজরুমে হাঁটাহাঁটি শুরু করেন। কয়েক মিনিট পর নিউজ রুমের বাইরে গিয়ে সিগারেট ধরালেন। তখনো নিউজের দিকেই চোখ। জ¦লন্ত সিগারেট অর্ধেক বাকি রেখে নিভিয়ে ফিরে এলেন নিউজরুমে। আমাকে ডেকে একটি খালি চেয়ার দেখে বসলেন, এডিট করতে শুরু করলেন। হাতেই এডিট শেষ করলেন। পাশে দাঁড়িয়ে আমি তা দেখছি। আমার লেখা নিউজে চোখ বোলালেন মিনিট দশেক। এডিটে সময় নিলেন পাঁচ মিনিট। শিরোনাম দিলেন ‘অদৃশ্য ইশারায় বদলে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন’। নিউজটি কালে কণ্ঠের প্রথম পাতায় সিঙ্গেল কলাম জায়গা পেল। ছাপা হওয়ার পর সিঙ্গেল কলামের সে নিউজ ভীষণ তোলপাড় সৃষ্টি করল।

সাংবাদিক সার্কেলে অমিত দাকে ভালোবাসেন এমন সংখ্যা অনেক। গুণের কথাও নির্মোহভাবে শুনি তাদের অনেকের কাছেই। সংবাদপত্র সাজাতে যত রকম ক্যারিশমার দরকার হয় তার সবই অমিত দার ছিল দাবি করে মোস্তফা মামুন (ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দেশ রূপান্তর) এখনো দাদার যে কাজগুলোর কথা শোনান, তাতে চমকে উঠতে হয়।

 

এই হলো অমিতদার নিউজ অ্যাঙ্গেল। দাদা নেই, অচেনা নগরীতে বসবাস করছেন জানি। এখনো অবচেতন মনে ভরসা করি, নিউজের অ্যাঙ্গেল চেয়ে নিই অমিতদার কাছ থেকে। যতদিন নিউজ করব, অ্যাঙ্গেল নেব আমার ভেতরে শ্রদ্ধার আসনে বসে থাকা প্রিয় দাদার কাছ থেকে। 

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ রূপান্তর