গণমাধ্যমে দক্ষ ও সম্ভাবনাময় কর্মীসংকট চলছে। অমিত হাবিব বিষয়টি খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছেন। অনেক পত্রিকার সম্পাদক বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। বরং তারা ভালো কর্মীদের নিজেদের প্রতিষ্ঠানে আনতে বেতন দ্বিগুণ-তিনগুণ করে দিচ্ছেন। এমন সময় অমিত হাবিব দেশ রূপান্তর প্রতিষ্ঠার কাজে মনোযোগ দিয়েছেন। বেছে বেছে কর্মী নিয়োগ দিচ্ছেন। কিছু বিটে লোক না নিয়েই তাকে দেশ রূপান্তর ছাপা শুরু করতে হয়েছে। তবে শুরুর পর তিনি প্রতিটি বিট পূর্ণ করতে চেষ্টা করতে থাকলেন।
বাণিজ্য বিভাগ বর্তমানে দৈনিক পত্রিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। এখান থেকে ভালো নিউজও যেমন আসে, তেমনি পত্রিকার আয়ের বড় উৎসও এই বিভাগ। বাণিজ্য বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিটে তখনো কোনো রিপোর্টার নেওয়া হয়নি। বিভাগের জ্যেষ্ঠ এক প্রতিবেদকের সুপারিশে অন্য এক পত্রিকার এক প্রতিবেদককে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকলেন অমিত হাবিব। ওই প্রতিবেদকের রিপোর্টিংয়ের কর্মদক্ষতা নিয়ে অমিত হাবিব যথাযথভাবে খোঁজ নিলেন। সংবাদ সংগ্রহ নিয়ে কোনো কর্মী নিয়োগের সাক্ষাৎকারে যে ধরনের আলোচনা হয়, সেখানেও একই ধরনের আলোচনা হলো। প্রতিবেদকের কাছে সম্পাদক তার বেতনসংক্রান্ত প্রত্যাশা জানতে চাইলেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক তার প্রত্যাশার কথা জানালেন। অমিত হাবিবের কাছে এ বেতনের পরিমাণ বা যাচিত সুবিধাদি সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের কর্মদক্ষতা বা সম্ভাবনার তুলনায় বেশি বলে মনে হলো। তিনি এ পরিমাণ বেতন দিতে রাজি হলেন না।
সংবাদমাধ্যমে কর্মী নিয়োগের এ ঘটনাটি খুবই সাধারণ একটি ঘটনা হিসেবেই থেকে যেত। তবে অমিত হাবিব ওই প্রতিবেদককে এমন কিছু কথা বললেন, যা সাধারণত কোনো সম্পাদক বলেন না। সব সম্পাদক এসব ক্ষেত্রে বনিবনা না হলে বলে দেন যে ঠিক আছে আমরা পারছি না। আপনি অন্য কোথাও চেষ্টা করেন।
অমিত হাবিব ওই প্রতিবেদককে যা বলেছিলেন তার মর্মার্থ হলো সংবাদপত্রে কিছু বিটে ভালো রিপোর্টার সংকট। এর মধ্যে যে কয়জন প্রতিবেদক কর্মরত আছেন, তাদের নিয়ে চলে টানাটানি। ফলে তাদের বেতন বাড়তে থাকে হুহু করে। তাদের এক্সপেক্টেশনও বাড়তে থাকে। তবে সেই এক্সপেক্টেশন অনুযায়ী তারা তাদের মানোন্নয়ন করে না। লেখার মানোন্নয়ন ঘটাতে তারা যতটা চেষ্টা করে তার থেকে বেশি চেষ্টা থাকে তাদের বিভিন্ন পত্রিকার সিনিয়রদের সঙ্গে সম্পর্ক করে এক পত্রিকা থেকে বেতন বাড়িয়ে অন্য পত্রিকায় চলে যাওয়ার। এমনকি তারা অন্য এক পত্রিকা থেকে নিয়োগপত্র হাতে নিয়ে নিজের বর্তমান প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রমোশন বা বেতন বাড়িয়ে নিতে সেই নিয়োগপত্র কাজে লাগান। এ বিষয়গুলো অমিত হাবিবও মেনে নিচ্ছিলেন। তবে একটিবারের জন্য হলেও তিনি এ যন্ত্রণা উগড়ে দিলেন। ওই সাক্ষাৎকারের সময় তিনি সাক্ষাৎকার দিতে আসা প্রতিবেদককে কিছুটা গরমভাবে কথাগুলো শুনিয়ে দিলেন। তাতে ওই প্রতিবেদক কিছুটা কষ্টও পান। ফলে অমিত হাবিবের প্রতিষ্ঠানে তার আর কাজ করা হলো না। তবে ওই প্রতিবেদকও আর বেশিদিন সাংবাদিকতায় থাকলেন না। নিজের বিটসংক্রান্ত একটি সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনে জনসংযোগ বিভাগে যোগদান করলেন।
ঘটনা ২
দেশ রূপান্তরের বাণিজ্য বিভাগের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিটের তখনকার সংবাদকর্মী হঠাৎ করেই চলে গেলেন অন্য প্রতিষ্ঠানে। বিটটি অনেক দিন ধরে ফাঁকা। সম্পাদক অমিত হাবিব প্রতিবেদক খুঁজছেন। কয়েকজনের সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত একটি বাণিজ্যবিষয়ক পত্রিকার এক প্রতিবেদককে নিতে তিনি রাজি হলেন। তার কর্মদক্ষতা নিয়ে তিনি মোটামুটি সন্তুষ্ট ছিলেন। তবে বেতনে এসে আটকে গেল। এটাও অমিত হাবিবের নিয়োগ প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক ঘটনা। তিনি এর আগেও মাত্র ৫০০ টাকার জন্য অনেক সময় কর্মী নিয়োগ দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। এর কারণ এই নয় যে, ৫০০ টাকা তিনি দিতে পারবেন না। একই প্রতিষ্ঠানে সমপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে একজনকে ৫০০ টাকা বেশি বেতন দিলে সেটা টিমের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে। ফলে টিমটি খুব দ্রুত ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এসব কারণে তিনি এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিটটি খালি থেকে গেল আরও কিছুদিন। এর মধ্যে অল্পবয়সী এক প্রতিবেদক ওই বিটে কাজ করতে অমিত হাবিবের কাছে আসলেন। অমিত হাবিব খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন ওই প্রতিবেদক কিছু একটা অনিয়ম করেছে বলে তার বর্তমান প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরি চলে গেছে। বিষয়টি তখন এমনভাবে ছড়িয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক কোনো নিউজ করার মধ্যে দিয়ে আর্থিক লাভবান হয়েছে। যা খুবই নেতিবাচক বা অনৈতিকভাবে দেখা হচ্ছে এবং ওই প্রতিবেদককে কেউ নিয়োগ দিচ্ছে না।
কিন্তু অমিত হাবিব আরও খোঁজ নিলেন। আসল ঘটনা কী, তা জানতে চেষ্টা করলেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক সম্পর্কে এ ধরনের নেতিবাচক কথা কখনই শোনা যায়নি। বিষয়টি খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। খুঁজতে খুঁজতে জানা গেল, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের চাকরি চলে গেছে সত্যি। তবে খুবই অনিয়মতান্ত্রিকভাবে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। কোনো এক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যায় এমন একটি প্রতিবেদন ওই প্রতিবেদক তৈরি করে আনেন। যা সুন্দরভাবে সম্পাদনা হয়ে তার পত্রিকায় ছাপা হয়। ছাপা হওয়ার পর প্রভাবশালী ব্যক্তি যখন নিউজের প্রতিবাদ নিয়ে পত্রিকাটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন পত্রিকার সম্পাদক, উপ-সম্পাদক, সংশ্লিষ্ট বিটের প্রধান সবাই যার যার দায় এড়িয়ে যান। সংবাদ সম্পাদনা ও সংবাদটি ছাপা হবে কি হবে না, তা তারা নির্ধারণ করলেও ছাপার পর সব দায় চাপিয়ে দেওয়া হয় ওই প্রতিবেদকের ওপর। এমনকি প্রতিবেদককে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগও দেওয়া হয়নি। কোনো কারণ দর্শানো নোটিস দেওয়া হয়নি। বিনা নোটিসে তার চাকরি চলে যায়। এমনকি তাকে বরখাস্তের পর তিন মাসের বেতন দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেয়নি সংবাদ প্রতিষ্ঠানটি।
এ ঘটনাটি অমিত হাবিব দেশ রূপান্তরের নিউজরুমে বসে তার সোর্সের কাছ থেকে শোনেন। তখন নিউজ ফ্লোরে দাঁড়িয়ে অমিত হাবিব তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ডান হাতের তর্জনী কিছুটা শক্ত করে উচ্চৈঃস্বরে বলেন, ‘যদি এ ঘটনা সত্য হয়ে থাকে তাহলে আমরা ওই প্রতিবেদকের পক্ষে থাকব। কারণ একটা সংবাদ ছাপার দায় কখনই শুধু প্রতিবেদকের হতে পারে না। বিভাগীয় প্রধান থেকে শুরু করে, উপ-সম্পাদক, সম্পাদক সবাইকেই সংবাদ ছাপার দায় নিতে হবে। কেবল প্রতিবেদককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলে সেটা হবে অন্যায়। আর এ প্রতিবেদকের সঙ্গে সেই অন্যায় করা হলে আমরা তার পক্ষে থাকব। তাকে চাকরি দেব। আপনি শুধু প্রমাণ এনে দেন যে, ওই প্রতিবেদকের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে।’
অবশেষ একটি প্রমাণ আসে অমিত হাবিবের হাতে। তিনি তথ্য-প্রমাণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ওই প্রতিবেদককে দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট বিটে নিয়োগ প্রদান করেন। ওই প্রতিবেদক নতুন উদ্যোমে সাংবাদিকতা শুরু করেন। নিজের বিটের অন্যান্য প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকের মধ্যে কিছুটা তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো প্রতিবেদন সেই প্রতিবেদক করতে শুরু করেন। অল্প সময়ে সেই প্রতিবেদক এমন একটি অবস্থানে আসেন, যা তার বিটের অন্যান্য সাংবাদিকের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ছিল।
লেখক: দেশ রূপান্তরের সাবেক সিনিয়র রিপোর্টার।