পাঙাশ-তেলাপিয়াও কিনতে পারছেন না জয়নাল-জাহেদারা

ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়ার পর থেকে বাসার জন্য মুরগি কেনা হয়নি। মাসে ৩-৪ বার তেলাপিয়া-পাঙাশ কিনতাম (একটু মুচকি হেসে বললেন মানে গরিবের মাছ আর কি)। কিন্ত গত কয়েক মাস ধরে পাঙাশ, তেলাপিয়ার দামও বাড়ছে। ফলে এখন বাজারে গিয়ে মাছের দিকে তাকানোর সাহস হয় না। অথচ ছেলে-মেয়েরা মাছের জন্য আবদার করে। মাছ-মাংস ছাড়া খাইতে চায় না- বলছিলেন রিকশাচালক জয়নাল আবেদিন।

কেবল জয়নাল একা নয় একই অভিমত কাঁঠালবাগান এলাকার জাহেদা বেগমের। তিনি বলেন,বাসায় বাসায় কাজ করি। যে টাকা পাই স্বামীর হাতে তুলে দেই। তার একার টাকায় সংসার চলে না। আগে যখন মুরগির কেজি ১২০-৩০ টাকায় বিক্রি হত তখন মাঝেমধ্যে মুরগি কিনতাম। কিন্ত মুরগির দাম বাড়ার পর চেষ্টা করতাম মাছ কেনার। এখন তাও পারছি না। ফলে ডাল আর সবজি দিয়েই খেতে হচ্ছে।

তবে এ সময় জাহেদা বেগম দুশ্চিন্তার কথা জানালেন। তার মেয়েটা অনেক দিন ধরে অসুস্থ। ডাক্তার বলেছেন মাছ, মাংস, ডিম বেশি করে খাওয়াতে। কিন্ত বাজারে যে দাম, এই সময়ে মাছ মাংস কই থেকে কিনব? প্রশ্ন রাখেন তিনি।

জয়নাল, জায়েদার মত ঢাকা শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের পরিবারের প্রাণীজ আমিষের প্রধান চাহিদা পূরণ করে পাঙাশ, তেলাপিয়া,সিলভার কার্প কিংবা চাষের কইয়ের মতো মাছ। এই মাছগুলোর দাম কম থাকায় তারা সহজে কিনতে পারতেন। কিন্তু দিনে দিনে এই মাছের দামও এখন নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশে পাঙাশের বার্ষিক উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা আড়াই গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টনে।

একই সময়ে তেলাপিয়ার উৎপাদন ৯৭ হাজার ৯০৯ টন থেকে বেড়ে ৩ লাখ ২৯ হাজার টন হয়েছে। কইয়ের উৎপাদন ৩৫০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৫৭ হাজার ২৪৪ টন।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২৪০-২৫০ টাকায়, পাঙাশ ২০০ টাকায় এবং কই ২৬০-৭০ টাকায়।

মাছের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবির) ফিশারিজ, অ্যাকোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের ডিন ড. এ. এম. সাহাবউদ্দিন বলেন, পাঙাশ, তেলাপিয়া এখন আর গরিবের মাছ নয়। আমাদের দেশে তুলনামূলকভাবে এই মাছের দাম একটু কম হওয়ায় প্রান্তিক মানুষ সহজে কিনতে পারে। যা তাদের আমিষ, প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করে। বর্তমানে এর দাম বাড়ছে। এটা কিন্ত উদ্বেগের বিষয়। প্রান্তিক পরিবারের নারী ও শিশুরা এমনিতেই পুষ্টি সংকটে ভোগে। এখন এই মাছের দাম তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে গেলে পুষ্টি সংকট আরও বাড়বে।

দাম বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক এম. সাহাবউদ্দিন বলেন, খামার থেকে বিভিন্ন হাত বদল হয়ে বাজারে মাছ নিয়ে আসার সময় দাম বেড়ে যায়। খামার থেকে বাজার এর মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা যত বেশি হবে দাম তত বাড়বে।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে মাছের ফিড বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বাণিজ্যিক পর্যায়ে ব্যবহার হওয়া মাছের ফিডের অনেকাংশই এখনও বিদেশ থেকে আমদানি হয়ে থাকে। ফলে মাছ উৎপাদনের খরচ বেশি হয়।

মাছের খাবার তৈরির সক্ষমতা বৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের সংখ্যা কমানো গেলে দাম নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা যাবে বলে জানান এম. সাহাবউদ্দিন। তিনি বলেন, এসব মাছের খাবারের রেসিপি কিন্ত খুব বেশি নয়। আমাদের কাছ থেকে কিংবা বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে রেসিপি নিয়ে দেশে খাবার তৈরি করতে পারলে দাম কমবে। দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান মাছের ফিড তৈরি করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হবে। তাহলে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে।