দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীর চোখের আলো ‘থার্ড আই’

দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের জীবন অনেক কঠিন। অন্যের ওপর নির্ভর করেই চলে তাদের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষাজীবন। ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ালেখা চালিয়ে নেওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। উচ্চশিক্ষার বইগুলোর নেই ব্রেইল ভার্সন। পরীক্ষার সময় নির্ভর করতে হয় শ্রুতিলেখকের ওপর। অনেক সময় পাওয়া সম্ভবও হয় না। নানা প্রতিবন্ধকতায় তারা বঞ্চিত হন আশানুরূপ ফলাফল থেকে। দৃষ্টিহীন সহপাঠীদের এসব সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী গড়ে তুলেছেন ‘থার্ড আই’। সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবামূলক ও অলাভজনক এই সংগঠন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহায়তা করছে দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের। লিখেছেন অহিদুল ইসলাম অন্তর

ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মাসরুর ইশরাক নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যায় পড়তে দেখতেন। দৃষ্টিহীনরা সাধারণ বই পড়তে পারেন না। কেউ পড়ে শোনালে তারা শুনে শুনে আত্মস্থ করার চেষ্টা করেন। এখন মোবাইল বা রেকর্ডারে পড়া রেকর্ড করে রাখা সম্ভব হলেও ঢাউস ঢাউস এসব বই কে তাদের অডিও বুক করে দেবে! তারপর আছে পরীক্ষার সময় শ্রুতিলেখক পাওয়ার সংগ্রাম। দৃষ্টিহীনরা পরীক্ষার খাতায় নিজে লিখতে পারেন না বলে তাদের অন্য লেখকের শরণাপন্ন হতে হয়। তারা প্রশ্নের উত্তর হিসেবে যা বলেন শ্রুতিলেখকরা সেটাই খাতায় লেখেন। দৃষ্টিহীন সতীর্থদের এমন বিড়ম্বনা দেখে মাসরুর ইশরাক সিদ্ধান্ত নেন তাদের জন্য কিছু করার।

থার্ড আইয়ের যাত্রা শুরু যেভাবে

দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের সহযোগিতার জন্য কী করবেন তা প্রথমে বুঝতে পারছিলেন না। প্রাথমিক চাহিদা যেমন অডিও বুক তৈরি ও শ্রুতিলেখক সরবরাহ এই দুটি নিয়ে কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গ্রুপে আলোচনার প্রস্তাব দেন। ২০১৯ সালের ১৬ জানুয়ারি দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের নিয়ে আলোচনায় বসেন তারা। আলোচনা শেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে গঠিত হয় ‘থার্ড আই’। প্রথম বৈঠকে ২০ জনের মতো উপস্থিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত থার্ড আই প্রতিষ্ঠায় ছিলেন চারজন। থার্ড আইয়ের এই চার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মাসরুর ইশরাক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সাবিরা আহমেদ সারা, লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী রিদওয়ান আফরিন মীম ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের হারুন-অর-রশিদ।

প্রথম উদ্যোগ

মাসরুর ইশরাক জানান, প্রথম ধাপে ২০১৯ সালে নিজ ব্যাচের এবং প্রথম বর্ষের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ শুরু করেন তারা। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীর কাছে যান তারা। মাসরুর ইশরাক জানান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০০ জন শিক্ষার্থীসহ চট্টগ্রামের প্রায় পাঁচশজন শিক্ষার্থীকে সেবা দিয়েছে থার্ড আই।

থার্ড আইয়ের সেবাসমূহ

দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের সেবা দিয়ে থাকে থার্ড আই। এরমধ্যে রয়েছে পাঠ্যবইয়ের অডিও রেকর্ডিং সেবা, বিনামূল্যে শ্রুতিলেখক সরবরাহ, স্কিল ডেভেলপমেন্ট ট্রেইনিং, সৃজনশীল কাজের প্রসার ঘটানো, সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম ও হিউম্যান লাইব্রেরি।

পাঠ্যবইয়ের অডিও রেকর্ডিং সেবা

পাঠ্যবই, শিক্ষকদের সরবরাহ করা নোট ইত্যাদির অডিও রেকর্ড করে দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেয় থার্ড আই। পরীক্ষার আগে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর অডিও রেকর্ড করে আলাদাভাবে পৌঁছে দেন। এছাড়াও, শিক্ষার্থীদের চাহিদানুযায়ী অন্যান্য যেকোনো বই পড়ার সুবিধার্থে অডিও রেকর্ড করে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন থার্ড আইয়ের স্বেচ্ছাসেবকরা।

শ্রুতিলেখকের সরবরাহ

ক্লাস পরীক্ষা, মিড টার্ম, সেমিস্টার ফাইনালসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের শ্রুতিলেখক হিসেবে সেবা দেন থার্ড আইয়ের স্বেচ্ছাসেবকরা। ফলে দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীরা বেঁচে যাচ্ছেন শ্রুতিলেখক খোঁজার বিড়ম্বনা থেকে।

স্কিল ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং

দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন কাজে দক্ষ করে তোলার প্রকল্প হাতে নিয়েছে থার্ড আই। এরমধ্যে রয়েছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, স্পোকেন ইংলিশসহ নানা প্রশিক্ষণ। ইতিমধ্যে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সহায়তায় ৪৫ জন দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীকে জীবনবৃত্তান্ত লেখার ওপর দুদিনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে থার্ড আই। ধীরে ধীরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সব দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

সৃজনশীল কাজে সহায়তা করা

দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের অনেকেই কবিতা আবৃত্তি, গান কিংবা নাটকে ভালো। এসব সৃজনশীল কাজের উৎসাহ দেওয়া ও তাদের কাজগুলো সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে সৃজনশীল কাজে সহায়তা করে থার্ড আই। ইতিমধ্যে দুজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অডিও নাটক নির্মাণ করেছে থার্ড আই। পরবর্তী সময়ে যা থার্ড আইয়ের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে।

হিউম্যান লাইব্রেরি

দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন মানুষ পৃথিবীকে যেভাবে অনুভব করতে পারে সেভাবে অনুভব করতে পারে না দৃষ্টিশক্তি হারানো ব্যক্তিরা। থার্ড আই-হিউম্যান লাইব্রেরি নামে এমন একটি উদ্যোগ নিয়েছে যেখানে দৃষ্টিশক্তি হারানো শিক্ষার্থীদের সাধারণ মানুষের মতো অনুভবের প্রয়াসে কাজ করছে। অর্থাৎ একজন মানুষ যেভাবে পৃথিবীর আলো দেখছে, পৃথিবীকে উপলব্ধি করতে পারছে অথবা বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করছে তার পুরোটাই তুলে ধরা হচ্ছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের কাছে। এতে করে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর চোখের মতো কাজ করছে ‘থার্ড আই’।

থার্ড আইয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে চাইলে

থার্ড আইয়ের ত্রিশ জনের সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবক কমিটি রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় ৩০০ জন স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত আছেন তাদের সঙ্গে। বাংলাদেশের যে কেউ থার্ড আইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করতে পারবে। এর জন্য থার্ড আইয়ের ফেসবুক পেইজে (Third Eye) বার্তা পাঠিয়ে অথবা পেইজের হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত হতে পারবেন। থার্ড আই-এর সেবা নিতে চাইলে একই হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে। সেবার বিনিময়ে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা দিতে হয় না বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা মাসরুর ইশরাক। ভবিষ্যতে দৃষ্টিহীনদের সহযোগিতায় মোবাইল অ্যাপস আনবে থার্ড আই। সংগঠকদের স্বপ্ন ‘থার্ড আই’ একদিন দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও সেবা দেবে।

আর্থিক ব্যয়ের খাত

থার্ড আইয়ের স্বেচ্ছাসেবকরা বিনামূল্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শ্রুতিলেখক অথবা সহায়ক হিসেবে কাজ করায় তেমন কোনো আর্থিক ব্যয় হয় না সংগঠনে। তবে অন্যান্য ব্যয় বিভিন্ন পুরস্কারের অর্থে এবং সহায়ক প্রতিষ্ঠান ‘থার্ড আই হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট’ থেকে পাওয়া লভ্যাংশের একটি অংশ দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানান প্রতিষ্ঠাতা মাসরুর ইশরাক।