বঙ্গবন্ধু পুত্র শহীদ শেখ কামালের স্বপ্নে গড়া ক্লাব আবাহনী। যে ক্লাবটিকে তিনি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এশিয়ার শীর্ষ পর্যায়ে। মাত্র ২৬ বছর বয়সেই দেখেছিলেন আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। অথচ শেখ কামালের সেই স্বপ্নের আবাহনীর এখন নাজুক দশা। দেশের ফুটবল পেশাদার যুগে পা দেওয়ার পর সবচেয়ে সফল দল হয়েও শেষ চার-পাঁচটি মৌসুমে জীর্ণদশা আকাশি-হলুদ জার্সিধারীদের। ফুটবলের হারানো জায়গাটা ফিরে পাওয়ার আগ্রহটাই যেন হারিয়ে ফেলেছেন ক্লাবটির ফুটবল কর্তারা। টানা চার মৌসুম প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জেতা হয়নি। চোখের সামনে তাদের হটিয়ে দেশের ফুটবলে এখন সবচেয়ে সফল ও ধারাবাহিক দল বসুন্ধরা কিংস। কেবলমাত্র পেশাদারি পথে হেঁটে সাফল্যের শতভাগ ছুঁয়ে ফেলেছে ক্লাবটি। তাদের চ্যালেঞ্জ জানানোর শক্তি বা ইচ্ছে কোনোটাই নেই আবাহনীর। লিগে দ্বিতীয় স্থানটা পেলেই যেন খুশি ধানম-ি জায়ান্টরা। ফি বছর শক্তি হারানো আবাহনীর মধ্যে এক নম্বর দল হওয়ার প্রবণতাটাই হারিয়ে গেছে যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে। এ মাসেই দলটি এএফসি কাপের প্রাক-বাছাইপর্বে অংশ নেবে। আগের তিনবার প্রাক-বাছাইপর্ব থেকে বিদায় নেওয়া আবাহনীকে এবারও যে একই পরিণতির মুখে পড়তে হবে, তা তাদের ভাঙাচোরা দল দেখেই বলে দেওয়া যায়।
প্রথমবারের মতো বসুন্ধরা কিংস খেলতে যাচ্ছে এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রাক-বাছাইপর্ব। সেটা ক্লাবটি পেরেছে শেষ তিন মৌসুমে এএফসি কাপের গ্রুপপর্বে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্স ও ২০১৯ সালে আবাহনীর ইন্টার জোন প্লে-অফ সেমিফাইনাল খেলার কারণে। এ দুইয়ের সংমিশ্রণে ক্লাব র্যাংকিংয়ে শ্রেয়তর অবস্থানে থাকায় কিংসের সামনে খুলেছে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার দরজা। আর সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে দেশি-বিদেশি সেরাদের দলে নিয়ে তারা ১৫ আগস্ট ঝাঁপাবে শারজা এফসির বিপক্ষে। নিজেদের তুণে আগে থেকেই শক্তিশালী সব অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও কিংস শক্তি বাড়িয়েছে ভালোমানের বিদেশি যোগ করিয়ে। র্যাংকিং বলেন কিংবা শক্তি সব দিক থেকেই এগিয়ে থাকা শারজা এফসিকে ফাঁকা মাঠে গোল দিতে চায় না আবির্ভাবের পর টানা চারটি লিগ শিরোপা জিতে রেকর্ড গড়া কিংস।
আর যদি চোখ রাখেন আবাহনী শিবিরে, নিশ্চিতভাবে হতাশ হবেন। ১৬ আগস্ট তারা সিলেটে মুখোমুখি হবে মালদ্বীপের ঈগল এফসির বিপক্ষে। সেই ম্যাচটা যদি জিতেও নেয় আবাহনী, গ্রুপপর্বের টিকিট পেতে তাদের পেরুতে হবে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ ভারত জায়ান্ট মোহনবাগানের হার্ডল। ২০১৯ সালে দুর্দান্ত ফুটবলে গ্রুপসেরা হয়ে ইন্টার জোন প্লে-অফ সেমিফাইনালে নাম লিখানো আবাহনীর স্বপ্নযাত্রা থেমেছিল উত্তর কোরিয়ার এপ্রিল ২৫ দলের কাছে ফিরতি পর্বে ২-০ গোলে হেরে। ঘরের মাঠে অবশ্য শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে দিয়ে চমক দেখায় আবাহনী। সেই স্বপ্নীল পারফরম্যান্সের পর ২০২০ সালে আবাহনীর বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দেয় মালদ্বীপের মাজিয়া স্পোর্টস। দুই লেগে প্রতিপক্ষের মাঠে গোল করার সুবাদে মাজিয়া যায় পরের ধাপে। এরপর ২০২১ সালে করোনার অজুহাতে খেলেনি আবাহনী। বাই পেয়ে পরের ধাপে খেলে ক্লাব ঈগল। আর সর্বশেষ ২০২২ সালে প্রাক-বাছাইয়ে মোহনবাগানের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয় আবাহনীকে। এ বছরও মোহনবাগান হয়ে যেতে পারে তাদের প্রতিপক্ষ। তবে তার আগে তাদের ১৬ আগস্ট জিততে হবে ক্লাব ঈগলের বিপক্ষে। এই ম্যাচের প্রস্তুতি ২৯ জুলাই শুরু করা আবাহনী অবশ্য শক্তি বাড়াতে যাদের দলে নিয়েছে, তাদের গেল লিগের পারফরম্যান্স মোটেও বলার মতো কিছু নয়।
এএফসির নতুন নিয়ম অনুযায়ী টুর্নামেন্টগুলোতে একটি দল সর্বোচ্চ ছয়জন বিদেশি খেলাতে পারবে। আর চুক্তি করতে পারবে যত ইচ্ছা তত। সেই সুযোগটা কিংস নিয়েছে উজবেকিস্তান জাতীয় দলে খেলা ডিফেন্ডার ববুরবেক যুলদাশভ, শেখ রাসেলের আইভরিয়ান মিডফিল্ডার চার্লস দিদিয়ের ও রহমতগঞ্জের উজবেক ডিফেন্ডার শখরুখবেক খলমাতভকে। এর সঙ্গে আগে থেকেই ছিলেন তিন ব্রাজিলিয়ান রবসন রবিনহো, মিগেল ফিগেইরা ও ডরিয়েলটন গোমেজ এবং উজবেক মিডফিল্ডার আসরর গফুরভ। কেবল তাই নয়, সর্বশেষ জাতীয় দলে খেলা ফর্টিজ এএফসির দুই তরুণ মজিবুর রহমান জনি ও রফিকুল ইসলামকেও দলে নিয়েছে কিংস।
সেই তুলনায় আবাহনীর অবস্থা অথৈবচ। গত মৌসুমে দলটির আক্রমণভাগে খেলা কোস্টারিকান ফরোয়ার্ড দানিয়েল কলিনদ্রেস, ব্রাজিলিয়ান প্লে-মেকার রাফায়েল আগুস্তো ও নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার পিটার নওরাহকে পাচ্ছে না দলটি। পুরনোদের মধ্যে সিরিয়ার ডিফেন্ডার ইউসেফ মোহাম্মদ ও নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড এমেক ওগবাহকে রেখেছে দলটি। এর বািইরে চিরবৈরী মোহামেডান থেকে উজবেক মিডফিল্ডার মুজাফফর মুজাফফরভকে, চট্টগ্রাম আবাহনীর ফরোয়ার্ড ডেভিড ওজুকু, একই দলের মিসরের মিডফিল্ডার মোস্তফা কাহারবা ও ফর্টিজ এফসির ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার দানিলো আগুস্তোকে দলে নিয়েছে আবাহনী। যাদের একজনেরই গেল লিগে ছিল না বলার মতো পারফরম্যান্স। এর মধ্যে মোস্তফা কাহারবার মতো আলোচিত ও বেশি বয়সী ফুটবলারকে দলে নিতে দেখে বিস্মিত হয়েছেন শত শত সমর্থক। তাদের শঙ্কা এমন নিম্নমানের ফুটবলারদের নিয়ে গড়া দলকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমূহ লজ্জার মুখেই পড়তে হবে। তাতে অবশ্য ক্লাবটির ফুটবল কর্তাদের তেমন কিছু যাবে আসবে না। তাদের কাছে যে ক্লাবের সাফল্যের চেয়ে ব্যক্তি স্বার্থটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জবাবদিহি নেই বলে তারা রীতিমতো ছেলেখেলা খেলছে দেশজুড়ে লাখো সমর্থকের আবেগ নিয়ে।
গতকাল দুজন ব্রাজিলিয়ান ফূটবলার ব্রুনো মাতোস ও জোনাথন রাইস যোগ দিয়েছেন আবাহনী শিবিরে। দুজনই আক্রমণভঅবের খেলোয়াড়। এছাড়া এশিয়ান কোটায় আরেকজন আসবেন বলে জানান আবাহনী পর্তুগিজ কোচ মারিও লেমস।
অথচ প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামাল এই আবাহনীর মাধ্যমেই আধুনিক ফুটবলের প্রবর্তন ঘটিয়েছিলেন দেশের ফুটবলে। মানসম্মত বিদেশি কোচ, খেলোয়াড় এনে, নামি-দামি ব্র্যান্ডের ক্রীড়া সরঞ্জামাদিতে খেলোয়াড়দের সুসজ্জিত করে আবাহনীকে একটি আধুনিক ক্লাব হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। গেল শনিবার ছিল শেখ কামালের ৭৪তম জন্মবার্ষিকী। বরাবরের মতো আবাহনী সমর্থকগোষ্ঠী ক্লাব প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠাতার জন্মদিন পালন করে। সেখানে বরাবরের মতোই প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছুটিয়েছেন আবাহনীর কর্তারা। তবে ওই একদিনই। প্রতিশ্রুতি থেকে যায় প্রতিশ্রুতির জায়গায়। আর দেশজুড়ে হাজারো আবাহনী দর্শক-সমর্থকের সঙ্গী হয় হতাশা। এমন আবাহনী নিশ্চয় চাননি শেখ কামাল!