ফেনীতে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে অন্তত ৮ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পাশাপাশি পানিবন্দি হয়ে পড়েছে দুই শতাধিক পরিবার। এ ছাড়া ১২০ হেক্টর রোপা আমন এবং ১০ হেক্টর বীজতলা পানির নিচে রয়েছে।
জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৫২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস।
ফেনীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ফুলগাজী-পরশুরাম) মো. মনির আহমেদ বলেন, সোমবার (৭ আগস্ট) সকাল ৯টা পর্যন্ত ফুলগাজী ও পরশুরামে মুহুরী নদীতে বিপদসীমার ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে মুহুরী,কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বেড়িবাঁধের ২০ টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। এরইমধ্যে মুহুরী নদীর ফুলগাজী উপজেলার উত্তর দৌলতপুর ও উত্তর বরইয়া অংশে অন্তত ১০ মিটার করে ভেঙে গেছে।
ফুলগাজী সদর উপজেলার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার (সদস্য) জামাল উদ্দিন বলেন, মুহুরী নদীর বেড়িবাঁধের দুইটি স্থান ভেঙে উত্তর বরইয়া, বিজয়পুর, কিসমত বিজয়পুর, দক্ষিণ বরইয়া, জগৎপুর, উত্তর দৌলতপুর, দক্ষিণ দৌলতপুর, বনিকপাড়াসহ অন্তত ৮ গ্রামের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নিচু স্থানের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শত শত মানুষ।
উত্তর বরইয়া গ্রামের বাসিন্দা এনামুল হক বলেন, প্রবল বর্ষণ ও পানিতে আজ ভোর চারটার দিকে মুহুরী নদীর বেড়িবাঁধের ১০ মিটার ভেঙে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সেচ প্রকল্পের পাইপ বাঁধের নিচ দিয়ে নেওয়ার সময় বাঁধ সংলগ্ন স্থানে বালু উত্তোলন, বড় ইঁদুরের গর্ত তৈরির কারণে বাঁধ ভেঙে যায়।
পঞ্চাশোর্ধ্ব রহিমা বেগম বলেন, ঘরের একদিক দিয়ে পানি ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বের হচ্ছে। নদীর পানি ঘরে প্রবেশ করে আসবাবপত্রসহ সব মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রান্না চুলা পানিতে ডুবে গেছে। সকাল থেকে রান্না করতে পারিনি।
উত্তর বরইয়া গ্রামের আনোয়ার হোসেন বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতির কারণে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ভেঙ্গে পানিতে তলিয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম। আমাদের কান্না কেউ শুনতে পায় না। সকালে হঠাৎ করে বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। ঘরে হাঁটু পরিমাণ পানি। বই-খাতা সব পানিতে ভিজে গেছে।
ফুলগাজী উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা কে এইচ এম মনজুরুল ইসলাম বলেন, এ বন্যায় ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার প্রায় ১২০ হেক্টর রোপা আমন এবং ১০ হেক্টর বীজতলা পানির নিচে রয়েছে। এ ছাড়া মানুষের সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি থাকায় এখনো ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ হয়নি, পানি কমলে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হবে।
ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানিয়া ভূইয়া ২০০ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আরিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, টেকসই বাঁধ মেরামতের জন্য ৭৩১ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শুরু হবে নিরীক্ষণ শেষে। নদীতে পানির প্রবাহ কিছুটা কমে আসলে ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামত করা হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ শাহরিয়ার জানান, মুহুরী-কহুয়া-সিলোনীয়া নদ-নদীর দু'পাশে ১২২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। বাঁধের যে কয়েকটি স্থান ভেঙেছে পানি একটু নেমে গেলে ভাঙন কবলিত স্থানগুলো মেরামত করা হবে। বাঁধের আর কোন স্থান যেন না ভাঙে সেজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা তৎপর রয়েছে।
ফেনী জেলা প্রশাসক মোছাম্মদ শাহীনা আক্তার বলেন, জেলা প্রশাসন থেকে নিয়মিত মনিটর বরা হচ্ছে। বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। প্রাথমিকভাবে তাদের জন্য ২ লাখ টাকা ও সাড়ে তিন মেট্রিক টন চাউল বরাদ্দ দিয়েছি। পানিবন্দী মানুষের জন্য শুকনো খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিভিন্ন বিভাগের সাথে সমন্বয় করে এই বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।