চাহিদা ৫ গুণ সরবরাহে হিমশিম

দেশে ডেঙ্গু রোগীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতেও শিরায় দেওয়ার স্যালাইনের চাহিদা বেড়েছে। সরকারি পর্যায়ে স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ থাকায় বেসরকারি ওষুধ কোম্পানি থেকে কিনে সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করছে সরকারের ওষুধ কোম্পানি এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)। কিন্তু চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে হাসপাতালগুলোতে স্যালাইন সরবরাহ করে কুলিয়ে উঠতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।

ইডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে যেখানে সব ধরনের স্যালাইন লেগেছে ৬০ লাখ ব্যাগ, অর্থাৎ মাসে ৫ লাখ ব্যাগ। গত দুই মাসে সেই চাহিদা গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ব্যাগ। সে হিসাবে ডেঙ্গুর জন্য স্যালাইনের চাহিদা বেড়ে হয়েছে ১০ গুণ।

পরিস্থিতি সামাল দিতে স্যালাইন সরবরাহে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোকে। রাজধানীর ডেঙ্গু ডেডিকেটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব হাসপাতালে আড়াই থেকে সর্বোচ্চ ৫ গুণ পর্যন্ত স্যালাইনের চাহিদা বেড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের স্যালাইন সংকট দেখা দেয়নি। পাশাপাশি ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতেও দেড় থেকে তিন গুণ পর্যন্ত স্যালাইনের চাহিদা বেড়েছে।

স্যালাইনের চাহিদা বৃদ্ধি ও সরবরাহ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ইডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক ডা. এহসানুল কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে আমরা সরবরাহে কুলাতে পারছি না। যেহেতু সরকারি পর্যায়ে স্যালাইন উৎপাদন হয় না, তাই বাজার থেকে সংগ্রহ করে দিতে হয়। যেসব কোম্পানি দিচ্ছে, তাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। তাদের খোলাবাজারেও বিক্রি করতে হয়। সবকিছু মিলে বেশ কঠিন অবস্থা। তবে সরকারি হাসপাতালগুলো যেটুকু চাইছে, এখন পর্যন্ত সেটা দিতে পারছি, অসুবিধা হচ্ছে না।’

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ‘সরবরাহে যাতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে বা কোথাও কোনো সংকট দেখা না দেয়, সে জন্য আমরা স্যালাইন প্রস্তুতকারক কোম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি এবং নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। তারা এখন দিনে-রাতে তিন শিফট, অর্থাৎ ৮ ঘণ্টা করে ২৪ ঘণ্টা উৎপাদন করছে। আশা করছি এভাবে চলতে থাকলে চাহিদা অনুযায়ী স্যালাইন সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না।’

সরকারি পর্যায়ে চাহিদা ১০ গুণ :  ইডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, আগে যেখানে মাসে লাগত ৫ লাখ ব্যাগ, এখন লাগছে ৫০ লাখ ব্যাগ। তাই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া খুব কঠিন হয়েছে। তবে স্যালাইনের তেমন সংকট এখনো কোথাও নেই।

এ ব্যাপারে ইডিসিএলের জেনারেল ম্যানেজার (মার্কেটিং) জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডেঙ্গুর কারণে স্যালাইনের চাহিদা অস্বাভাবিক বেড়েছে। এমনিতেই এত চাহিদা থাকে না। কিন্তু ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। ঢাকায় ডেঙ্গু বেশি। তাই এখানে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের স্যালাইনের মধ্যে আইভি ফ্লুইড স্যালাইন বেশি দেওয়া হচ্ছে।

এই কর্মকর্তা জানান, দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিকসহ সারা দেশের ১ হাজার ১০০-এর মতো সরকারি হাসপাতালে স্যালাইন সরবরাহ করে ইডিসিএল। তিনি বলেন, ‘আমরা ছয়টি বেসরকারি কোম্পানি থেকে স্যালাইন কিনে সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করি। এগুলো হলো বেক্সিমকো, ওরিয়ন ইনফিউশন, লিব্রা ইনফিউশন, অপসোনিন, পপুলার ও দ্য একমি ল্যাবরেটরিজ। চার-পাঁচ বছর ধরে এসব কোম্পানি থেকেই কেনা হয়।’ তিনি জানান, ইডিসিএলকে ১২৮ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করতে হয়। এর মধ্যে স্যালাইন একটি।

ইডিসিএলের নতুন প্ল্যান্টে নভেম্বর থেকে উৎপাদন : এ বছরের নভেম্বর থেকে গোপালগঞ্জে ইডিসিএলের নতুন প্ল্যান্টে স্যালাইন উৎপাদন শুরু হবে বলে জানিয়েছেন ইডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, ‘গোপালগঞ্জের প্ল্যান্ট ডিসেম্বরের মধ্যেই চালুর মেয়াদ। আমরা আশা করছি অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে সেখানে উৎপাদন শুরু করতে পারব। এই প্ল্যান্টে সব ধরনের স্যালাইনই তৈরি করা হবে।’

এ ব্যাপারে ইডিসিএলের জেনারেল ম্যানেজার বলেন, ‘গোপালগঞ্জে নতুন প্ল্যান্টে প্রথম বছর ৫০ লাখ ব্যাগ স্যালাইন তৈরি করতে পারব আশা করছি। চাহিদা বেড়ে গেলে পরে সেই প্ল্যান্টে আরেকটি মেশিন স্থাপন করা হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ের মেশিন স্থাপনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।’

সরকারি উৎপাদন বন্ধ : চার বছর ধরে দেশে সরকারি পর্যায়ে স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ। এর আগে সরকারি পর্যায়ে রাজধানীর জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে (আইপিএইচ) ২২ ধরনের স্যালাইন, ব্লাডব্যাগ ও ট্রান্সফিউশন সেট উৎপাদন হতো। এতে বছরে ১ লাখের বেশি ব্লাডব্যাগ তৈরি হতো, যা দেশের মোট চাহিদার ৭ ভাগের ১ ভাগ এবং উৎপাদন করত বিভিন্ন ধরনের ১৪ থেকে ১৭ লাখ ব্যাগ স্যালাইন। কিন্তু ২০১৯ সালের আগস্টে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করে সব ধরনের স্যালাইন উৎপাদন, মজুদ, সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ করে দেয়।

এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানের এক সাবেক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস বা জিএমপি অনুযায়ী মানসম্পন্ন স্যালাইন উৎপাদন হচ্ছে না কারণ দেখিয়ে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ প্রতিষ্ঠান যত জায়গায় স্যালাইন সরবরাহ করেছে, কোথাও কারও কোনো সমস্যা হয়নি।’

ঢাকার হাসপাতালে চাহিদা সর্বোচ্চ পাঁচ গুণ : এ ব্যাপারে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. খলিলুর রহমান বলেন, ‘এখন প্রতিদিন ৪০০-৫০০ ব্যাগ স্যালাইন লাগছে। আগে লাগত সর্বোচ্চ ১০০ ব্যাগ। ডেঙ্গুর কারণে চাহিদা পাঁচ গুণ বেড়েছে। আমরা ভর্তি রোগীর সবাইকে স্যালাইন দিই।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. নাজমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীর কারণে স্যালাইনের চাহিদা দ্বিগুণ বেড়েছে। আগে আমাদের প্রতি মাসে ৬০ হাজার ব্যাগ স্যালাইন লাগত, এখন ১ লাখ ৫ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার ব্যাগ লাগে।’

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড হাসপাতাল) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. কাজী মো. রশীদ উন নবী বলেন, ‘আগে যা লাগত, এখন তার দ্বিগুণ নরমাল স্যালাইন লাগে। আগে যদি দিনে ১ হাজার এমএল পরিমাণের ব্যাগ লাগত ৬০০, এখন সেটা ১ হাজার ২০০, ১ হাজার ১০০ লাগছে।’

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নিয়াতুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের এখানে একজন ডেঙ্গু রোগীর জন্য দুই ব্যাগ স্যালাইন লাগে। ৫০০ রোগী থাকলে প্রতিদিন ১ হাজার ব্যাগ স্যালাইন লাগে। ইডিসিএল থেকে দিচ্ছে। বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে না। সংকটে পড়ব না আশা করছি।’

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. গোলাম কিবরিয়া বলেন, আগের তুলনায় স্যালাইনের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বেশি লাগছে নরমাল স্যালাইন। অনেক সময় ডিএনএস স্যালাইনও লাগে।’

অন্যদিকে বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. মারিয়া হাসান বলেন, ‘জেলায় ডেঙ্গু ও ডায়রিয়া দুই ধরনের রোগী থাকায় স্যালাইনের চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। আমরা ব্যবস্থা করছি। ঢাকা থেকে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করছে। আগের তুলনায় দেড়গুণ চাহিদা বেড়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হচ্ছে না।’