সরকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সবুজ বাংলাদেশ গঠন করতে বদ্ধপরিকর বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি এই লক্ষ্যে নেওয়া সরকারের উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ‘বৃক্ষ রোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান এবং বৃক্ষমেলা-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
বাংলাদেশকে সব প্রাণী ও প্রাণের জন্য নিরাপদ আবাসস্থলে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৃক্ষরোপণ কেবল বনায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, এমন একটি বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, গাছপালা, মাটি, পানি ও বায়ু স্বাভাবিকভাবে সহাবস্থান করতে পারে। বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টা আমাদের একটা নৈমিত্তিক অভ্যাসে পরিণত করতে পারলে একটা স্বাস্থ্যকর বসতি গড়ে তোলা সম্ভব। বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান তৃতীয়তে। এখান থেকে বের হওয়া খুবই জরুরি।
সবুজ বসতি গড়ে তুলতে সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গে একটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন ঢাকা শহরকে যত সবুজ দেখতাম, এখন দেখি না। একজন নবজাতকের পাশাপাশি একটি গাছও বেড়ে উঠুক। এভাবেই এগিয়ে যাক সবুজায়নের সামাজিক আন্দোলন।
যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আমি লন্ডনে যে পাড়ায় থাকতাম, আমার তিন-চারটি বাসা পরে একটা বাসা ছিল, তিনতলা বাসা। সেই বাসার সামনে দুটি গোলাপ গাছ ছিল দরজার দুপাশে। গাছগুলো প্রায় তিনতলা পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। একদিন বাসার মালিকের সঙ্গে আমার দেখা হলো। আমি বললাম, তোমার এই গাছগুলো খুব সুন্দর। দূর থেকে খুবই সুন্দর লাগে। তখন তিনি বললেন, যখন আমার যেই সন্তান জন্ম হয়েছে, তখন তার নামে একটি করে গাছ লাগিয়েছি। দুটো সামনে আছে, একটা বাসার পেছনে আছে। সেদিন থেকে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, দেশে ফিরলে, আমার পক্ষে কখনো সুযোগ হলে এই কথাটি আমি বলার চেষ্টা করব।
পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের কর্মসূচি নিয়েছে। তবে পরিকল্পনা ছাড়া গাছ লাগালে এ লক্ষ্য পূরণ হলেও কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। মাটি ও আবহাওয়া অনুযায়ী গাছগুলো রোপণ করতে হবে। এক্ষেত্রে দেশীয় প্রজাতির গাছ, যেমন: ঔষধি, অর্কিড, বাঁশজাতীয় বনজ, ফলদ, অর্থকরী ও বিপন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করা খুবই দরকার।
সরকারপ্রধান বলেন, কারণ আমরা গাছ কেটে ফেলার কারণে অনেক পোকামাকড় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সেটাও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক। বনায়নের মাধ্যমে গাছপালা, জীব, মাটি, পানি, বায়ু, পরিবেশ সবকিছু যাতে স্বাভাবিকভাবে মিলেমিশে থাকতে পারে, এমন একটি ইকোসিস্টেম বজায় রাখার চেষ্টা করছি আমরা।
সবুজায়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবুজের সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারিভাবে আমরা অনেকগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম চালুর পদক্ষেপ নিয়েছি। একই সঙ্গে ক্লাইমেট ইয়ুথ ফেলোশিপ চালু ও এনভায়রনমেন্ট স্টার্টআপ ফান্ডসহ বেশ কিছু উদ্যোগ আমরা নিয়েছি। এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে অবশ্যই বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর এবং সবুজ বাংলাদেশ গঠন করতে সক্ষম হব।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজধানীসহ বিশেষ করে সারা দেশের সব নগর, বন্দর এবং শহরতলির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই। আমাদেরও সচেতন হতে হবে। অনুগ্রহ করে যেখানে-সেখানে বর্জ্য ফেলবেন না।
এদিকে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের এই অনুষ্ঠানটি ছিল সাদামাটা। ব্যানার-ফেস্টুন থাকলেও ছিল না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি। অতিথিদের অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে বিষয়টি। প্রধানমন্ত্রী নিজেই নির্দেশ দিয়েছেন যে, সরকারি অনুষ্ঠানে তার ছবি যেন ব্যবহার না করা হয়। তার নির্দেশের প্রতিফলন গতকালের অনুষ্ঠানে দেখা গিয়েছে।
অনুষ্ঠানে বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৬ এবং বনায়ন অংশীজনের মধ্যে লভ্যাংশের চেক বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ, ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠান শেষে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের পূর্ব পাশে দুইটি গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর পাশে পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠে বৃক্ষমেলা-২০২৬ উদ্বোধন করেন। বৃক্ষমেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন তিনি।