সামসুজ্জামান আরাফাত। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আয়রনম্যান ট্রায়াথলনে অংশ নিয়েছেন একাধিকবার। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উপপরিচালক দুটি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে ছুটির আবেদন করেছিলেন। তবে সেটা মঞ্জুর না হওয়ায় হতাশায় ফেসবুকে পোস্ট দেন। যেটা ভাইরাল হলে তার পাশে দাঁড়ান অনেক মানুষ। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকেও তার ছুটির আবেদন মঞ্জুর হয়। রোমাঞ্চকর এই খেলায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলার গল্পটা আরাফাত
বলেছেন দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দর কাছে একটা ফেসবুক স্ট্যাটাসে তো রাতারাতি ভাইরাল হয়ে গেলেন। মানুষ আপনার সম্পর্কে আরও বেশি করে জানতে চায়। শুরুতেই নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন
আরাফাত : আমি নোয়াখালীর ছেলে। স্কুলজীবন সেখানেই কাটিয়েছি। এরপর ঢাকায় কমার্স কলেজে এইচএসসি শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিংয়ে পড়ালেখা করেছি। এরপর একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করি। ২০১৮ সালে উপপরিচালক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দেই।
আর খেলারজগতে কীভাবে জড়িয়ে গেলেন?
আরাফাত : আমি পেশাদার ক্রীড়াবিদ নই। অনেকটা শখের বসে মাউন্টেয়ারিং কোর্সে যোগ দিয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে। সে থেকেই দৌড়াতাম নিয়মিত। এভাবেই খেলাধুলার জগতে চলে আসা। এক সময় বাংলা চ্যানেলের কথা শুনে আগ্রহ জাগে সাঁতরে সাগর পাড়ি দেওয়ার। বাংলাদেশের সবচেয়ে অ্যাডভেঞ্চারার্স অ্যাকটিভিটিজগুলোর একটি এটি। ২০১৫ সালে প্রথম বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেই। এরপর থেকে প্রতি বছর একবার করে অতিক্রম করেছি। সব মিলিয়ে নয়বার বাংলা চ্যানেল অতিক্রম করেছি। আগে তো বাংলাদেশে সেভাবে ম্যারাথন হতো না। আমি ব্যক্তিগতভাবে একবার চিন্তা করি দৌড়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া যাব। ২০১৭ সালে সেই লক্ষ্যপূরণ করি।
আয়রনম্যান আসরে অংশ নেওয়া হলো কীভাবে?
আরাফাত : আয়রনম্যানের কথা অবশ্য ২০১৩ সালে শুনেছিলাম। তখন আমি এর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলাম না। ২০১৭ সালে মনে হয়েছে আয়রনম্যান ট্রায়াথলনের জন্য আমি প্রস্তুত। তখন আমি মালয়েশিয়ায় আয়রনম্যান ট্রায়াথলনে অংশ নিয়ে সফলভাবে শেষ করি। আয়রনম্যান ট্রায়াথলনে আমাদের ৩.৮ কিলোমিটার সাঁতার, ১৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং ও ৪২.২ কিলোমিটার দৌড়াতে হয়। প্রথমবার আমি ১২ ঘণ্টা ৪৩ মিনিটে শেষ করে ১৬তম হই। তখন আমার বয়স ছিল ২৭ বছর। প্রথমবার অংশ নেওয়ার সময় দেখলাম এখান থেকে সেরারা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। সেটা দেখে আমারও আগ্রহ জাগে আরও ভালো করার। ওই সময় রাতারাতি যে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে সুযোগ পেয়ে যাব, তা কল্পনা করিনি। তবে প্রস্তুতি শুরু করি। ভেবেছিলাম ১৪-১৫ বছর লাগবে। তবে ২০২১ সালে আয়রনম্যান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করি। ২০২১ ও ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আয়রনম্যান ৭০.৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ও আয়রনম্যান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ সফলভাবে শেষ করি।
এবার তো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল?
আরাফাত : এবার আয়রনম্যান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ হবে ফ্রান্সে ও ফিনল্যান্ডে। ফ্রান্সে হবে আয়রনম্যান ট্রায়াথলন আর ফিনল্যান্ডে হবে ৭০.৩ চ্যাম্পিয়নশিপ। গত বছর নভেম্বরে মালয়েশিয়ায় আয়রনম্যানে অংশ নিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ দুটিতে সরাসরি খেলার কোটা অর্জন করি। দুটি আসরের জন্যই অফিসে ছুটির আবেদন করি। আমি তো সবসময় এটা করে আসছিলাম। আমার প্রতিষ্ঠানও আমাকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। এটার জন্য বছরব্যাপী আমি ট্রেনিং করছি। আয়ারল্যান্ডের একজন ট্রেনারের কাছে দেড় মাস ধরে অনলাইনে ক্লাস করছি। মাসে আমাকে দেড়শ ইউরো করে দিতে হয়। এ বছর ২০ জুনে আমি এই দুটি আসরের জন্য ছুটির আবেদন করি। তবে প্রথমবারেই নামঞ্জুর হয়। যখন অফিস না বলে দিল, তখন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল স্যারের সঙ্গে দেখা করে একটা জিও (সরকারি আদেশ) বের করি। সেটা অফিসে জমা দেওয়ার পরও যখন দেখি গত ৬ আগস্ট ছুটির আবেদন নাকচ হয়ে যায়, তখন খুব হতাশ হয়ে পড়ি। মনে হচ্ছিল চাকরি রক্ষা করতে আমাকে হয়তো এই খেলাটাই ছেড়ে দিতে হবে।
তারপর তো সব হলো নাটকের মতো?
আরাফাত : এরপর কিছু মানুষের সমর্থনে, বিশেষ করে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নিজেই গভর্নরের সঙ্গে কথা বলে অনুরোধ করেন। এটা মন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছেছিল ডাক্তার জাহাঙ্গীর কবির ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে। সিনিয়র সাংবাদিক শরীফুল হাসান ভাইও এটা নিয়ে লেখালেখি করেন। এরপর মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে অফিস যখন আমার ছুটি মঞ্জুর করে, তখন খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছি। এটা আমাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে। আমার জীবনে সবচেয়ে খুশির মুহূর্ত হলো যখন জানতে পারি, অফিস আমার ছুটির আবেদন মঞ্জুর করেছে। আমি মানুষ হিসেবে খুব দৃঢ়চেতা। তবে তখন আমি চোখের পানি আটকে রাখতে পারিনি। এখনো ওই কথা যখন মনে পড়ে, আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। এটা আমাকে নতুন করে বাঁচতে শেখাবে।
আপনার আসল লক্ষ্য কিংবা স্বপ্নটা কী?
আরাফাত : দেখেন এখনো বাংলাদেশে ট্রায়াথলন সেভাবে পরিচিতি পায়নি। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অধিভুক্ত কোনো সংস্থা নেই যতদূর জানি। আমি চাই নতুন যারা অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করে, তাদের তৈরি করতে। যাতে আগামী ২০৩২ অলিম্পিক গেমসে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কেউ ট্রায়াথলনে যোগ্যতা অর্জন করতে পারে সেই চেষ্টাটাই ব্যক্তিগতভাবে করতে চাই। স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশি কেউ একজন ২০৩২ অলিম্পিকের ট্রায়াথলন খেলছে। আমি কিছু ছেলেকে নিয়ে কাজ করছি। তাদের তৈরি করছি। আশা করছি ২০৩২ সালে আমরা সরাসরি অলিম্পিকে খেলতে পারব। কারণ ট্রায়াথলন অলিম্পিকের একটা খেলা। এখানে আমাদের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
নিজেকে অপেশাদার বলছেন। আবার জাতীয় সাইক্লিংয়ে অংশ নিয়ে তো পুরস্কারও জিতেছেন?
আরাফাত : এটা ঠিক বিভিন্ন জাতীয় সাইক্লিং চ্যাম্পিয়নশিপ ও ম্যারাথনে নিয়মিত অংশ নেই। সর্বশেষ চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হওয়ায় সাইক্লিং চ্যাম্পিয়নশিপে আমি দ্বিতীয়স্থান অধিকার করেছিলাম। তবে আমি পেশাদারি ক্রীড়াবিদ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে চাই না। সম্পূর্ণ নেশা থেকেই এটা করি। আমি চাই নতুন প্রজন্মও যাতে কেবল নেশা থেকেই এসব খেলায় আসে। তাতে সুস্থ যুবসমাজ পাব আমরা।
এসব করতে গিয়ে অনেক সময়, শ্রম ও অর্থের প্রয়োজন হয়। কীভাবে করেন এটা?
আরাফাত : আমি যতগুলো আয়রনম্যানে অংশ নিয়েছি, সবসময় কিছু স্পন্সরকে পাশে পেয়েছি। আমাকে বিভিন্ন সময় সহায়তা করেছেন অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাক্সক্ষী আমাকে সহায়তা করেন। এভাবেই খরচটা উঠে যায়। আগের আসরগুলোতে মেঘনা গ্রুপ, ডিএইচএস মটরস, ডাবর হানি, প্রথম আলো আমাকে স্পন্সর করেছে। ফিনল্যান্ডে ২৬ ও ২৭ আগস্ট এবং ফ্রান্সে ১০ সেপ্টেম্বর হবে আসর দুটি। এই দুটি আসরেই স্পন্সর করছেন আমার ফরাসি এক বন্ধু। যিনি এ দেশের একটি প্রতিষ্ঠানের কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন। এ ছাড়া অফিসের ফাঁকে ফাঁকেই আমি ট্রেনিংয়ের জন্য সময় বের করি। প্রতিদিন ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠি। ৮টা পর্যন্ত ট্রেনিং করে বাসায় ফিরে তৈরি হয়ে অফিসে যাই। অফিস শেষে সুইমিং করি। আর ছুটির দিনগুলোতে ট্রেনিংয়ে বেশি সময় দেই। দূরপাল্লার সাইক্লিং রেসগুলো করি ছুটির দিনে। শুরুতে নিজের মতোই করতাম। এখন আইরিশ একজন আয়রনম্যানের কাছে ট্রেনিং করি অনলাইনে।