কথোপকথন : ডেঙ্গু ও শিশুর জ্বর

অধ্যাপক ডা. সাকিল আহম্মদ

(শেষাংশ)

‘এমন হলে কী করণীয়?’

দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

‘আমরা যে শুনি ডেঙ্গু হলে রক্তক্ষরণ হয়। ফলে মানুষ মারা যায়। রক্তক্ষরণ হওয়াটা তাহলে কি ডেঙ্গু শকের চেয়ে মারাত্মক হলো না?’

ডেঙ্গু জ¦র মৃত্যুবরণ করার প্রধান কারণ নয়। মূল কারণ DSS বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। ডেঙ্গুতে রক্তক্ষরণে মৃত্যুর সংখ্যার চেয়ে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। যে কোনো শকের মতো ডেঙ্গু শকের চিকিৎসা মূলত শিরায় স্যালাইন দেওয়ার মাধ্যমে করা হয়। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করে স্যালাইনের পরিমাণ ও কতক্ষণে দেওয়া হবে তা ঠিক করতে হয়। এই কাজটা সূক্ষ্মভাবে হিসাব করে স্যালাইন সঠিকভাবে দেওয়ার মধ্যেই চিকিৎসার সাফল্য।

‘এভাবে ক’দিন স্যালাইন দিতে হয়?’

অধিকাংশ রোগী ২-৩ দিনে ভালো হয়ে যান। ক্ষেত্র বিশেষে ৩-৪ দিন লাগে।

‘আমার ওপরের তলার ভাবি তো ৭-৮ দিন ছিলেন আইসিইউতে?’

সম্ভবত উনার কোনো জটিলতা হয়েছিল। জটিল ডেঙ্গুকে Dengue Extended Syndrome বলে। দ্রুত ও যথাসময়ে রক্ত, আলট্রাসাউন্ড ও অন্যান্য পরীক্ষার মাধমে এই অবস্থা শনাক্ত করতে হয়।

‘আরেকটা বিষয় রক্তে প্লাটিলেট কমে গেলেই তো এমন জটিল হয়। ভাবির ক্ষেত্রে দেখেছিলাম, কাউন্ট হয়ে গেল ৫০ হাজার। চারদিকে দৌড় পড়ে গেল। প্লাটিলেট জোগাড় করা কী যে একটা ঝামেলার কাজ।’

সামাজিক মাধ্যমে চলা ডেঙ্গু রোগীর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয়টা চলে এলো। রক্তক্ষরণ না হলে প্লাটিলেট ২০,০০০, এমনকি ১০,০০০-এ নেমে এলেও প্লাটিলেট দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের স্বাস্থ্য সংস্থা সিডিসি বলছে প্লাটিলেট দেওয়ার ফলে রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা কমে না। এ জন্য হাসপাতালে বেশি দিন থাকতেও হতে পারে। [Dengue Case Management for Clinicians (cdc.gov)]

পর্ব :৫। ডেঙ্গু শক-আগাম সতর্কবাণী জানতে হবে

‘আমার মেয়েকে তো বললেন ভর্তি করাতে হবে না। বাসায় গিয়ে কী করব? কী কী খেতে দেব? কী দেব না?’

বেশি করে পানি, খাবার স্যালাইন দেবেন। ডাবের পানিও ভালো। তবে লাল, বাদামি, কালো, চকলেট রঙের কিছু খেতে দেবেন না।

 ‘আমার মেয়ে তো চকলেট মিল্ক খুব পছন্দ করে!’ মেয়ের প্রিয় খাবারের জন্য মায়ের অনুমতি প্রার্থনা।

এটাও খাওয়ানো যাবে না। ডেঙ্গুতে অনেক সময় পাকস্থলিতে রক্তক্ষরণ হয় এবং বমির সঙ্গে আসা রক্ত লাল, কালচে, বাদামি, কফি বা চকলেট বর্ণের হয়। ফলে চকলেট মিল্ক খাওয়ালে বমিটা চকলেট মিল্কের জন্য হয়েছিল না ডেঙ্গুজনিত রক্তক্ষরণের জন্য হয়েছিল বোঝা যাবে না। ফলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু না হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সঠিক সময়। দেরি মানেই বিপদ।

‘বাসায় তো গেলাম। কীভাবে বুঝব কখন আবার হাসপাতালে আসতে হতে পারে? ছোট বাচ্চার প্রেশার তো আমরা মাপতে পারব না।’

ডেঙ্গু রোগী শকে যাওয়ার আগে কিছু লক্ষণ দেখা যায় এগুলোকে (ডেঙ্গু রোগীর) আগাম বিপদসংকেত বলে। যেমন পেটে ব্যথা, অনবরত বমি, চোখে বা মুখের ভেতর রক্তক্ষরণ, অস্থিরতা বা নেতিয়ে পড়া, শ্বাস কষ্ট, শোয়া থেকে উঠে বসলে বা দাঁড়ালে মাথা ঘোরানো। বাসায় থাকার সময় প্রচুর পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি গ্রহণ করলে খারাপ হওয়ার আশঙ্কা অনেকাংশে কমে যায়।

পর্ব : ৬ । খাদের কিনারা থেকে ফিরে আসার গল্প

‘আপনার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা জটিল কিছু নয়। সহজ। মূল চিকিৎসা প্রেশার মেপে স্যালাইন দেওয়া। তাহলে এত মৃত্যুর মিছিল কেন? পত্রপত্রিকায় দেখলাম এ পর্যন্ত ৩০০-এর বেশি মানুষ মারা গেছেন।’

কয়েক বছর আগে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের একটি কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করার সময় আমরা বেশ কিছু মৃত্যুবরণকারী রোগীর কেস পর্যালোচনা করি। সেখানে কয়েকটি কারণ উঠে আসে। সেগুলো সম্ভবত এখনো প্রযোজ্য ১. পূর্ণাঙ্গ শকের ডেঙ্গু রোগী কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছাচ্ছে একেবারে শেষ বেলায়। তখন করণীয় বিশেষ কিছু থাকে না। ২. ঢাকার বাইরের কিছু রোগী আসার পথে অথবা আসার পর পর হাসপাতালে মারা গিয়েছেন।

এদের অধিকাংশ ডেঙ্গু শক থাকা অবস্থায় নিজ উদ্যোগে অথবা জেলার কোনো ক্লিনিক বা হাসপাতাল থেকে রেফার হয়ে ঢাকা আসছিলেন। পথে পর্যাপ্ত স্যালাইন পাননি। রক্তচাপ কমে গিয়েছিল। ৩. আইভি স্যালাইন হয় কম না হলে অতিরিক্ত বেশি দেওয়ার কারণে। এই রোগীদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু চিকিৎসার জাতীয় গাইড লাইন অনুসরণের ব্যত্যয় ঘটেছিল বলে ধারণা করা হয়। ডেঙ্গু রোগী সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা সম্ভব। ডেঙ্গু শকের রোগী রেফার করা একেবারেই অনুচিত।

‘আপনি তো অনেক বছর ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা করছেন। কোনো বিশেষ রোগীর কথা কী মনে আছে?’

২০০০ সাল। বাংলাদেশে বহু বছর পর ডেঙ্গু মহামারী শুরু। সে সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বহির্বিভাগে ১০ বছরের মেয়ে দেখছিলাম পালস পাচ্ছি না, ব্লাড প্রেশার শূন্যের কাছাকাছি। মেয়েটা কিন্তু দিব্বি হেঁটে বেড়াচ্ছে! ওয়ার্ডে ফোন করলাম। রোগী একজন যাচ্ছে। স্যালাইন রেডি করো। আসার সঙ্গে সঙ্গে স্যালাইন শুরু করে দিও। বাচ্চাটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিল। ডেঙ্গুর সমস্যাটা এখানে। অনেক ক্ষেত্রেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রোগী স্বাভাবিক। তারপর এক লহমায় পড়ে গেল তো গেলই। তখন সুস্থ করা খুব কঠিন।

আমার ছোট মামার বাইপাস সার্জারি হয় ২০১৮ সালে। অপারেশনের পঞ্চম দিন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। বাইপাস সার্জারির পর গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা হলো প্লাটিলেট কমিয়ে রাখা আর স্বাভাবিক প্রয়োজনের চেয়ে একটু কম করে স্যালাইন দেওয়া; অন্যদিকে ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা হচ্ছে প্লাটিলেট বাড়ানো আর বেশি করে স্যালাইন দেওয়া। শাখের করাতের এর চেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ আর হয় না।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের চিফ সার্জন অধ্যাপক ফারুক আহমদসহ পুরো টিম চিন্তিত। এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি তারা কখনো হননি। বিপদ। কী হবে এই রোগীর! আমি আর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নাজমুল মিলে চিকিৎসা করলাম। প্লাটিলেট নেমে এলো ৪৮,০০০। আমরা ঠিক করলাম ডেঙ্গু গাইডলাইন ১০০ ভাগ অনুসরণ করব। ছোট মামা ভালো হয়ে বাড়ি ফিরলেন।

এমন আরও সব জটিল ডেঙ্গু রোগী সুস্থ করার মন্ত্র আছে আমাদের দেশের ন্যাশনাল ডেঙ্গু গাইড লাইনে। দরকার এটা যথাযথভাবে অনুসরণ করা। রোগীদের সুস্থ করার সহজ অস্ত্র কিন্তু এটাই।

[Pocket Guideline for Dengue Case Management (dghs.gov.bd)]

‘ধন্যবাদ, ডাক্তার সাহেব। মনে বেশ সাহস পাচ্ছি। আপনার এই কথাগুলো সবাইকে জানান।’

আপনাকেও ধন্যবাদ। চমৎকার সব বিষয়ের অবতারণা করার জন্য। এই যে জানালাম সবাইকে। দেশ রূপান্তর পত্রিকার মাধ্যমে।