বাংলাদেশে কোরআনিক শিশুশিক্ষা বিস্তারের প্রবাদপুরুষ মাওলানা কারি বেলায়েত হুসাইন (রহ.)-এর প্রতিষ্ঠিত নুরানি তালিমুল কোরআন বোর্ড বাংলাদেশের বর্তমান পরিচালক মাওলানা ইসমাইল বেলায়েত হুসাইন। তিনি শায়খুল কোরআন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। এই ফাউন্ডেশন শিশুদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চা ও অসহায় মানুষের সেবায় কাজ করছে। শিশুশিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং মক্তব প্রতিষ্ঠাসহ নানা বিষয়ে তিনি দেশ রূপান্তরের মুখোমুখি হন। কথা বলেছেন হুমায়ুন আইয়ুব
দেশ রূপান্তর : সমাজের জন্য মক্তব শিক্ষার গুরুত্ব কতটুকু?
মাওলানা ইসমাইল বেলায়েত হুসাইন : সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশ। এ দেশে ধর্মীয় বুনিয়াদি শিক্ষার হাতেখড়ি মক্তব থেকেই হয়ে আসছে। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও একই কথা বলেন, ‘মক্তব শিক্ষাই এ দেশের প্রথম শিক্ষাব্যবস্থা।’ সাধারণ শিক্ষার প্রতি বেশি মনোযোগী হওয়ায় মক্তবের মতো বুনিয়াদি শিক্ষা অর্জনের সুযোগ হয় না অনেকের। এই শিক্ষা থেকে বঞ্চিতরা বাবা-মায়ের জীবনের অন্তিম সময়ে তাদের পাশে বসে একটু কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া-দরুদ পাঠ করতে পারে না। এটা চরম দুঃখজনক পরিস্থিতি ও অভিজ্ঞতা! নিজে দুই রাকাত নামাজ পড়বে কীভাবে, সেই জ্ঞানটুকুও শেখার সুযোগ পায় না। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়টি হলো, সকালের মক্তব কিংবা নুরানির বুনিয়াদি শিক্ষা থেকে সন্তান যদি ছোটবেলায় বঞ্চিত হয়, তবে তারা ইসলাম থেকে দূরে সরে যায় এবং ভিন্ন ভিন্ন মতের অনুসারী হয়ে ওঠে। এজন্য আমি মনে করি, মক্তবশিক্ষা প্রতিজন মুসলমানের জন্য অতীব জরুরি একটি বিষয়।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে নুরানি পদ্ধতির আবিষ্কারক শায়খুল কোরআন মাওলানা কারি বেলায়েত হুসাইন (রহ.)। তার ইন্তেকালের পর সন্তান হিসেবে আপনি এবং অন্য ভাইয়েরা মিলে এই দায়িত্ব পালন করছেন। বোর্ডের বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাই।
মাওলানা ইসমাইল বেলায়েত হুসাইন : হজরত মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) সর্বপ্রথম বাংলাদেশে ৬৮ হাজার গ্রামে ৬৮ হাজার মক্তব প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। হাফেজ্জী (রহ.)-এর হাতে-গড়া শিষ্য কারি বেলায়েত হুসাইন (রহ.) প্রিয় উস্তাদের স্বপ্নকে সামনে এগিয়ে নিতে কাজ শুরু করেন। তিনি সেই স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন। আলেমদের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে একটি যুগোপযোগী পাঠ্য সিলেবাস তৈরি করেন। সিলেবাসটি দেশের সচেতন মুসলমান সাদরে গ্রহণ করেছেন। সবাই এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন, আগে মুসলমান হতে হবে, পরে পেশাগত শিক্ষা অর্জন করতে হবে। এই মহান লক্ষ্য সামনে রেখে নুরানি তালিমুল কোরআন বোর্ড বাংলাদেশে মেহনত করে যাচ্ছে।
যেখানেই প্রতিষ্ঠান করার মতো সুযোগ আছে, সেখানে প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা, যে ব্যক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান হতে পারে তাদের এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা, চলমান বিভিন্ন মাদ্রাসায় নুরানি সিলেবাস অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে জোর প্রচেষ্টা চালানো। আমরা মানুষের কাছে যাচ্ছি, তাদের বোঝাতে সক্ষম হচ্ছি, তারাও সাড়া দিচ্ছেন। এভাবেই নুরানি তালিমুল কোরআন বোর্ড সারা দেশে শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে আসছে। আগামীতে আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ দেখতে চাই।
দেশ রূপান্তর : নুরানি বোর্ডের সিলেবাস কতটুকু সময়োপযোগী? এই সিলেবাসের মান উন্নয়নে আপনাদের কোনো উদ্যোগ আছে কি না?
মাওলানা ইসমাইল বেলায়েত হুসাইন : নুরানির সিলেবাসের মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা সব সময় চলমান। সিলেবাস একটা বহমান নদীর মতো, এটা থেমে থাকার জিনিস নয়। আব্বাজান (রহ.)-এর অবর্তমানে যুগের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সিলেবাস সব সময় পরিবর্তন-পরিমার্জন হচ্ছে। মেধাবী আলেমদের কাছ থেকে আমরা এ বিষয়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা নিচ্ছি। অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে তারা আমাদের সময় ও পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন।
দেশ রূপান্তর : আপনার বাবা দেশের প্রতিটি ঘরে দ্বীনের বুনিয়াদি শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। বাবার সেই স্বপ্ন নিয়ে কতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছেন বলে মনে করেন?
মাওলানা ইসমাইল বেলায়েত হুসাইন : একজন মুসলমানের সন্তানকে যেন জাহান্নামে যেতে না হয়, এই স্বপ্ন নিয়ে নুরানি বোর্ডের যাত্রা শুরু। আমরা বলতে পারি, এখন সারা দেশে নুরানি তালিমুল কোরআন বোর্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তাদের সন্তানদের পবিত্র কোরআন শেখানোর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। সারা দেশে দ্বীনি পরিবেশ এবং নিজ নিজ সন্তানদের পবিত্র কোরআন শেখানোর আগ্রহ সৃষ্টিতে নুরানি বোর্ডের ভূমিকা বলে শেষ করার মতো নয়। যেখানেই পরিপূর্ণ নিয়ম মেনে নুরানি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হচ্ছে, সেখান থেকেই হাজার হাজার মুসলমানের সন্তানরা পবিত্র কোরআনের পাঠ নিয়ে বের হচ্ছে। আমরা আশাবাদী, উম্মতের একটি বড় অংশ আল্লাহর অনুগ্রহে আমাদের পরিচালিত প্রতিষ্ঠান থেকে কোরআন শিখে, দ্বীনের প্রয়োজনীয় ইলম অর্জন করে জাহান্নাম থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পাবেন।
দেশ রূপান্তর : নানা কারণে অনেক শিশু মক্তবশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে অব্যবস্থাপনা, শিক্ষক সংকট, তদারকির অভাবে সারা দেশে মসজিদভিত্তিক মক্তবের আলো নিভুনিভু প্রায়। এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?
মাওলানা ইসমাইল বেলায়েত হুসাইন : আমার অভিমত হলো, মসজিদগুলোতে ইমাম-মুয়াজ্জিনরা একাগ্রতা নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। জীবিকার স্বাভাবিক চাহিদাও পূরণ করতে পারছেন না। এই না পারার কারণে তারা মসজিদের দায়িত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ খুঁজে নিচ্ছেন। মসজিদ কর্র্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে সচেষ্ট হলে ভিন্ন উপায়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য ইমাম-মুয়াজ্জিনদের দৌড়াতে হতো না। স্বাভাবিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা মসজিদ থেকে করা হলে এ সংকট সমাধানে ইমাম-মুয়াজ্জিনরা বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করি। এ ছাড়া রয়েছে মক্তবের উস্তাদদের প্রশিক্ষণের অভাব। বাচ্চাদের পড়ার উপযোগী পরিবেশগত সমস্যা চোখে পড়ার মতো। তা ছাড়া শুধু সকালে নয়, দিনে কয়েক ভাগে সকাল, দুপুর কিংবা বিকেলে মক্তবব্যবস্থা চালু রাখার জোর দাবি জানাই।
দেশ রূপান্তর : অভিযোগ রয়েছে, শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত শাসন সমাজে নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে। এটা থেকে উত্তরণের উপায় কী?
মাওলানা ইসমাইল বেলায়েত হুসাইন : শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত শাসন তারাই করেন, যারা শিশুশিক্ষার কলাকৌশল জানেন না, যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। নুরানি বোর্ড থেকে যারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, তাদের আচার-আচরণ চলাফেরায় শিশুদের প্রতি উত্তম ব্যবহারের জায়গাটি দখল করে আছে। আমরা মনে করি, প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলে এ সমস্যা বাড়তে থাকবে।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানের প্রতি নিবেদিত এবং শিশুদের প্রতি স্নেহশীল মনোভাব রাখেন, এমন শিক্ষকদের প্রাধান্য দিতে হবে। অবশ্যই কোনো স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষককে সার্টিফাই করা হয়েছে কি না, প্রশিক্ষণ রয়েছে কি না সবই খতিয়ে দেখতে হবে। সর্বোপরি সুন্নতি জীবন, নববি আলোয় উদ্ভাসিত দ্বীনদার শিক্ষকদের নিয়োগের ব্যাপারে সচেষ্ট হলে এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারব বলে আমি মনে করি।
দেশ রূপান্তর : তার মানে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের প্রয়োজন অনেক?
মাওলানা ইসমাইল বেলায়েত হুসাইন : অবশ্যই প্রয়োজন। শিক্ষকরা সমাজের সম্মানিত মানুষ। তাদের সম্মান-মর্যাদার কথা আল্লাহর রাসুল (সা.) নিজে বলে গেছেন। বিশেষ করে কোরআনের শিক্ষকদের মর্যাদা আরও বেশি। শিক্ষকরা আদর্শ জাতি গড়ার কারিগর। তাদের দেখে বাচ্চারা শেখে। এজন্য শিশুশিক্ষা অথবা মক্তবশিক্ষা নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের অবশ্যই প্রশিক্ষণের আওতায় আসতে হবে। পৃথিবীর উন্নত সব দেশে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে আচার-আচরণ, পড়ানোর পদ্ধতি, বডি ল্যাংগুয়েজ এমনকি শিক্ষকদের কাপড়ের রঙ কী হবে সেটাও শেখানো হয়। এ দেশের প্রেক্ষাপটে প্রশিক্ষণের বিষয়টা আরও বেশি জরুরি।
দেশ রূপান্তর : একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে বলি, সময়ের চাহিদা মতে, বর্তমানে মক্তবের শিক্ষক ও ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন কেমন হওয়া উচিত?
মাওলানা ইসমাইল বেলায়েত হুসাইন : বর্তমান সময়ের সবকিছু বিবেচনা করলে বলতে হয় মক্তব, নাজেরা, হিফজ শিক্ষক ও ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন অনেক কম। তবে তারা যে শুধু জীবিকা নির্বাহের জন্য এ কাজ করছে এমন নয়। তারা মসজিদ-মাদ্রাসার জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে খেদমত করছেন। ইসলামের সেবা করছেন। অতএব মসজিদ-মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, বর্তমান বাজার বিবেচনা করে একটা পরিবারের স্বাভাবিক চলাফেরার জন্য যে পরিমাণ হাদিয়া প্রয়োজন, তারা যেন ইমাম-মুয়াজ্জিন ও শিক্ষকদের তা নির্ধারণ করেন।
দেশ রূপান্তর : মক্তবের প্রসার এবং শিশুশিক্ষা বিস্তারে গণমাধ্যম কী ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন?
মাওলানা ইসমাইল বেলায়েত হুসাইন : গণমাধ্যমগুলো মক্তব প্রতিষ্ঠা ও শিশুশিক্ষাকে উৎসাহিত করতে পারে। দেশের প্রত্যন্ত অনেক জায়গায় এখনো ধর্মীয় শিক্ষার অধিকার থেকে মুসলিম সন্তানরা বঞ্চিত। সেসব গ্রামে মক্তব প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার ও সমাজের প্রভাবশালীদের উৎসাহিত করতে পারে। গণমাধ্যমের উচিত, শিশুশিক্ষা নিয়ে যারা কাজ করছে, সেসব প্রতিষ্ঠানকে সম্মানজনকভাবে উপস্থাপন করা। শিশুশিক্ষায় নিয়োজিত প্রতিভাবানদের সময়ে সময়ে পুরস্কৃত করার কাজটিও গণমাধ্যম করতে পারে।