সাবিনাদের চুক্তি নিয়ে অহেতুক লুকোচুরি

নারী জাতীয় ফুটবল দলের ৩১ সদস্যকে চুক্তির আওতায় এনেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। বুধবার ঘটা করে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানও হয়েছে। যেখানে উপস্থিত ছিলেন খোদ বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের দ্বিতীয়পর্বে অপেক্ষারত সংবাদকর্মীদের বাফুফের অডিটরিয়ামে প্রবেশের অনুমতি মিলে। সেখানেই সালাউদ্দিন এক বিস্ময়কর নাটকের মঞ্চায়ন করেন। বাফুফের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষার খেলোয়াড়দের কতজন কত টাকা করে মাসিক বেতন পাবেন, সেটা প্রকাশ করতে শুরু করেন। ৩১ জনের মধ্যে ২৫ জনের সঙ্গে চুক্তির অঙ্ক প্রকাশের পরই বাফুফে সভাপতি ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদককে থামিয়ে দিয়ে বলেন, এটা গোপন চুক্তি। সেটা কোনভাবেই নাকী তারা প্রকাশ করতে পারেন না! অথচ বিশ্ব ফুটবলের বড় বড় তারকাদের ক্লাব বদলের অর্থমূল্য হরহামেশাই প্রকাশ করা হয়। এদেশেও চুক্তির তালিকা নিয়মিত প্রকাশের সংস্কৃতি রয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ক্রিকেটারদের সঙ্গে বাৎসরিক চুক্তি প্রকাশ করে গনমাধ্যমে। অথচ চুক্তির অঙ্ক নিয়ে লুকোচুরির পাশাপাশি কোন ৩১ জনের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে সেই তালিকাটাও লুকিয়ে রেখেছে বাফুফে। বারবার অনুরোধের পরও সেই তালিকা সংবাদ মাধ্যমকে সরবরাহ করেনি ফুটবল কর্তারা।
অথচ এই চুক্তি নিয়ে বাফুফে ইতিবাচক শিরোনাম হতে পারতো। তারা মেয়েদের বেতন অনেকের ক্ষেত্রে বাড়িয়েছে পাঁচ গুন। অতীতে শীর্ষ ফুটবলাররা মাসিক বেতন পেতেন ১০ হাজার টাকা করে। এরকম ১৫ জন ফুটবলার নতুন চুক্তিতে পাবেন ৫০ হাজার টাকা করে। এর পরের ধাপের ১০ ফুটবলাকে দেওয়া হবে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা। বাকি ছয়জনের মধ্যে চারজন ২০ হাজার এবং দু'জন পাবেন ১৮ হাজার টাকা। বেতন বাড়ানোর ন্যায্য দাবীটা সাবিনাদের ছিল অনেক আগে থেকে। সেই সাফজয়ের পর থেকেই বাফুফের কাছে বেতন ও সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর দাবী জানিয়ে আসছিলেন মেয়েরা। তবে বাফুফে নানাভাবে তাদের দাবী এড়িয়ে যায়। বাধ্য হয়ে মেয়েরা দুই দিনের জন্য অনুশীলনও বয়কট করেন। সর্বশেষ নেপালের বিপক্ষে সিরিজের আগে বাফুফে সভাপতি ও নারী ফুটবল কমিটির প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণের কাছে আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন নারী ফুটবলাররা। তাতেই কাজ হয়। বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি মেয়েদের চাওয়ার প্রায় পুরোটাই পূরণ করেছে বাফুফে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর সালাউদ্দিন জানিয়েছেন তা, 'মেয়েরা যা যা চেয়েছে তার প্রায় সবকিছুই আমরা পূরণ করেছি। কেবল মাত্র ঈদ বোনাসের দাবীটা পূরণ করিনি কোন নিয়মের মধ্যে পরে না বলে।' সালাউদ্দিনের এই বক্তব্যের পর বাফুফের সাধারণ সম্পাদক ইমরান ৩১জনের মধ্যে ২৫জনের মাসিক বেতনের অঙ্কটা প্রকাশ করেন। পরের ছয় ফুটবলারের চুক্তির অঙ্ক বলার আগেই অবশ্য ইমরানকে থামিয়ে দেন সালাউদ্দিন, 'সেক্রেটারি, আমরা কোনভাবেই আর্থিক বিষয়টা প্রকাশ করতে পারি না। এটা গোপনীয় ব্যাপার। আমাদের পক্ষে এটা প্রকাশ করা ঠিক হবে না।' যদিও ততক্ষণে ঘরভর্তি সাংবাদিকরা বেশি সংখ্যক ফুটবলারদের চুক্তির অঙ্কটা জেনে গেছেন। এরপর আরেক প্রশ্নের জবাবে সালাউদ্দিন বলেন, 'আমি যদি পারতাম তাদের বেতন দ্বিগুণ করে দিতাম। আমাদের বেশ কিছু স্পন্সর রয়েছে, এছাড়া ফিফারও বরাদ্দ আছে। এই সব উৎস থেকেই মেয়েদের বেতন দেওয়া হবে। আলাদাভাবে কোন স্পন্সরের টাকায় দেওয়া হবে না।'
নারী ফুটবলারদের সঙ্গে এই চুক্তির মেয়াদ এক বছর না করে ছয়মাস করার ব্যাখ্যা দিয়েছেন সালাউদ্দিন, 'আমরা ছয়মাসের চুক্তি করেছি। এরপর সেটা নবায়নের বিষয়টি নির্ভর করবে তাদের পারফরম্যান্সের ওপর।' একেবারে শেষ দিকে সালাউদ্দিন মেয়েদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, 'আমি চাই ভালো পারফরম্যান্স করে এই অঙ্কের পাঁচগুণ আমাদের দিতে বাধ্য করো। সেটা আমি যদি নাও পারি, অন্যরা এসে যেন দেয়। এটাই তোমাদের কাছে আমার চাওয়া।'
বাফুফের সভাপতি একই সঙ্গে মেয়েদের আশ্বস্থ করে জানিয়েছেন, চুক্তিবদ্ধ মেয়েরা কোন ক্লাবের হয়ে খেললে তাদের বেতনের কোন অংশ দাবী করবে না বাফুফে। যেটা ছেলেদের ক্ষেত্রে করছে বাফুফে। এলিট অ্যকাডেমির ফুটবলারদের প্রিমিয়ার লিগে বিভিন্ন দলে চুক্তির সুযোগ দিতে এই নিয়ম চালু করেছে বাফুফে। কোন ক্লাব এলিট অ্যাকাডেমির খেলোয়াড় নিতে চাইলে বাফুফেকে চুক্তির একটা অঙ্ক দিতে হবে। মেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা না করার কথা জানিয়ে সালাউদ্দিন বলেন, 'পেশাদার দৃষ্টিতে নারীদের চুক্তি থেকে ফেডারেশনের অর্থ নেয়া উচিত। কিন্তু আমরা সেটা নিবো না। তারা নারী ফুটবলে প্রথম প্রজন্ম। তাদের আরো সহায়তা করা প্রয়োজন।'
দীর্ঘদিনের চাওয়া অবশেষে পূরণ হওয়ায় খুশি মেয়েরাও। তাদের হয়ে নারী দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন বলেন, 'এটা আমার একার ব্যাপার নয়, সবার ব্যাপার। আমি বাফুফের সভাপতিকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাদের আবদার পুরণ করায়।' যদিও নতুন চুক্তিতে দলের সবচেয়ে সিনিয়র হওয়ার পরও বাড়তি বেতন পাচ্ছেন না সাবিনা। আগে অবশ্য অন্যদের চেয়ে কিছু বেশি বেতন পেতেন সাফের সেরা পারফরমার। নতুন চুক্তিতে বাকী ১৪ জনের মতোই ৫০ হাজার টাকা করে বেতন পাবেন তিনি।
চুক্তির ফলে মেয়েরা স্বয়ংক্রীয়ভাবেই জবাবদিহিতার মধ্যে চলে আসছে। তাদের ওপর নানা কোড অব কন্ডাক্টের বোঝাও চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সে সব মেনে নিয়েই মেয়েরা খেলা চালিয়ে যাচ্ছে কিছুটা আর্থির নিরাপত্তা মেলায়।