১২১ কোটি মানুষের আফ্রিকায় বাজারটি তত বড় নয়, যতটা বিশাল ও দামি সেখানকার খনিজ ভা-ার। বিশ্ব মুরব্বিদের এ মহাদেশ নিয়ে আগ্রহের মূলে রয়েছে সেটিই। ইউক্রেন ও সাহিল অঞ্চলে সংঘাতের পেছনের খেলোয়াড়রা একই চেহারার হলেও দুই অঞ্চলের মধ্যে একটি ভিন্নতাও আছে। শেষোক্ত এলাকায় দামি সব খনিজ দখল-বেদখলের ব্যাপার আছে। নাইজার, মালি ও বুরকিনা ফাসো তিন দেশেই আছে সোনার খনি। প্রথম দুটি দেশে রয়েছে ইউরেনিয়ামও। বছরে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলারের খনিজ তোলা হয় আফ্রিকা থেকে। এর বড় একটি অংশ থাকে পশ্চিম আফ্রিকার। বিশ্বের সপ্তম বৃহৎ ইউরেনিয়ামের মজুদ আছে নাইজারে। ফ্রান্সের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নাইজারের ইউরেনিয়ামে চলে। ফলে সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান ভ-ুল করতে বদ্ধপরিকর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট। নাইজেরিয়াকে দিয়ে নাইজার ও মালির শাসক বদলাতে চান তিনি।
চুয়ান্ন দেশের বিশাল আফ্রিকায় যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে মূলত পশ্চিমাংশে। সেদিকে আছে প্রায় পনেরো থেকে ষোলোটি দেশ। আরবিতে এই অঞ্চলকে সাহিলও বলা হয়। বিশ্বজুড়ে এ এলাকার পরিচিতি সামরিক অভ্যুত্থান উপদ্রুত অঞ্চল হিসেবে। এই অভ্যুত্থান এখানকার ভাইরাল আইটেম। সর্বশেষ যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে এখানে নাইজার ও মালির সামরিক অভ্যুত্থানকে ঘিরে। নাইজার স্বাধীন হয় ১৯৬০ সালে। তারপর বহুবার অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছে এখানে। সফলভাবে হয়েছে পাঁচবার। সর্বশেষ ২৬ জুলাই এক অভ্যুত্থানে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহামেদ বাজোমকে উৎখাত করেন তার পাহারাদার বাহিনীর কর্মকর্তা আবদোরাহমানে চিয়ানি। পাশের দেশ মালি এই অভ্যুত্থানের সমর্থক। একই সময়ে স্বাধীন হয়েছিল এই দুই দেশ। অনেক বিষয়ে তাদের মিল। স্বাধীনতার পর গত প্রায় ছয় দশকে মালিতেও শান্তিতে ক্ষমতার বদল হয়েছে মাত্র একবার। এসব পাল্টাপাল্টি অভ্যুত্থান এত দিন গতানুগতিক ঘটনা হিসেবে থাকলেও এবার সেটি থাকছে না। কারণ, এখনকার ক্যুতে পরোক্ষে যুক্ত হয়ে পড়েছে রাশিয়া।
১৯৪৫ সালে কলোনি থাকার সময় শুরু হওয়া যৌথ মুদ্রা আজও আফ্রিকায় ফরাসি দখলদারিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। সিএফএ ফ্রাঙ্ক ব্যবহার করতে গিয়ে ব্যাংক অব ফ্রান্সে আফ্রিকার দেশগুলোকে সম্পদ জমা রাখার নিয়ম আছে। এটিও আজকের আফ্রিকা আর মেনে নিতে পারে না। এই রাগ পড়ছে ভাষা হিসেবে ফরাসির ওপরও। নাইজারেও ফরাসি দাপ্তরিক ভাষা। মালি ফরাসিকে দাপ্তরিক ভাষার বদলে কাজের ভাষার মর্যাদায় নামিয়ে এনেছে সম্প্রতি। এতে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিশোধের একটি বার্তা আছে, যা বুঝতে প্যারিসে কারও অসুবিধা হয়নি। মালি ও নাইজারে অভ্যুত্থানের পরপর নতুন নেতারা তাদের দেশ থেকে ফরাসি সৈন্যও সরাতে বলেছেন। মালি থেকে সেটি সরিয়ে প্রথমে নাইজারে আনা হলেও সেখান থেকেও সরাতে হতে পারে।
নাইজার এ বছর ৬৩ বছর পূর্তি উদযাপন করেছে। গত সপ্তাহে বিক্ষুব্ধ জনতা ফ্রান্স নিপাত যাক সেøাগান দিতে দিতে ফ্রান্স দূতাবাস আক্রমণ করে। তারা ঢিল ছুড়ে দূতাবাসটির জানালার কাচ ভেঙে ফেলে এবং সীমানা প্রাচীরে আগুন ধরিয়ে দেন। ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাজোমেকে গৃহবন্দি করায় প্যারিসে তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা এই ভেবে ভয় পেয়ে যান যে, নাইজারে পশ্চিমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কি না। এলিসি প্রাসাদ থেকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বুলিবাগিশ বিবৃতি দিয়ে বলেন, ফ্রান্স ও এর স্বার্থের ওপর কোনো আঘাত বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, ‘যদি কারও গায়ে আঘাত লাগে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিশোধ নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না।’
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের এই বিবৃতি দুই হাজার মাইল দূরের উপনিবেশের অবাধ্য প্রজাদের উদ্দেশে কোনো এক সাম্রাজ্যবাদী প্রভুর দেওয়া কঠোর হুঁশিয়ারির মতো শুনিয়েছে। নাইজারে এখনো ফ্রান্সের দেড় হাজার সেনার একটি পুরো গ্যারিসন অবস্থান করছে। এর সঙ্গে জঙ্গি বিমানসহ একটি বিমান ঘাঁটি ও ড্রোনও রয়েছে। এসব কিছুই মনে করিয়ে দেয়, উপনিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার দীর্ঘ ও রক্তাক্ত ইতিহাসের পরও ফ্রান্স গোপনে আফ্রিকায় আধা-ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা চালু রেখেছে এবং সেখানে এখন এমন হুমকির মুখে পড়েছে, যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আগে তারা হয়নি। নাইজারের বর্তমান সংকটের সঙ্গে ফ্রান্সের আগেকার ঔপনিবেশিক সম্পর্কের যোগসূত্র রয়েছে। উপনিবেশ-উত্তরকালে ফ্রান্স নতুন করে ফ্রঙ্কাফ্রিক ধারণা চালু করে। এর মানে হলো ফ্রান্সের ভাষা ও মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে শক্তিশালী নব্য-উপনিবেশবাদী প্রভাব বলয় গড়ে তোলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গল ফ্রঙ্কাফ্রিকের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, ‘বিশ্বে ফ্রান্সের ক্ষমতা এবং আফ্রিকায় ফ্রান্সের ক্ষমতা অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত। ফ্রান্সের নেতারা আফ্রিকাকে ফ্রান্সের বাড়ির পেছনের আঙিনা বলে মনে করেন। নাইজার এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
নাইজারের ইউরেনিয়ামের প্রধান আমদানিকারক ফ্রান্স। প্যারিসের সামরিক ও সরকারি উপদেষ্টারা নাইজার প্রশাসনে খুব সফলভাবে প্রভাব তৈরি করে আসছেন। শুধু বাজোমের সরকার নয়, আগের সব সরকারের ক্ষেত্রেই তা সত্যি। ফ্রান্সের সাবেক কলোনিগুলোতে উপনিবেশ-উত্তরকালের শাসন টিকে থাকার অন্যতম ভিত্তি হলো বেপরোয়া দুর্নীতি। নাইজারসহ আফ্রিকায় ফ্রান্সের প্রভাব বলয়ের দেশগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য কুখ্যাত। বিশাল অঙ্কের সহায়তা কর্মসূচির বিনিময়ে সেখানকার আজ্ঞাবহ পুতুল নেতারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেননি। অস্ত্র চুক্তি ও নিরাপত্তা-সহায়তার নামে ঘুষ লেনদেন চলেছে। আর ঘুষের সেই অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। অবৈধ অর্থের এই লেনদেন সব সময় দুই দিক থেকেই হয়েছে। ফ্রান্সের শীর্ষ রাজনীতিবিদদের আফ্রিকা থেকে স্যুটকেসভর্তি টাকা দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি এ ক্ষেত্রে একজন দণ্ডিত অপরাধী। লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির কাছ থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যদিও সারকোজি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সাব-সাহারা অঞ্চলে ফ্রান্সের মুদ্রা ফ্রাঙ্কের সঙ্গে সম্পর্কিত সিএফএ ফ্রাঙ্কের প্রচলন করা হয়েছিল। এখন সেখানে ইউরো চালু আছে। এর ফলে নাইজারসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশে অর্থনৈতিকভাবে ফ্রান্স আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। এই শোষণমূলক ব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্র সবসময় সমর্থন জানিয়ে গেছে। এর কারণ হলো, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে শীতল যুদ্ধের সময় ফ্রান্সের এই সাবেক উপনিবেশগুলো ওয়াশিংটনের ভূরাজনৈতিক ও মতাদর্শিক দুর্গ হিসেবে কাজ করত।
ফ্রান্সের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, আরও অনেক আফ্রিকাবাসীর মতো নাইজারের মানুষেরাও এখন ফ্রাঙ্কাফ্রিক ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করছেন। এর অর্থ হচ্ছে তারা ফ্রান্স সাম্রাজ্যকে প্রত্যাখ্যান করছেন। এই অর্থে বলা যায়, ঐতিহ্যবাহী বলয় হিসেবে পরিচিত আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলে ফ্রান্সের প্রভাব আলগা হয়ে পড়ছে।
গত দুই বছরে উন্নয়ন খাতে দুই বিলিয়ন ডলার সহযোগিতা পাওয়ার পরও নাইজার বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্রতম দেশ। সেখানে সাক্ষরতার হার মাত্র ৩৭ শতাংশ। ২০২২-২৪ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন নাইজারের জন্য ৫০৩ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিলেও দারিদ্র্য, তরুণদের বেকারত্ব ও কভিড মহামারী মোকাবিলার ব্যর্থতার জন্য নাইজারের ওপর ফ্রান্স ও এর মিত্রদের প্রভাবকে দায়ী করা হয়। ওই অঞ্চলে নাইজার একমাত্র দেশ নয়, যেখানে সামরিক অভ্যুত্থান হলো। ২০২০ সালে মালিতে এবং ২০২১ ও ২০২২ সালে বুরকিনা ফাসোতে দুই দফা সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। এই দুটি দেশও ১৯৬০ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পায়। সবাই বলছেন, ওই অঞ্চলে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ, সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে চাইছে রাশিয়া, তুরস্ক ও চীন। বুরকিনা ফাসো ও মালির সামরিক শাসকরা এরই মধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে যদি নাইজারে বাজোম সরকারকে ক্ষমতায় ফেরানোর প্রচেষ্টা চালানো হয়, সেটাকে তারা যুদ্ধের ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করবেন। রাশিয়ার ভাড়াটে বাহিনী ভাগনার গ্রুপের সেনারা নাইজারের প্রতিবেশী দেশগুলোতে কাজ করছে। তারা নাইজারের বিদ্রোহীদের সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
নাইজার ও আফ্রিকার অন্য দেশগুলো যদি স্বশাসিত সরকার ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথে যাত্রা শুরু করে, সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো পথ। আফ্রিকার উপনিবেশিকতার পথ। কিন্তু এসব দেশে দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সর্বব্যাপী যে অব্যবস্থাপনা, তাতে করে সেখানে নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হবে। পশ্চিম আফ্রিকায় শান্তি কায়েম করতে জাতিসংঘ বহুবার শান্তি মিশন পাঠিয়েছে। নাইজার, বুরকিনা ফাসো ও মালির মধ্যে শেষেরটিতে এখনো বড় আকারে মিশন রয়েছে। জাতিসংঘ এই অঞ্চলে শান্তির জন্য বছর বছর ব্যাপক তৎপরতা চালালেও প্রত্যাশার পুরোটা পূরণ হয়নি। এর মাঝে সর্বশেষ জটিলতা বেঁধেছে মালির সামরিক শাসকদের সিদ্ধান্তে। তারা জাতিসংঘ বাহিনীকে সরে যেতে বলেছে। যা আফ্রিকার অন্যত্রও জাতিসংঘের অনুরূপ ভূমিকা কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিভিন্ন ধর্মীয় জঙ্গিদের হাতে মালিতে জাতিসংঘের প্রায় তিনশ সৈনিক জীবন দিয়েছেন গত এক দশকে।
মালির শাসকরা এখন জাতিসংঘকে যে তাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলছেন, তার পেছনে অভ্যুত্থানকারী নেতৃত্বের সঙ্গে রাশিয়ার সুসম্পর্কেরও একটি কারণ হিসেবে আছে। রাশিয়া মনে করে, আফ্রিকায় জাতিসংঘের বিভিন্ন তৎপরতা পশ্চিমা প্রভাবের হাতিয়ার মাত্র। রাশিয়ার ওই মনোভাবেরই প্রতিফলন মালির সিদ্ধান্ত। এর ফল হিসেবে ডিসেম্বরের মধ্যে হয়তো মালি ছাড়বেন শান্তিরক্ষীরা। এই মিশনে বাংলাদেশিরাও আছেন বড় সংখ্যায়। আফ্রিকায় ইউক্রেন-যুদ্ধের পার্শ্বফল এবং রুশোফিলিয়া এভাবেই বাংলাদেশকেও আঘাত করল নীরবে। এখন শুধুই অপেক্ষার প্রহর, সময়ই বলে দেবে আফ্রিকায় ফ্রান্স সাম্রাজ্যের দিন কি শেষ হয়ে আসছে, নাকি পেছনে আরও কিছু আছে তা সময়ই বলে দেবে।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
raihan567@yahoo.com