নবীর রওজায় ভালোবাসার জানালা এখনো খোলা

পবিত্র রওজা মোবারকের বিপরীত বরাবর দক্ষিণ পাশে একটি খোলা জানালা। দীর্ঘ সাড়ে চৌদ্দশ বছর যাবৎ জানালাটি খোলা। এটা ভালোবাসা জানানোর খোলা জানালা, ভালোবাসা প্রকাশের এক অনন্য নজির! এটা উম্মুল মুমিনীন হজরত হাফসা (রা.)-এর জানালা। এ জানালা যুগ কিংবা সরকার পরিবর্তনেও বন্ধ হয়নি কখনো। এই জানালা খোলা রাখার পেছনে রয়েছে দারুণ এক ইতিহাস।

রওজা মোবারকে সালাম দেওয়ার জন্য পশ্চিম দিক থেকে প্রবেশ করে পূর্ব দিকে বের হতে হয়। রওজা শরিফ বরাবর এসে হাতের বামে উত্তরমুখী হয়ে সালাম প্রদান করতে হয়। যখন আপনি রওজা শরিফের দিকে মুখ করে সালাম পেশ করছেন, তখন ঠিক আপনার পিঠের পেছনে দক্ষিণ পাশের দেয়ালে রয়েছে এই খোলা জানালা।

নবী করিম (সা.) যেখানে শুয়ে আছেন, সেটি হলো হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর হুজরা (ছোট কক্ষ বা কামরা) মোবারক। বর্তমানে যেটি রওজা মোবারক। ঠিক তার বিপরীত দিকে দক্ষিণ পাশের দেয়ালে জানালাটি অবস্থিত। সেটি হলো হজরত উমর (রা.)-এর কন্যা হজরত হাফসা (রা.)-এর বাসস্থান।

মসজিদে নববির পূর্ব পাশে সারিবদ্ধভাবে নবী করিম (সা.)-এর স্ত্রীদের হুজরা নির্মাণ করা হয়েছিল। হজরত আয়েশা (রা.) এবং হজরত হাফসা (রা.)-এর হুজরা দুটি মুখোমুখি ছিল। মাঝে ছিল একটি গলিপথ। যে গলিপথ দিয়ে সবাই রওজায় সালাম করত।

নবী করিম (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর যুগ সমাপ্ত হলো। হজরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে ১৭ হিজরিতে মসজিদে নববি সম্প্রসারণের প্রয়োজন দেখা দিল। বিশেষ করে রওজায় সালাম দেওয়ার সুবিধার্থে হজরত হাফসা (রা.)-এর হুজরাটি সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন দেখা দিল। যে হুজরায় তখনো তিনি অবস্থান করছিলেন।

নবী করিম (সা.) ভূপৃষ্ঠে নেই তো কী হয়েছে! চোখের সামনেই তো রয়েছে নবীজির রওজা। রওজার পাশেই এই হুজরাখানায় তিনি নবীজির স্মরণ নিয়ে বসবাস করতেন। আর যখন মন চাইত এই জানালা দিয়ে প্রাণপ্রিয় স্বামীর রওজার দিকে তাকিয়ে আত্মাকে প্রশান্ত করতেন। মন ভরে দরুদ ও সালাম পেশ করতেন। আর অনুভব করতেন, এই তো কয়েক হাতের দূরত্বে নবীজির পাশে নবীজির সঙ্গেই তিনি আছেন। হজরত উমর (রা.) বড় চিন্তায় পড়ে গেলেন। কীভাবে তিনি কন্যা হাফসাকে বলবেন হুজরাটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য!

একদিন তিনি পিতৃস্নেহ ও পরম মমতা নিয়ে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। খোঁজখবর নেওয়ার পর কথা প্রসঙ্গে বিষয়টি তার সামনে তুলে ধরলেন।

দীর্ঘ ৭ বছর যাবৎ নবীজির বিরহ যন্ত্রণায় তিনি ছটফট করছেন। আশা ছিল, জীবনের যে কদিন বাকি আছে অন্তত রওজার পাশে থেকে কিছুটা সান্ত¡নায় বাঁচবেন। এখানে এসে নবীজি তার পাশে বসতেন। তার সঙ্গে সময় কাটাতেন। এই হুজরার প্রতিটি কোনায় নবীজির স্পর্শ ও স্মৃতি মেখে রয়েছে। এটিও তাকে ছাড়তে হবে! বিষয়টি তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। তার কান্না দেখে সেদিনের মতো হজরত উমর (রা.) ফিরে গেলেন।

পরদিন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) কে তার কাছে পাঠালেন। আরও অনেকে তাকে অনুরোধ করল। কিন্তু তিনি অনড়। হজরত উমর (রা.)-এর পক্ষ থেকে যখনই কেউ তার কাছে এই হুজরা সরানোর আবেদন নিয়ে আসত, তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠতেন। তাকে বলা হলো, এই হুজরার বিনিময়ে মদিনার সবচেয়ে বড় বাড়িটি তাকে উপহার দেওয়া হবে। তাতেও তিনি রাজি হলেন না। পৃথিবীর সব সম্পদের বিনিময়েও যদি কেউ তাকে এই হুজরা ছাড়তে বলত, তবুও তিনি কিছুতেই তাতে রাজি হতেন না।

কিছুদিন পর হজরত উমর (রা.) ছেলে হজরত আবদুল্লাহ (রা.) কে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় তার কাছে এলেন। এবার ভাই আবদুল্লাহ সবিনয়ে বোনের কাছে আবেদন রাখলেন, যেন তিনি উম্মতে মুসলিমার ফায়দার স্বার্থে এ হুজরাটি ছেড়ে দেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর বাড়িও হজরত হাফসা (রা.)-এর হুজরার সঙ্গেই লাগোয়া ছিল। তিনি বোনকে অনুরোধ করলেন, তার বাড়িতে এসে ওঠার জন্য। তিনি বোনের জন্য এই বাড়ি ছেড়ে অন্যখানে চলে যাবেন। আর এ বাড়িটিও তো তার হুজরার সঙ্গেই। সুতরাং তিনি নবীজির কাছেই অবস্থান করবেন।

এবার হজরত হাফসা (রা.)-এর মন নরম হলো। তিনি তার হুজরা ভেঙে পথ সম্প্রসারণের অনুমতি দিলেন। তবে শর্ত রাখলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের যে বাড়িতে তিনি উঠছেন রওজা শরিফ বরাবর তার দেয়ালে একটি জানালা খুলতে হবে। আর এই জানালাটি কখনো বন্ধ করা যাবে না। যেন মন চাইলেই তিনি এই জানালা দিয়ে রওজা পানে তাকিয়ে থাকতে পারেন। হজরত উমর (রা.) ওয়াদা করলেন, কখনোই এ জানালাটি বন্ধ করা হবে না।

খেলাফতে উমর শেষ হলো। হজরত উসমান (রা.) ও হজরত আলী (রা.)-এর যুগ সমাপ্ত হলো। হজরত হাফসাও (রা.) ইন্তেকাল করলেন। আরও অনেক খলিফা ও রাজা-বাদশাহ গত হলেন! কতবার মসজিদে নববির পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণ হলো, কিন্তু কেউই হজরত উমর (রা.)-এর কৃত সেই ওয়াদা ভঙ্গ করলেন না।

প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর যাবৎ স্মৃতি হয়ে থাকল এই খোলা জানালা ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে এবং ওয়াদা রক্ষার এক অনন্য দৃষ্টান্তস্বরূপ!