কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, তাড়াইল, করিমগঞ্জ, বাজিতপুর, কুলিয়ারচর ও নিকলীতে প্রায় সারা বছরই থাকে পর্যটকের আনাগোনা। বিশেষ করে বর্ষাকালে মন কেড়ে নেয় হাওরের সৌন্দর্য। তবে দিন দিন ভ্রমণকারীদের কাছে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে হাওর এলাকা। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা এবং অসচেতনতার কারণে বাড়ছে অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু। এছাড়া পুলিশের চাঁদাবাজিতেও অতিষ্ঠ ভ্রমণপিপাসুরা।
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, কিশোরগঞ্জে গত ২ বছরে বর্ষা মৌসুমে হাওরের পানিতে ডুবে এবং বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে অন্তত ৪১ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে চলতি বছরেই মারা গেছে ২৩ জন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হাওরের তিন উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামকে যুক্ত করে সাবমারসিবল আরসিসি রাস্তার পাশাপাশি হাওরের বুকে গড়ে তোলা হয় প্রায় ৩০ কিলোমিটার হাইওয়ে। যার নাম ‘অলওয়েদার রোড’। এই সড়কেই পাল্টে যায় হাওরের চেহারা। হাওরের মাঝ দিয়ে চলা সড়কটিতে রয়েছে ২২টি দৃষ্টিনন্দন সেতু। বর্ষাকালে যখন বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলের অবিচ্ছিন্ন জলরাশিকে সাগরের মতো মনে হয়, তখন এই সড়কের সৌন্দর্যে অভিভূত হতে হয়। এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক। ছুটির দিনগুলোতে ঢল নামে পর্যটকদের। সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি হাওরের স্বচ্ছ পানিতে গোসল করেও আনন্দে মাতেন অনেকে। এছাড়া মিঠামইন, অষ্টগ্রাম কিংবা ইটনার উত্তাল হাওরে নৌকা-স্পিডবোট নিয়ে ঘুরে বেড়ান হাজারো পর্যটক।
পর্যটকদের অভিযোগ, ভ্রমণপিপাসুদের সংখ্যা বাড়লেও তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা। হাওর বিষয়ে ধারণা না থাকায় অনেকেই লাইফ জ্যাকেট ছাড়া হাওরে নেমে কিংবা উত্তাল হাওরে গোসল করতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। সাঁতার না জানা পর্যটকরা গোসল করতে নেমে স্রোতের টানে হারিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে আনন্দ উদযাপন করতে গিয়ে নৌকা থেকে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন।
একদিকে মৃত্যুর ভয়, অন্যদিকে পুলিশের হয়রানিতেও ত্যক্তবিরক্ত পর্যটকরা। অভিযোগ রয়েছে, ভ্রমণ শুরুর পথে পর্যটকদের নৌকা ও যানবাহন আটকে চলে পুলিশের চাঁদাবাজি। যার ফলে নৌকা ভাড়ার জন্য পর্যটকদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে।
পাবনা থেকে আসা পর্যটক রিপন মিয়া, সাইদুর রহমানসহ কয়েকজন অভিযোগ করেন, তারা মোটরসাইকেল ও মাইক্রো নিয়ে নিকলী সদরে ঢুকতেই গাড়ির সঠিক কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও পুলিশকে গাড়িপ্রতি এক থেকে দেড় হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন হাওর পর্যটকশূন্য হয়ে পড়বে বলে তারা জানান।
তবে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেন নিকলী থানার ওসি মো. সারোয়ার জাহান।
জেলা পুলিশ সুপার মো. রাসেল শেখ বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তায় সবসময় পুলিশ কাজ করছে। তবে চাঁদাবাজির অভিযোগ এখন পর্যন্ত পাইনি। তবে আমি অবশ্যই বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’
জেলা প্রশাসক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিপজ্জনক স্থানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং ভ্রমণকারীদের পানিতে নামতে কড়াকড়ি আরোপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’