ভূমি জরিপে টাকার খেলা

পটুয়াখালীর বাউফলে ভূমি জরিপে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভূমি মালিকদের কাছ থেকে প্রতি খতিয়ানের (পর্চা) বিপরীতে সর্বনিম্ন এক হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জরিপ কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় কৃষকরা তাদের গাছ, মাছ বিক্রি করে টাকা দিয়েছেন। এসব টাকার লেনদেনে সহায়তা করেছেন জরিপ কাজে নিয়োজিত দুই কানুনগোর সহকারী গিয়াস উদ্দিন ও মন্টু মিয়াসহ স্থানীয় কিছু দালাল। এ কাজে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতাও জড়িত থাকায় এ ব্যাপারে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন স্থানীয় ভূমি মালিকরা।

জানা গেছে, দীর্ঘ ৭০ বছর পর উপজেলার চর দিয়ারা কচুয়ার ২৩টি মৌজায় জরিপ কাজ শুরু করে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ (সেটেলমেন্ট) অধিদপ্তর। মাঠপর্যায়ের কাজ শেষ করে উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের শৌলা মৌজায় চলছে অ্যাটেস্টেশন বা তসদিক কার্যক্রম। এ কাজে শৌলা মৌজায় দায়িত্বে ছিলেন বরিশাল সেটেলমেন্ট অফিসের কর্মকর্তা (কানুনগো) মো. খলিলুর রহমান ও সিদ্দিকুর রহমান।

বাউফল ভূমি অফিসের তথ্যমতে, ভূমি জরিপ সম্পূর্ণ সেটেলমেন্ট অফিসের (বরিশালের) কাজ। এর সঙ্গে উপজেলা ভূমি অফিসের কোনো সংযোগ নেই।

এদিকে মাঠপর্যায়ে জরিপে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ করেন ভূমি মালিকরা। নিজস্ব পৈতৃক সম্পত্তির মালিকানা ফিরে পেতেও টাকা গুনতে হয়েছে প্রতিটি কৃষককে। কেউ মুখ খুললে জমির রেকর্ড অন্যের নামে হয়ে যাবে বলে ভয় দেখান দালালরা। ফলে ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না স্থানীয়রা।

জরিপ কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কানুনগো খলিলুর রহমান জানান, শৌলা মৌজার দিয়ারা জরিপে ৮ হাজার ৮৫টি খতিয়ানের জরিপ কাজ সম্পন্ন করে ‘দিয়ারা সেটেলমেন্ট অপারেশন অফিস’ বরিশাল। নকশা তৈরির কাজ শেষে শুরু হয় অ্যাটাস্টেশন বা তসদিক কাজ। তসদিক কাজে মোট ১ হাজার ৮৪টি খতিয়ানের ওপর ডিসপুট (আপত্তি) দেওয়া হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিটি খতিয়ান তসদিক করতে একজন কৃষকের কাছ থেকে সর্বনিম্ন ১ হাজার করে টাকা নেওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ৮ হাজার ৮৪টি খতিয়ানের জন্য কম করে হলেও ৮১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। মূল সমস্যা তৈরি হয় মাঠ পর্যায়ের নকশা তৈরিতে। নকশার মাধ্যমে একজনের জায়গা অন্যজনকে মালিকানা ঘোষণা করা হলে শুরু হয় টাকার খেলা। টাকার বিনিময়ে জমি ফেরত পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় কৃষকের। নকশা তৈরিতে অনেক রাজনৈতিক নেতাদের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নকশা তৈরি শেষে শুরু হয় অ্যাটাস্টেশন কাজ। এতে মোট ১ হাজার ৮৪টি পর্চায় আপত্তি দেওয়া হয়েছে। আপত্তি খতিয়ানের কাজ করতে প্রতি গ্রাহককে ২ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়েছে। সে হিসেবে আপত্তি খতিয়ান থেকেই কোটি টাকার বেশি আদায় করা হয়েছে গ্রাহকদের কাছ থেকে।

মঞ্জুরুল আলম নামে একজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, আমার কাছ থেকে তিন দফায় ৬০ হাজার টাকা নিয়েছেন গিয়াস। কিন্তু তারপরেও আমার কাজ করে দেননি।

অভিযোগের বিষয়ে কানুনগো সিদ্দিকুর রহমান ও সহকারী গিয়াস উদ্দিন জানান, প্রতিটি খতিয়ানের কাজ করে দিয়েছি। বিনিময়ে ভূমি মালিকরা আমাদের চা-পান খেতে কিছু দিয়েছে।

দিয়ারা সেটেলমেন্ট অপারেশন বরিশাল বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ভূমি জরিপে কোনো ফি বা টাকা লাগে না।’