নজরুলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সঙ্গ

যতবার নজরুল পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশে এসেছেন প্রতিবারই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্রদের সঙ্গে উষ্ণ সময় কাটিয়েছেন। শিক্ষকদের মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, রমেশচন্দ্র মজুমদার, ছাত্রদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু, কাজী মোতাহার হোসেন (পরে শিক্ষক হয়েছিলেন) ছিলেন নজরুলের ঘনিষ্ঠ সুহৃদ, বন্ধু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পেয়েছেন বন্ধুত্ব, পেয়েছেন বিরহ, পেয়েছেন শেষ আশ্রয়। নজরুলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সঙ্গ নিয়ে লিখেছেন বিপুল জামান

বাংলা সাহিত্যের অনন্য প্রতিভা নজরুল ইসলামের জীবন বৈচিত্র্যময় ঘটনায় পূর্ণ। ছিলেন মসজিদের মুয়াযযিন, মক্তব্যের শিক্ষক, লেটোদলের সদস্য, রুটির দোকানের কারিগর, বাসাবাড়িতে কাজের সহকারী, সেনাবাহিনীর হাবিলদার, সাংবাদিক, গীতিকার, সুরকার, গায়ক, কবি, অভিনেতা। দুরন্ত, তেজস্বী, সৃষ্টিমাতাল এই শিল্পী বিশ্বটাকে দেখেছেন আপন হাতের মুঠোয় পুরে। তার সব চঞ্চলতা শেষ হয়েছে ঢাকায় এসে, জীবনাবসানের পর শুয়ে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম

নজরুল প্রথম ঢাকায় আসেন ১৯২৫ সালের ৪ জুলাই। ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে দেশীয় দলের বিজয়ের আনন্দে কবি বন্ধুবান্ধব নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন জয় উদযাপন করতে। দ্বিতীয়বার কবি ঢাকায় আসেন ১৯২৬ সালের জুন মাসের শেষের দিকে। ২৭ জুন সেবারই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। নজরুল সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে আয়োজিত মুসলিম সাহিত্য সমাজের চতুর্থ বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। এই বৈঠকে কবি একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেওয়ার পর তার কয়েকটি জাগরণী গান গেয়ে শোনান। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘আমরা ছাত্রদল’, ‘কাণ্ডারি হুঁশিয়ার’, ‘কৃষাণের গান’ প্রভৃতি। এ বৈঠকসূত্রেই কবির সঙ্গে পরিচয় হয় কাজী আবদুল ওদুদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখের সঙ্গে। এ সময় তিনি এক বা দু’দিন ঢাকায় ছিলেন। সে সময় কবিকে সর্বক্ষণ সঙ্গ দিয়েছিলেন কবি আবদুল কাদের, মোহাম্মদ কায়েস ও আবদুল মজিদ।

এরপরে যখন কবি মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকায় আসেন তখন তার থাকার ব্যবস্থা হয় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সঙ্গে বর্ধমান হাউজে। বর্ধমান হাউজ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বাসস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তখন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের হাউজ টিউটর হিসেবে ওই গৃহের বাসিন্দা ছিলেন। কবির এ ভ্রমণ সম্পর্কে তার বন্ধু লেখক, প্রাবন্ধিক কাজী মোতাহার হোসেনের স্মৃতিকথা থেকে বিস্তারিত জানা যায়। ১৯২৭ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারি নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ক্ষেত্রে মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে যোগদান করেন। তিনি এই সম্মেলনের বিশিষ্ট সম্মানীয় অতিথি ছিলেন। উদ্বোধনী সংগীত ও কবিতা আবৃত্তি এবং মুসলিম সাহিত্য সমাজের তরুণ সদস্যদের উদ্দেশ্যে উৎসাহমূলক বক্তব্য দেন কবি। এখানে আসার পথে ‘খোশ আমদেদ’ (স্বাগতম) নামে উদ্বোধনী সংগীতটি রচনা করেন। এ ভ্রমণে উপমহাদেশের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার কবিকে জগন্নাথ হলে আমন্ত্রণ জানান। কবি নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং জগন্নাথ হলের সভায় তার বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় গান পরিবেশন করেন। এর একটি হলো, ‘কে বিদেশী বন উদাসী বাঁশের বাঁশী বাজাও বনে?’

নজরুল পরের বছর অর্থাৎ ১৯২৮ সালেও মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনেও ঢাকায় আসেন। এ সম্মেলনে তিনি তার বিখ্যাত মার্চ সংগীতটি গেয়েছিলেন। এই সংগীতটি এই ভ্রমণেই সৈয়দ আবুল হোসেনের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় আতিথ্য গ্রহণ করার সময় লিখেছিলেন। এ সময় তার পরিচয় হয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, কবি বুদ্ধদেব বসু, কবি অজিত দত্ত এবং গণিত বিভাগের ছাত্রী ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে।

একই বছরের জুন মাসে পুনরায় নজরুল ঢাকায় এলে রানু সোম ও উমা মৈত্রের (লোটন) সঙ্গে তার পরিচয় ও সংগীতের সম্পর্ক তৈরি হয়। কাজী মোতাহার হোসেন লিখেন, ‘সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় সম্মেলনে যোগদানের পর কবি বুড়িগঙ্গাতীরের জমিদার রূপলাল বাবুর বিশাল অট্টালিকা রূপলাল হাউজে যান এবং সেখানে গান গাইলেন, ‘বসিয়া নদীকূলে এলোচুলে কে উদাসিনী’, ‘জাগো অনশন বন্দী ওঠরে যত’। ঢাকায় এসে তিনি বর্ধমান হাউজের (বর্তমান বাংলা একাডেমি) নিচের তলায় আমার সঙ্গে থাকতেন। এ সময় বেশ কয়েকটি নিমন্ত্রণে কবির সঙ্গে আমি ছিলাম। নজরুল ঢাকায় যতদিন বর্ধমান হাউজে ছিলেন তিনি নিয়মিত প্রতিদিন দু’ঘণ্টা করে মনোরম সংগীত চর্চায় নিমগ্ন থাকতেন।’

এসব আড্ডার আনন্দময় একটি চিত্র পাওয়া যায় মুর্তজা বশীরের লেখায়। মুর্তজা বশীর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সন্তান জেনে লেখক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় শহীদুল্লাহ এবং নজরুলের জীবনের একটি ঘটনা বলেন। গান-বাজনার একটি আসরে প্রবেশের সময় পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় দেখেন যে কমরেড মুজফ্ফর আহমদ এক পাশে নিশ্চুপ বসে আছেন। মুখে পান চিবুতে চিবুতে কাজী নজরুল ইসলাম হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করছেন আর টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে নাচছেন শহীদুল্লাহ। শুধু তাই নয়, এ সময় কবি অনুরাগীদের বাড়িতে গিয়ে গানও শেখাতেন। এ জন্য কবিকে লাঞ্ছনার শিকারও হতে হয়েছে। বনগ্রাম লেনে রানু সোমকে গান শেখাতে গেলে সেখানকার কিছু যুবক কবির ওপর লাঠি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যদিও সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষিত কবির সঙ্গে তারা পেরে ওঠেনি। তিনি তাদের হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করেন। যুবকরা পালিয়ে যায়। এই রানু সোম পরে বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তার নাম হয় প্রতিভা বসু।

ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে পরিচয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এবং তখন পর্যন্ত একমাত্র মুসলিম ছাত্রী (গণিত) বেগম ফজিলাতুন্নেসা মোতাহার হোসেনের দূরসম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন। নজরুল বিষয়টি জানলে তার সঙ্গে দেখা করতে চান। কবি হাত দেখে ভাগ্যগণনা করতে পারেন এমন তথ্য ফজিলাতুন্নেসাকে জানালে তিনিও কবির সঙ্গে দেখা করতে চান। সাক্ষাতের পর প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে নজরুল ফজিলাতুন্নেসার হাতের মস্তিষ্ক রেখা, জীবনরেখা, হৃদয় রেখাসহ শুক্র, শনি, রবি, বুধ মঙ্গল ও চন্দ্রের অবস্থান নিরীক্ষা করলেন। ঘণ্টাখানেক পর মোতাহার হোসেন কবিকে নিয়ে ফিরে এলেন বর্ধমান হাউজে। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন কবি শয্যায় নেই। সকালে নাস্তার সময় ফিরে এসে ফজিলাতুন্নেসার প্রেমে পড়ার কথা জানালেন। পরবর্তী সময়ে কবি কলকাতায় ফিরে ফজিলাতুন্নেসাকে বেশ কয়েকটি চিঠি লেখেন, তার প্রকাশিত বইয়ের একসেট উপহার পাঠান। নজরুল তার পরবর্তী বই সঞ্চিতা উৎসর্গ করেন বেগম ফজিলাতুন্নেসাকে। কিন্তু ফজিলাতুন্নেসা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

এতে নজরুল দুঃখ পেলেও আর এগোননি। কিন্তু বিরহ কাতরতায় বন্ধু মোতাহারকে চিঠি লিখতে বাধ্য হন। কবি বর্ধমান হাউজে থাকাকালীন রমনায় বসে থাকতে পছন্দ করতেন। এখানে তিনি গানের সুরের কথা ভাবতেন। জায়গাটি তার এত ভালো লেগে যায় যে সাপের ভয় থাকা সত্ত্বেও তিনি এখানে বসে লেকের পানির ওপর আলোছায়ার খেলা দেখতে আসতেন। নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত বর্ধমান হাউজটি বর্তমানে বাংলা একাডেমির অঙ্গীভূত এবং একাডেমি কর্তৃপক্ষ একে লেখক জাদুঘর হিসেবে গড়ে তুলেছে। এখানে নজরুলের বিভিন্ন জিনিস বিশেষ করে লাঙল, ধূমকেতু ইত্যাদি গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ প্রদর্শিত রয়েছে।

কবি ১৯৩৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আবার ঢাকায় এসেছিলেন। কবি তখন পুরোদস্তুর গীতিকার। কবির এ সময়ের সফরসঙ্গী ছিলেন ধীরেন দাশ, নলিনীকান্ত সরকার এবং আব্বাস উদ্দীন আহমদের মতো বরেণ্য শিল্পী। নজরুল ইসলাম ছিলেন খেয়ালি প্রকৃতির মানুষ। ১৯৩৫ সালে কলকাতার খেলার মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করতে গিয়ে ঝোঁকের মাথায় তিনি কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে শিয়ালদা স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে বসেন। গোয়ালন্দ নেমে স্টিমারে করে চলে আসেন ঢাকায়। এ যাত্রায় তিনি কাজী মোতাহার হোসেনের বাসায় ওঠেন। এ সময় বুড়িগঙ্গার তীরে রূপলাল হাউজে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন তিনি। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বুদ্ধদেব বসু কবির সম্মানে জগন্নাথ হলে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। কবি ঢাকায় পা রাখেন ১৯৩৯ সালের জুলাই মাসে। বনগ্রাম লেনের সুনীল রায়ের বাড়ি ছিল সেবারের আস্তানা।

১৯৪০ সালে ঢাকা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য কবি সে বছর ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় এসেছিলেন। এ সময় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে তিনি সংবর্ধিত হন। বলা যায়, সুস্থ অবস্থায় এটিই ছিল ঢাকায় কবির শেষ আগমন। এরপর কবি ঢাকায় আসেন ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে।

শেষ আশ্রয়

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদায় নির্বাক কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ধানমণ্ডির ২৮ নম্বর সড়কের ৩৩০-বি ভবনে আনা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং শিয়রে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। এ অবস্থায় কবি বঙ্গবন্ধুর দিকে তাকিয়ে মুখ নাড়ান কিন্তু কোনো শব্দ উচ্চারিত হয়নি। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডি-লিট প্রদান করে। ১৯৭৫ সালের ২৩ জুলাই কবি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৯ আগস্ট তিনি মারা যান।

মৃত্যুশয্যায় কবির পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরী, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলামসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। নজরুলের মরদেহ প্রথমে আনা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সামনের মাঠে। পরে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে নজরুলকে সমাহিত করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নজরুল একাকার হয়ে যান।