সরকারি হাসপাতালে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নের জন্য একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি রয়েছে। অধিকাংশ হাসপাতালে এর কার্যকারিতা নেই। মাসে অন্তত একবার বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও বছরে একবারও বসতে পারছে না তারা। সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও গাছাড়া ভাব ছিল তাদের। করোনা মহামারীর মধ্যেও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির একই দশা ছিল।
সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীর সময়ের অভাবে নিয়মিত কমিটির সভা হয় না। ফলে জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য খাতে সমন্বয়হীনতা বিদ্যমান। রোগীরা যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রতি জেলার জ্যেষ্ঠ জনপ্রতিনিধি হলেন ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান।
জানা গেছে, ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক নিয়মিত না হওয়ার জন্য জনপ্রতিনিধিদের অনীহা অনেকাংশে দায়ী। কিছু বৈঠক যদিও হয়, তাতে মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যরা খুব কম সময়ই উপস্থিত থাকতে পারেন। মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে প্রতি মাসে অন্তত একবার বৈঠকে বসার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসেবা-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জনপ্রতিনিধি ও জেলা প্রশাসন-সংশ্লিষ্টদের নিয়ে গঠিত হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির উদাসীনতা ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার জন্য দায়ী। রাজধানীতে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সিটি করপোরেশনও ব্যর্থ। এবার জেলা পর্যায়েও ডেঙ্গুতে মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা রেকর্ড গড়েছে। জেলায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ওপর বর্তায়। তারা সময়মতো হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাই করতে পারে না। তাদের উদাসীনতার বিষয়টি স্পষ্ট।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ে ডেঙ্গু বা মশা নিয়ন্ত্রণে জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয়তা দেখা যায়নি। জনসাধারণকে নিয়ে জনপ্রতিনিধিরা যদি সামাজিক আন্দোলন গড়তে না পারেন, তাহলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূল সম্ভব নয়।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হাসপাতালের সার্বিক বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এলাকায় সক্রিয় নন। মন্ত্রী, সংসদ সদস্যরা নিজ এলাকার হাসপাতাল নিয়ে সক্রিয় হলে দেশের স্বাস্থ্যসেবার পরিস্থিতি পাল্টে যেত। চিকিৎসা খাতে রাষ্ট্রের যে বাজেট তার সদ্ব্যবহার হতো।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এত সরকারি হাসপাতাল কেন্দ্র থেকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয় না; সে কারণেই ব্যবস্থাপনা কমিটি। কমিটি সক্রিয় হলে হাসপাতালের সেবার মান বাড়ে এমন অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। যে বরাদ্দ হাসপাতালে দেওয়া হয়, কমিটির মাধ্যমে তার ব্যবহার যথাযথ করা যায়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের যুক্ত করে হাসপাতালের অনিয়ম দূর করা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘কমিটির ধারণাটি খুবই ভালো ছিল। কিন্তু এমপি মহোদয়রা মিটিং করেন না। ফলে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। সংসদ বা সরকারের সংশ্লিষ্ট পক্ষ কমিটিগুলো মনিটরিং করলে বড় ভূমিকা রাখা সম্ভব। তখন মানুষ হাসপাতালগুলোকে সরকারের নয়; বরং নিজেদের মনে করবে।’
অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ডেঙ্গু। এ বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও মৃতের সংখ্যা অনেক বেশি। সংখ্যাটি আরও বাড়তে পারে বলে শঙ্কা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা-সেবাদাতা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করবে ব্যবস্থাপনা কমিটি। তারা হাসপাতালের অনুমোদিত বাজেটের মধ্যে বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবে। স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিতে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মুক্তিযোদ্ধা, হতদরিদ্র, মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ ও সুবিধাবঞ্চিতদের সেবা নিশ্চিতের দায়িত্ব কমিটির। কমিটিকে প্রয়োজনে বিশেষ দায়িত্ব পালনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিজস্ব ও বাইরের ব্যক্তিদের নিয়ে উপকমিটি গঠন করতেও বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে উপকমিটি গঠনে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির অকার্যকারিতা অপ্রত্যাশিত। নিয়মিত কমিটির সভা হলে জেলার সার্বিক স্বাস্থ্যচিত্র সম্পর্কে জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টরা অবগত হয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে। এভাবে হাসপাতাল শুধু নয়, পুরো জেলার স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন সম্ভব। কমিটির কার্যকারিতা না থাকায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না।
ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি। হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. এনামুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি সর্বশেষ সভার তারিখ জানাতে পারেননি। সভাপতি হাসপাতালে এসেছিলেন গত বছরের ২৫ আগস্ট। এরপর আর ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হয়নি।
ডা. মো. এনামুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সভাপতি ছাড়া বা তার মনোনীত প্রতিনিধি ছাড়া তো সভা হয় না। এ কারণে আমাদের সভার আয়োজন করা যাচ্ছে না।’
মানিকগঞ্জের কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেরও একই অবস্থা। এই হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। ব্যস্ততার কারণে তাকে সভার কথা বলতে পারে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ব্যবস্থাপনা কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকাও নেই পরিচালকের কাছে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আরশাদ উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি গত বছরের ২ নভেম্বর যোগ দিয়েছি। এরপর সভা হয়নি। কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকাও পাইনি।’
সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সভাপতি হলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। এই হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সর্বশেষ বৈঠক হয়েছে গত ডিসেম্বরে। তার এক বছর আগে আরেকটি সভা হয়েছিল। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয় রাষ্ট্রীয় কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত। আমাদের ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক না হলেও তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। তাকে সব বিষয়ে জানিয়ে থাকি এবং তিনি তাৎক্ষণিক সমাধান দেন। কমিটির নিয়মিত বৈঠক না হলেও হাসপাতালের কার্যক্রম ঠিকমতো পরিচালিত হচ্ছে।’
বরিশাল সদর জেনারেল হাসপাতালের সর্বশেষ সভা হয়েছে ২০২১ সালের ৭ অক্টোবর। রাজশাহীতে এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। এ বছর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হয়েছে গত ২২ জানুয়ারি। এরপর আর সভা হয়নি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সবশেষ সভা হয়েছে গত ১ এপ্রিল। মৌলভীবাজারে তিন-চার মাস আগে সর্বশেষ সভা হয়েছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ঠিক কবে হয়েছে, সেটি অবশ্য জানাতে পারেনি। যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য। এই হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সর্বশেষ সভা হয়েছে গত মে মাসে। ফেব্রুয়ারিতেও আরেকটি সভা হয়েছিল।
হাসপাতাল সূত্রগুলো জানিয়েছে, করোনা মহামারীর সময়েও ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক নিয়মিত হয়নি।
হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর প্রায় ৬০ শতাংশ ঢাকার বাইরের। গত মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু নিয়ে ২ হাজার ২৯১ জন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ৯২০ ও ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে ১ হাজার ৩৭১ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে। এ বছর ডেঙ্গু নিয়ে ঢাকার বাইরের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬২ হাজার ৮৮৬ জন। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫৬ হাজার ২৪৭ জন।
দেশের সব সরকারি হাসপাতাল কমিটির সভা নিয়মিত হয় কি না এর তদারকির দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। এ ব্যাপারে জানতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এ বি এম খুরশীদ আলমকে মোবাইল ফোনে কল দিয়েও পাওয়া যায়নি। অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক ডা. মো. হাবিবুল আহসান তালুকদারের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। তবে অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার সহকারী পরিচালক ডা. শেখ দাউদ আদনান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলোর তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে থাকা তো জরুরি না। তাদের প্রয়োজনে তারা বৈঠক করবে; বিশেষ সময়ে বা নির্দিষ্ট সময়ে বৈঠক করবে। এটা একেবারেই স্থানীয় বিষয়।’