২০ লাখ শিশু নেই সরকারের খাতায়

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৪ এএম

জন্মের পর একটি শিশুর প্রথম সরকারি পরিচয় তৈরি হয় জন্ম নিবন্ধনের মাধ্যমে। অথচ পথে থাকা বিপুলসংখ্যক শিশুর জন্মের তথ্যই নেই সরকারের খাতায়। এই সংখ্যা অন্তত ২০ লাখ। পরিচয় ও বয়সের প্রমাণ থেকে শুরু করে শিক্ষা, চিকিৎসা, সামাজিক সুরক্ষা ও বিভিন্ন নাগরিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও এতে তৈরি হয় নানা বাধা।

এতে শিশুরা ধীরে ধীরে ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজি ও দখলবাজিসহ নানা গ্রুপের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।  সম্প্রতি পুলিশের প্রতিবেদনেও রাজধানীর কিশোর গ্যাংয়ের বেশিরভাগ সদস্যকে ভাসমান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের অনেকে ফুটপাত ও বস্তিতে থাকে। পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্নতাই তাদের অপরাধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

ইউনিসেফের ২০২৪ সালের গবেষণায়ও পথ-সংযুক্ত শিশুদের সংগঠিত অপরাধী চক্রে ব্যবহারের চিত্র উঠে এসেছে। মাদক বিক্রি, চাঁদাবাজি ও দখলসহ বিভিন্ন অপরাধে এসব চক্র শিশুদের কাজে লাগায়। ফলে জন্ম নিবন্ধনহীন ও রাষ্ট্রীয় সেবার বাইরে থাকা শিশুরা একদিকে নাগরিক পরিচয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে আরও বড় ঝুঁকির দিকে।

ইউনিসেফের ওই গবেষণায় দেশে অভিভাবকের যত্ন সরকারের খাতায় ছাড়া ‘স্ট্রিট সিচুয়েশনে’ থাকা শিশুর সংখ্যা ৩৪ লাখের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর কারিতাস বাংলাদেশের ২০২৫ সালের জরিপে বলা হয়েছে, ৫৮ দশমিক ২ শতাংশের জন্ম নিবন্ধন নেই। এই দুটি জরিপের ফল বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়, দেশে অন্তত প্রায় ১৯ লাখ ৭২ হাজার শিশুর জন্ম নিবন্ধন নেই। বর্তমানে এর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও এই দুটি জরিপের মধ্যে একটির সঙ্গে আর একটির কোনো যোগসূত্র নেই।

বাবা-মা অভিভাবক থাকার পরও শিশুর জন্ম নিবন্ধন করতে সীমাহীন ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তদবিরের পরও জন্ম নিবন্ধন করতে বেগ পেতে হয় সাধারণ মানুষের। পরিবার ও অভিভাবকের পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের জন্য সমস্যাটি আরও জটিল। কেননা শিশু বয়সে তারা জানেই না, এই জন্ম নিবন্ধন তাদের কেন প্রয়োজন। কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার তত্ত্বাবধানে কিছু পথশিশুর জন্ম নিবন্ধন শুরু হয়েছে। সরকারও এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে।

গত বছর কারিতাস বাংলাদেশের ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহীর শিশুদের নিয়ে করা ওই জরিপে আরও দেখা যায়, জন্ম নিবন্ধন না থাকা শিশুদের ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ তাদের বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর জানে না। জরিপে ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু স্কুল বা মাদ্রাসায় পড়ছে না এবং মাত্র ৫ দশমিক ৭ শতাংশ সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। অর্থাৎ ৯৪ দশমিক ৩ শতাংশ এসব কর্মসূচির বাইরে।

এই অবস্থায় আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে জাতীয় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সঠিক ও নির্ভুল জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কেবল নাগরিক অধিকার সুরক্ষার ভিত্তিই নয়, বরং উন্নয়ন পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, ন্যায়সংগত বাজেট বণ্টন এবং রাষ্ট্রীয় সুশাসন নিশ্চিত করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ নিবন্ধন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

প্রতি বছরের ন্যায় এ নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়। তাবে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ও টিভি চ্যানেল ছাড়া অন্য কোনো গণমাধ্যমকে এ সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রে জানা গেছে। 

কারিতাসের জরিপে পথশিশুদের জন্য সহজ পদ্ধতিতে জন্ম নিবন্ধন, ওয়ার্ডভিত্তিক ও ভ্রাম্যমাণ কার্যক্রম এবং হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সরাসরি নিবন্ধনের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দরিদ্র ও পথশিশুদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিচয় ও বয়সের সরকারি প্রমাণ না থাকলে শিক্ষা ও অন্যান্য সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি জটিলতা তৈরি হচ্ছে। পথশিশুদের বড় একটি অংশ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। অনেকের বাবা-মায়ের পরিচয়, ঠিকানা কিংবা জন্মসংক্রান্ত তথ্য জানা নেই। কারও কাছে জন্মের কোনো নথিও নেই। ফলে সাধারণ প্রক্রিয়ায় তাদের জন্ম নিবন্ধন করানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যেসব শিশুর পরিচয় বা অভিভাবকের তথ্য নেই, তাদের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা আরও বেশি।

নিবন্ধন দিতে অনীহা কর্মকর্তাদের : বিদ্যমান আইনে পরিত্যক্ত শিশু বা সাধারণ স্থানে পাওয়া পরিচয়হীন ব্যক্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দেওয়া জন্ম বা মৃত্যুর তথ্য নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখার বিধানও রয়েছে। শিশুর জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে সরকার ২০২২ সালে। ওই বছরের ২৭ জুলাই থেকে অনলাইনে শিশুর জন্ম নিবন্ধনের আবেদনে বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক রাখার নিয়ম শিথিল করা হয়। এতে বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন না থাকার কারণে শিশুর নিবন্ধন আটকে যাওয়ার একটি বাধা নিষ্পত্তি হয়েছে।

এ নিয়ে গত জুন মাসে একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে সিটি করপোরেশন ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছেন। কর্মশালায় রেজিস্ট্রার জেনারেল পথশিশুদের জন্ম নিবন্ধন নিয়ে মাঠ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি।

কারিতাস বাংলাদেশের হয়ে পুরান ঢাকায় পথশিশুদের নিবন্ধনের জন্য কাজ করছেন সংস্থাটির প্রোগ্রাম অফিসার আন্তনী প্রিন্স গমেজ। আলাপকালে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আইন সংশোধন হলেও নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ হয়নি। গত ১৮ জুন থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পুরান ঢাকায় মাত্র আট পথশিশুর জন্ম নিবন্ধন এন্ট্রি করাতে পেরেছেন। এ সময়ে কোনো শিশুর নিবন্ধন হাতে পাননি। শতাধিক শিশুর জন্ম নিবন্ধনের জন্য তার হতে সবকিছু প্রস্তুত করে রেখেছেন।

তিনি বলেন, কর্মকর্তারা সহজেই পথশিশুদের জন্ম নিবন্ধন নিতে চান না। তারা আইনি ঝামেলাসহ নানা কথা বলেন। এই গতিতে নিবন্ধন হলে বছরে আমরা ১০০ শিশুর জন্ম নিবন্ধন করতে পারব কি না, সন্দেহ আছে। এদিকে, একই সংস্থার কর্মকর্তারা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় অন্তত ৪০ শিশুর জন্ম নিবন্ধন করেছেন বলে জানা গেছে।

জন্ম নিবন্ধন না থাকলে যত সমস্যা : জন্ম নিবন্ধন একটি শিশুর আইনগত পরিচয় প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। জন্ম নিবন্ধনের তথ্য ও জন্মসনদ বয়স ও পরিচয়ের সরকারি প্রমাণ হিসেবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, বিচার ও বিভিন্ন নাগরিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এককথায় জন্ম নিবন্ধন না থাকলে শিশুর টিকা গ্রহণ থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত প্রশাসনিক নানা ঝামেলা থেকে যায়।

বেসরকারি কিছু সংস্থার উদ্যোগে পথশিশুদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মক্ষম করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারা কয়েকজন পথশিশুকে কাজ শিখিয়ে বিদেশেও পাঠিয়েছেন। তখন জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট তৈরি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এমনকি পথশিশু বড় হয়ে কর্মক্ষম হওয়ার পর আইন অনুযায়ী বিয়ে করতে গেলেও জন্ম নিবন্ধনের জটিলতা পোহাতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। 

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জন্মের পরপরই প্রতিটি শিশুর নিবন্ধন করতে হবে এবং জন্মের পর থেকেই তার নাম ও জাতীয়তা অর্জনের অধিকার থাকবে।’ বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে এই সনদে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে। ফলে প্রতিটি শিশুর জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহসভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদি আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রত্যেক শিশু জন্মের পর নিবন্ধন পাওয়া তার অধিকার। যাদের বাবা-মা আছে, তারাই হিমশিম খাচ্ছেন। আর যাদের বাবা-মা নেই বা পথে বসবাস করেন তাদের জন্য আরও দুরূহ।

তিনি বলেন, পথশিশুদের দেখভাল করার পুরো দায়িত্ব সরকারের। তাদের বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা ও পড়াশোনার ব্যবস্থা সরকারিভাবে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই কাজে আমাদের অনেক গ্যাপ রয়েছে।

সাধারণ মানুষেরও জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে ভোগান্তি : জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের জটিলতা সাধারণ নাগরিকদেরও কম নয়। জন্ম নিবন্ধন সংশোধন, বাবা-মায়ের তথ্য ঠিক করা এবং মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নথি ও তথ্যের প্রয়োজন হয়। ২০২৬ সালের শুরুতে নতুন সার্ভারে তথ্য স্থানান্তরের কারণে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন সংশোধন কার্যক্রম দেড় মাসের বেশি সময় বন্ধ ছিল। এতে পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও অন্যান্য কাজে নাগরিকদের সমস্যা হয়।

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা আব্দুল হাকিম জানান, চার মাস হয়েছে ছেলের জন্ম নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছেন। কয়েক দফায় যোগাযোগ করে এখনো হাতে পাননি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধনের অনলাইন ব্যবস্থায় একাধিক ধাপ রয়েছে। বাবা বা মায়ের নাম সংশোধনের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব জন্ম নিবন্ধনের তথ্য আগে সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। আবেদনকারীর মোবাইল নম্বর সংযুক্ত থাকা এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র দেওয়ার শর্তও রয়েছে। অনলাইন ব্যবস্থায় একটি জন্ম নিবন্ধন সর্বোচ্চ চারবার সংশোধনের আবেদন করা যায়।

জন্ম নিবন্ধনে পিছিয়ে বাংলাদেশ : পথশিশুদের বাইরে দেশের সামগ্রিক জন্ম নিবন্ধনের চিত্রও পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (এমআইসিএস) চূড়ান্ত প্রতিবেদন মতে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৫৯ শতাংশের জন্ম নিবন্ধন হয়েছে। তবে জন্মসনদ হাতে আছে ৪৭ শতাংশের। ২০১৯ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ৫৬ ও ৩৯ শতাংশ।

এমআইসিএসের তথ্য বলছে, জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সচেতনতার পাশাপাশি দারিদ্র্য, খরচ এবং ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছানোর সুযোগও বাধা হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থার মধ্যে এখনো পর্যাপ্ত সংযোগ নেই। ফলে হাসপাতালে জন্ম নেওয়া অনেক শিশুর জন্মের সময়ই নিবন্ধন হচ্ছে না।

এসব বিষয়ে বক্তব্য নিতে গতকাল সোমবার দুপুরে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে গিয়েও কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রেজিস্ট্রার জেনারেল অন্য একটি দায়িত্বে থাকায় তিনি অফিসে ছিলেন না। অন্য কোনো কর্মকর্তাও কথা বলতে রাজি হননি। এরপর পাঁচজন কর্মকর্তাকে ফোন করা হলে কেউ রিসিভ করেননি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত