‘জিনিসগুলান বাঁচাবার জন্নি যমুনাত লাপ দিনু, তাও পারনু না’

স্বপ্না বেওয়ার সবই ছিল। পাকা বাঁশের শক্ত বাড়ি, ঘরভর্তি জিনিসপত্র। কিন্তু সর্বানাশা যমুনার ভাঙন মুহূর্তেই কেড়ে নিয়েছে সব। এখন সব হারিয়ে সর্বশান্ত স্বপ্নার কপালে চিন্তার ভাঁজ।

শুক্রবার নদীর পাশে দাঁড়িয়ে নিজের বাড়ি তলিয়ে যাওয়ার কথা বর্ণনার সময় স্বপ্নার চোখ ছলছল করছিল। আবেগ আটকে স্বপ্না বলেন, হামাগিরে ঘরবাড়ি কয় মিনিটের মদ্দ্যে যমুনা লিয়ে লিলো। বাড়িঘরের জিনিসগুলান বাঁচাবার জন্নি যমুনাত লাপ দিনু, তারপরও পারনু না।

বগুড়ায় যমুনার পানি বিপৎসীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বাঁধে ভাঙনের ফলে স্বপ্নার মতো ইছামারা গ্রামের শতাধিক বাড়িঘর মুহূর্তের মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। ইছামারা মোড় থেকে বাঁধটি পূর্ব যমুনা নদীর দিকে প্রায় ৫০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই বাঁধে গত ২৫ বছর আগে বসতি গড়ে তুলেছিলেন যমুনা নদী ভাঙনের শিকার বেশ কয়েকটি পরিবার।

যমুনার গর্ভে যখন বিলীন হচ্ছিল বাড়িঘর-সহায় সম্বল, তখন যে যতটুকু পেরেছেন নিজেদের জিনিসপত্র ঘর থেকে বের করেছেন। যমুনার পানিতে বসতবাড়ির টিনের চালা ভাসতে দেখেছেন তারা।

শুক্রবার সকালে ওই এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, রাতের মধ্যে আরও অর্ধশতাধিক বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আগের দিনের ভয়াবহতার কথা জানাচ্ছিলেন গ্রামের মানুষজন। ভাঙন আতঙ্কে সারারাত নির্ঘুম কাটিয়েছে তারা।

বৃহস্পতিবার বিকেল সোয়া তিনটা থেকে চারটার মধ্যে ঘটে যাওয়া এই ভাঙনের শিকার সারিয়াকান্দির ইছামারা গ্রামের মানুষের আশ্রয় এখন খোলা আকাশের নিচে।

লিভা আক্তার নামে ভাঙন কবলিত এক নারী বলেন, ‘দেকতে দেকতে লিমিষে দুডা ঘর জিনিসপত্রসহ যমুনা লদীত বিলীন হয়া গেল।’

ভাঙনের শিকার রাশেদা বেগম, মরিয়মরাও একই কথা জানালেন। এখন তাদের ঠিকানা বলতে খোলা আকাশ।

এলাকাবাসির ধারণা, এভাবে যমুনা নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকলে ইছামারা গ্রামের পুরাতন বেড়িবাঁধ যমুনায় বিলীন হবে। বেড়িবাঁধে বসবাসরত প্রায় হাজারো মানুষ ভিটেমাটি ছাড়া হবেন। এ বাঁধের পশ্চিমে প্রায় কয়েক হাজার বিঘা জমির আমন ধান যমুনা নদীর পানিতে প্লাবিত হবে। পানিবন্দী হবে কামালপুর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষ।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, জেলার সারিয়াকান্দি যমুনার নদীর মথুরাপাড়া স্টেশনে শুক্রবার বেলা তিনটায় নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১৬.৪১ মিটার; যা বিপদসীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপরে।

কামালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাছেদুউজ্জামান রাসেল বলেন, এ গ্রামের প্রায় ৫০০ মিটার এলাকা হঠাৎ যমুনা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীন হয়েছে শতাধিক বসতবাড়ি এবং তাদের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। ভাঙনের শিকার এলাকাবাসীকে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় সাময়িকভাবে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।

সারিয়াকান্দি ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবুজ কুমার বসাক বলেন, ভাঙন কবলিত এলাকায় বড় আকারের জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ভাঙনের শিকার এলাকাবাসীকে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাময়িকভাবে আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় খাবার সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।