সংকট আছে সমাধান কোথায়?

দিনরাত্রি মিলে হয় চব্বিশ ঘণ্টা। কিন্তু সব চব্বিশ ঘণ্টা কি সমান মনে হয়? নিশ্চয়ই নয়। কোনো কোনো চব্বিশ ঘণ্টা যেন মুহূর্তেই চলে যায়। যখন মানুষের হাতে টাকা-পয়সা থাকে অথবা প্রিয়জন পাশে থাকে। কিন্তু যখন প্রয়োজন তীব্র কিন্তু টাকা-পয়সার সংকট, তখন চব্বিশ ঘণ্টা যে কত বড় তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। আবার এটাও তো সত্যি যে, আর্থিক সংকট যত তীব্রই হোক না কেন পৃথিবী তার ঘোরা থামাবে না বা গতি কমাবে না। ফলে চব্বিশ ঘণ্টা কমবে বা বাড়বে না। চব্বিশ ঘণ্টাই থাকবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়ে সমাধানের আশায় মানুষ আপ্তবাক্য আওড়ায়। যেমন দিন বদলাবেই, এ রকম থাকবে না বা যত মুশকিল তত আসান। এতে সমস্যার সমাধান না হলেও, মানুষ একটু মানসিক সান্ত্বনা পায়। আজকের এই নিরবান্ধব হয়ে যাওয়ার কালে এটুকু সান্ত্বনাই বা কম কী?  

কিন্তু সান্ত্বনারও রকমফের আছে। কোনো কোনো সান্ত্বনার বাণীতে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। আবার কোনো সান্ত্বনার বাণী শুনলে গা জ্বালা করে। যদি দেখা যায়, ভুক্তভোগীকে সান্ত্বনা দেওয়া আর দুষ্কৃতকারীকে সহযোগিতা করা হয় তখন রাগ এবং ক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে। আর যদি দেখা যায় পরামর্শ দেওয়া হয় এভাবে যে, অপরাধী তো অপরাধ করবেই, তোমার কাজ হচ্ছে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া। তখন ভুক্তভোগী ক্ষুব্ধ হয় আর সুবিধাভোগী আনন্দিত হয়। নানা কায়দায় মানুষকে নিপীড়নের বিপরীতে ‘কায়দা করে বেঁচে থাক’ এ নীতি নিয়ে চললে নিপীড়ন তো কমেই না বরং বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও মানুষ এমন কথা বলে, এভাবে সান্ত্বনা দেয় এবং অসহায়ের মতো ভুক্তভোগীরা শুনতেই থাকে।  

মানুষের জীবনে কোনো কোনো সংকট আসে তা সে বুঝতে পারে। কিন্তু সমাধানের পথ খুঁজে পায় না। এরও আবার দুটো ভাগ আছে। প্রত্যক্ষ সংকট আর পরোক্ষ সংকট। প্রথমে পরোক্ষ সংকটের কথা ভাবা যাক। যেমন দেশ থেকে টাকা পাচার, বড় বড় প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ ইত্যাদি। যখন ফলাও করে প্রচার হয় তখন মানুষ এসব কথা শোনে, সমাজে তার প্রভাব টের পায়, সংকট নিয়ে নিজেরা কথাবার্তা বলে আর ভাবে এসব বিষয়ে আমার কী করার আছে? সরকার আছে, সরকার দেখবে। কিন্তু কিছু বিষয় আছে, প্রত্যক্ষ সংকট এবং জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। দ্রব্যমূল্য তার মধ্যে অন্যতম। সাধারণ মানুষের যা আয়, তা পুরোটা ব্যয় করার পরও যখন সংসার চলে না তখন সে ক্ষুব্ধ হয়। কী করা উচিত তা নিয়ে ভাবে না বরং কী করতে হবে সেটা করে। সাধারণ মানুষের দৌড় তো তার আয়ের সীমানা পর্যন্তই। তাই সে খাওয়া কমায়, কাপড় কেনা কমায়, প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা ছোট করতে থাকে। সমস্যার কারণ দূর করতে না পেরে নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি করে। প্রধানত দাম্পত্য কলহে লিপ্ত হয়, স্ত্রীকে মারধর করে, সন্তানদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, বাবা-মাকে অপমান করে আর নিজেকে অপদার্থ ভাবতে থাকে।

এ রকম সময়ে যাদের দায়িত্ব সমস্যার সমাধান করা, তারা যদি দায়িত্ব এড়িয়ে যান, তাহলে কেমন হয়? অথবা যদি তারা এমন পরামর্শ দেন যাতে সমস্যা দূর না হয়ে বরং যাদের জীবনে সমস্যার আঘাত আছে তাদেরকেই সহ্য করার বা বিকল্প পথ বের করার কথা বলা হয়, তাহলে কেমন লাগে? কাঁচা মরিচের দাম এক হাজার টাকা উঠার পর আমদানির ঘোষণা আসতে না আসতেই কেজিপ্রতি তিনশ টাকা কমে গেল। এই কমে যাওয়াকে অর্থনীতির ডিমান্ড সাপ্লাই তত্ত্বের সঙ্গে মেলানো যাবে কেমন করে?  

একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, বাংলাদেশে দেখা যায়, মজুদ আছে, সরবরাহ আছে, তারপরও হঠাৎ করে জিনিসের দাম বেড়ে যায়। পেঁয়াজ, ডাবের ক্ষেত্রে দেখলাম। কাঁচা মরিচের কেজি এক হাজার টাকা দেখলাম। সিন্ডিকেটের কথা দায়িত্বশীল মন্ত্রীরাও বলেন। আমরা মনে করি, সরকার দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে। এই নিত্যপণ্যের মৌসুমি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে কি না, তা জানতে চান তিনি।

এর জবাব দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন ডিম নিয়ে শুরু করেছে। ডিমের দাম কমলে বেশি সেদ্ধ করে ফ্রিজে রেখে দেবেন। অনেক দিন ভালো থাকবে, সহসা নষ্ট হবে না। রান্না করতে পারবেন, ভর্তা বানাতে পারবেন।’ তিনি বলেন, ‘সিন্ডিকেটের ওপর নির্ভরশীলতা কমায় দেব, বিকল্প ব্যবস্থা করব। সিন্ডিকেট এভাবেই ভেঙে যাবে।’ বর্ষাকালে কাঁচা মরিচের দাম বাড়ে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিকল্প ব্যবস্থা তো রয়েছে। কাঁচা মরিচ এখন শুকনা করে রেখে দেওয়া যায়, পেঁয়াজ শুকিয়ে সুন্দর করে রেখে দেওয়া যায়। যে জিনিসটা বেশি হবে, সেটা ভালো করে রোদে শুকিয়ে রেখে দিলে অনেক দিন ব্যবহার করা যায়।

সেই একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘খাদ্যপণ্য নিয়ে কয়েকটা হাউজ ব্যবসা করে। যখনই তারা আর্টিফিশিয়ালি (কৃত্রিমভাবে) দাম বাড়ায়, আমরা আমদানি করি, বিকল্প ব্যবস্থা করি। যাতে তারা বাধ্য হয় দাম কমাতে। আমরা তো সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেই।’ এর আগে কাঁচা মরিচের দাম বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ জুন গণভবনে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বর্ষা হলে কাঁচা মরিচের দাম বেড়ে যায়। তাই কাঁচা মরিচ উৎপাদন করে রোদে শুকিয়ে রেখে দেন। পরে পানি ছিটিয়ে দিলে এটি তাজা হয়ে যায়। খরচ কমিয়ে সংসার চালানোর ক্ষেত্রে এই পরামর্শ কাজে লাগতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যারা প্রধানমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী, আর্টিফিশিয়ালি দাম বাড়িয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করল, তাদের কি শাস্তি হবে না?

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক ডিমের চাহিদা সাড়ে তিন থেকে চার কোটি পিস আর পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সংগঠনগুলোর হিসাব মতে, ডিমের দৈনিক চাহিদা ৪ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৮০ লাখ পিস। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে ডিম উৎপাদন হয়েছে ২ হাজার ৩৩৫ কোটি। প্রতিবছর দেশে ডিমের উৎপাদন বাড়ছে। সে হিসেবে দৈনিক গড় উৎপাদন দাঁড়ায় ৬ কোটি ৪০ লাখের কাছাকাছি। তাহলে তো ডিমের ঘাটতি থাকার কথা নয়। জুলাই মাসে খুচরা বাজারেও ডিম বিক্রি হয়েছে ১০ টাকা পিস, আগস্ট মাসে ডিমের দাম ১৫ টাকা পিস। প্রতিদিন চার কোটি ডিম বিক্রি হলে ক্রেতাদের পকেট থেকে বাড়তি চলে যায় ২০ কোটি টাকা। তাহলে এক মাসে ভোক্তারা বেশি খরচ করেছেন ৬০০ কোটি টাকা। গত কয়েক মাস ধরে মুরগির খাদ্যের দাম তো একই পর্যায়ে আছে, বিদ্যুৎ এবং পরিবহন খরচও আগের মতোই। তাহলে দাম বাড়ানোর কারণ কী? বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অভিযোগ করেছেন, কাজী ফার্ম, প্যারগন, নারিশ গ্রুপই ডিমের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।

বাংলাদেশে ডিম বেশি খায় কারা? যারা মাছ, মাংস খেতে পারে না দামের কারণে তাদের জন্য আমিষের একমাত্র বিকল্প ডিম। এক কেজি মাংসের দাম ৮০০ টাকা। প্রতি কেজিতে ১২ পিস করলে প্রতি পিসের দাম পড়ে প্রায় ৬৭ টাকা। ব্রয়লার মুরগির প্রতি পিসের দাম পড়ে ২৫ টাকা, সবচেয়ে সস্তা পাঙাশ মাছের এক পিসের দাম পড়ে ২০ টাকা। এর সঙ্গে আছে রান্নার তেল মসলার খরচ। ডিমের ক্ষেত্রে সে খরচ খুবই কম, সহজে রান্না করা এবং খাওয়া যায়। সে কারণেই শ্রমিক, মেসে বাস করে যারা এবং স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে ডিম শুধু প্রিয়ই নয়, প্রয়োজনীয় খাবার। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে যে খাত থেকে সেই গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকদের আমিষের প্রধান উৎস ডিম। মাসে ১০ হাজার টাকা আয় করে যে শ্রমিক সে আর কী খেতে পারে? এসব শ্রমিক এবং দিন এনে দিন খাওয়া মানুষদের ডিম সিদ্ধ করে ফ্রিজে রেখে দেওয়ার পরামর্শ কতটা কার্যকরী? কিংবা ফ্রিজে মরিচ, পেঁয়াজ সংরক্ষণ করার পরামর্শ কতটা বাস্তবসম্মত? কারা দাম বাড়ায়, কারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, কারা মাঠের ফসল আর পাতের খাবার নিয়ে একচেটিয়া ব্যবসা করে এবং সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে তা কি সরকারের জানা নেই?  

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণ মতামত দেয়। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের। ফলে শুধু সাফল্যের প্রশংসা নয়, ব্যর্থতার দায় তাদেরই নিতে হবে। প্রশ্ন উঠবে, উন্নয়ন হচ্ছে অবকাঠামোর কিন্তু জনগণের জীবনমানের উন্নতি হচ্ছে কি? এই প্রশ্নের সমাধানের লক্ষ্যে যে বিতর্ক তা শুধু জনগণের জীবনমানের উন্নতি ঘটাবে না, উন্নতি ঘটাবে গণতান্ত্রিক চেতনার। মানুষ যুক্তি করবে, নির্বাচনে তার যুক্তি অনুযায়ী ভোট দেবে। রাজনীতিতেও বিকল্প খোঁজার পরিবেশ গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কথা সত্য যে, সব বিকল্প সব সময় ভালো হয় না। তাই শুধু বিকল্প নয়, চেষ্টা করতে হবে উন্নততর বিকল্প প্রতিষ্ঠার। বিকল্প প্রতিষ্ঠার এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকুক।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট