ফুটবলারদের দক্ষতা বাড়ানোর ইচ্ছেটাই কমে গেছে

ক্লাব কোচিংয়ে পরিচিত মুখ জুলফিকার মাহমুদ মিন্টু। জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার গেল দুই মৌসুম শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি এএফসি প্রো-কোচেস লাইসেন্স অর্জন করা মিন্টুর অধীনে বাংলাদেশ অলিম্পিক দল ৪ সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ড যাচ্ছে এএফসি অনূর্ধ্ব-২৩ এশিয়ান কাপ বাছাই খেলতে। আসছে আসর নিয়ে দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র

মুখোমুখি হয়ে বলেছেন অনেক কথা

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ অলিম্পিক দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব পেলেন। ক্লাব কোচিং আর জাতীয় দলের কোচিংয়ের মধ্যে ফারাকটা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন?

জুলফিকার মাহমুদ মিন্টু : একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করা আর একটি ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করা দুই রকম ব্যাপার। তবে কাজের ধরন প্রায় এক। দেশের হয়ে কাজ করার আলাদা একটা আনন্দ থাকে। দলের প্রতি সবার আগ্রহ বেশি থাকে, গুরুত্বটাও বেশি থাকে। আর ক্লাবে আপনি অনেক বেশি সময় পাবেন কাজের। যেটা জাতীয় দলের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। এই যুবদল নিয়ে কাজ করার সময় ছিল মাত্র তিন সপ্তাহ। এই অল্প সময়েই অনেকগুলো কাজ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ঠিক করে কাজ করতে হয়। আমরা কাদের সঙ্গে খেলব, তাদের খেলার ধরন কেমন, তাদের শক্তি-দুর্বলতার দিক, তাদের মূল খেলোয়াড় কারা, আমাদের খেলার ধরন কেমন হবে, কীভাবে তাদের থামাব এ রকম অনেক বিষয়ে প্রথমে ধারণা নিয়ে সেটা নিজের খেলোয়াড়দের জানানো এবং সেভাবেই ম্যাচ বাই ম্যাচ ট্রেনিং ও পরিকল্পনা করতে হয়।

বিকেএসপিতে তিন সপ্তাহ আবাসিক ক্যাম্প করালেন। এই দলটা কেমন মনে হলো আপনার কাছে?

মিন্টু : বিকেএসপিতে আবাসিক ক্যাম্প করানোর প্রধান কারণ ছিল ঢাকায় ট্রেনিংয়ের সুবিধা সেভাবে নেই। তা ছাড়া বিকেএসপিতে যাওয়ার আরেকটা কারণ ছিল টার্ফ ও ঘাসের মাঠে অনুশীলন করানোর সুযোগ কাজে লাগানো। তবে সেখানে প্রতিদিনই বৃষ্টি হওয়ায় আমাদের বাধ্য হয়েই টার্ফে ট্রেনিং করতে হয়েছে। যদিও থাইল্যান্ডে আমাদের খেলতে হবে ঘাসের মাঠে। এটা মেনে নিয়েই দলকে প্রস্তুত করতে হয়েছে। থাইল্যান্ডে পৌঁছে ৪ সেপ্টেম্বরই চেষ্টা করব ট্রেনিং করতে। এরপর ৫ তারিখে অফিশিয়াল ট্রেনিং সেশনের সুযোগ পাব। এর মধ্যেই দলকে মানিয়ে নিতে হবে। আমার ইচ্ছে ছিল জাতীয় দলের সঙ্গে একটা প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার। তবে জাতীয় দল থেকে ইতিবাচক সাড়া পাইনি। আমরা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সঙ্গে একটি ম্যাচ খেলে ৪-১ গোলে জিতেছিলাম। শুরুতে ক্যাম্পে যোগ দেওয়া খেলোয়াড়দের ফিটনেসের অবস্থা করুণ ছিল। ২২ জুলাই লিগ শেষ থেকে ১০ আগস্টÑ এই ২০ দিন ছেলেরা খেলার বাইরে ছিল। ট্রেনিং নিয়ে একটা কথা প্রচলিত আছে, আপনি যখন ট্রেনিং ছেড়ে দেবেন, তখন ঠিক উল্টো বিষয়গুলো আপনার সঙ্গে ঘটতে থাকবে। ওদের ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে।

তাহলে তো খেলোয়াড়দের ফিটনেস নিয়েই অনেক কাজ করতে হয়েছে?

মিন্টু : লিগ শেষে ২০ দিনে খেলোয়াড়দের ফিটনেস লেভেল শূন্যে পৌঁছেছিল। এই তিন সপ্তাহে তাদের ফিটনেস লেভেল শীর্ষে আনার পাশাপাশি টেকনিক্যাল ও ট্যাকটিক্যাল বিষয়গুলো সামনের ম্যাচগুলোর প্রতিপক্ষের খেলা মাথায় রেখে করতে হয়েছে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের বিপক্ষে আমরা কী করতে চাই, ওদের কী করতে দেব নাÑ এসব নিয়েও কাজ করতে হয়েছে। আবার এটাও মাথায় রাখতে হয়েছে, যাতে কেউ ইনজুরিতে না পড়ে।

দলের শক্তি ও দুর্বলতার দিকগুলো বলবেন?

মিন্টু : ওরা সবাই তরুণ। সেরাটা দেওয়ার মানসিকতা আছে। তবে যে দুটি সমস্যা দেখেছি, সেগুলো আমাদের ফুটবলেরই সামগ্রিক সমস্যা। ফিনিশিংয়ে দুর্বলতা দেখেছি। আর ট্রানজিশনে আমাদের খেলোয়াড়রা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কখন আমাকে আক্রমণে উঠতে হবে, আবার বল হারালে কত দ্রুত নেমে এসে ডিফেন্স করতে হবে, এ বিষয়গুলোতে সমস্যা আছে। এটা মানসিক সমস্যা। এক-দুই সপ্তাহে এর সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়। তা ছাড়া ট্যাকটিক্যাল বোঝাপড়ার অভাবটা আমাদের ভীষণ ভোগায়। এটা ক্লাব পর্যায়েও আমাদের ফেস করতে হয়।

বাছাইয়ে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের লক্ষ্য কী থাকবে?

মিন্টু : এখানে ১১টি গ্রুপের ১১ সেরার সঙ্গে চারটি সেরা রানার্স-আপ দল চূড়ান্তপর্বে যাবে। আমাদের লক্ষ্য অবশ্যই থাকবে চূড়ান্তপর্বে খেলার। এদের কাছ থেকে আপনি হয়তো অনেক বড় কিছু আশা করতেই পারেন, তবে সেটা পূরণ করাটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। জাতীয় দলের খেলা থাকায় আমরা সাতজন খেলোয়াড়কে পাচ্ছি না। তারা থাকলে নিশ্চয় শক্তির গভীরতা বাড়ত। তবে তারা নেই বলে আমার কোনো অজুহাত নেই। যারা আছে, তাদের নিয়েই ঝাঁপাতে হবে। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড যুবদল দুই বছর ধরে এই বাছাইয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। কিছুদিন আগে আসিয়ান অঞ্চলের একটা টুর্নামেন্টে আমাদের তিন প্রতিপক্ষই খেলেছে। এসব কোনো অজুহাত নয়। বাস্তবতা। আর সেটা মেনেই পারফরম্যান্স কোচ হিসেবে দলের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনা আমার দায়িত্ব।

তার মানে বয়সভিত্তিক পর্যায়েও দল ও কোচদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কাজ করতে দেওয়া উচিত...?

মিন্টু : কোচিংয়ের তিনটি ধাপ আছে। প্রারম্ভিক ধাপ, মধ্যম ধাপ ও সর্বোচ্চ ধাপ। প্রারম্ভিক ধাপে অনেক বেশি সময় দিতে হয়। কারণ আমাদের মতো দেশে বোঝাপড়া ও বুদ্ধিমত্তার খানিকটা অভাব রয়েছে। তাই এখানে বেশি সময় দিয়ে চর্চা করতে হয়। মধ্যম ধাপে একটু কম। আর সর্বোচ্চ ধাপে কোচরা কখনোই খুব বেশি সময় পাবে না। আমি মনে করি আমরাও যদি একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে বয়সভিত্তিক দলগুলোকে প্রস্তুত করি, তবে সাফল্য আসবেই।

নিজে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলেছেন। এখন কোচিং করাচ্ছেন। দুইটা সময়ের তুলনা করতে বললে কী বলবেন?

মিন্টু : সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো এখন নিয়মিত লিগ হচ্ছে। আমাদের সময় নিয়মিত লিগের জন্য আন্দোলন পর্যন্ত করতে হয়েছে। তা ছাড়া অনেক বাধ্যবাধকতার মধ্যে খেলতে হতো। ন্যাশনাল পুল, ক্লাবগুলোর জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্টের মতো ব্যাপারগুলো মাথায় নিয়ে খেলত হতো। স্বাধীনতা কম ছিল। টাকা-পয়সাও এখনকার মতো ছিল না। এখন এসব নিয়ে ভাবতে হয় না। ক্লাবগুলো খেলোয়াড়দের ভালো-মন্দের বিষয়ে ভীষণ নজর দেয়। খেলোয়াড়দের পাশাপাশি কোচরাও ভালো টাকা পায়। তবে সবার প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, টেকনিক্যাল দক্ষতা এখনকার খেলোয়াড়দের কমেছে আগের তুলনায়। দল হিসেবে এখন ভালো খেলছে। তবে এখন ভালো স্কিলের খেলোয়াড় খুব চোখে পড়ছে না। ফুটবলারদের দক্ষতা বাড়ানোর ইচ্ছেটাই কমে গেছে।

ভালো দক্ষতার খেলোয়াড় কেন উঠে আসছে না?

মিন্টু : নিজেকে সেরা হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বটা সম্পূর্ণই ব্যক্তিগত। আমি নিজেকে কোথায় দেখতে চাই, সেটা করতে গেলে কী করতে হবে, এখনকার ফুটবলাররা সেগুলো নিয়ে ভাবে না। আগে এক পজিশনে অনেক কম্পিটিশন ছিল। তার মানে প্রচুর খেলোয়াড় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেরিয়ে আসত। এখন সে রকম লড়াইটাই অনুপস্থিত।

এএফসি প্রো-লাইসেন্স করলেন। কোচ হিসেবে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?

মিন্টু : কোচিংকে পেশা হিসেবে নেওয়ার চিন্তাই শুরুতে ছিল না। তবে খেলোয়াড়ি জীবনে জর্জ কোটান, মার্ক হ্যারিসনের মতো বেশ কজন বিদেশি কোচের সঙ্গে কাজ করেছি। তারাই আমাকে বলেছেন, খেলা ছাড়ার পর তুমি কোচিংয়ে এলে ভালো করবে। সেটা কিছুটা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। তবে আমি বিশেষভাবে বলব আমাদের অগ্রজ মারুফ ভাইয়ের কথা। একটা সময় কোচিংটা পেশা হিসেবে দেখা হতো না। মারুফ ভাই দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলেছেন। তিনি বুঝিয়েছেন কোচ হিসেবেও ভালো চুক্তি পাওয়া যায়। সেটা দেখেই এটাকে গুরুত্ব দিয়েছি। এখন যেহেতু প্রো-লাইসেন্স আছে, অবশ্যই ইচ্ছে থাকবে দেশের বাইরে কাজ করার।