সুন্দর আগামীর জন্য গবেষণা করেন যারা

বাংলাদেশের সূতিকাগার বলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলে পূর্ববঙ্গে একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত গড়ে ওঠে। তারাই বাঙালি জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত হয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম-মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দেয়। কিন্তু আজ বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ের প্রথম শতকে নেই দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার এমন পরিস্থিতিতে গবেষণার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করার জন্য বিজন কুমার এবং তার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্লুমিং নলেজ স্কুল অব রিসার্চ। লিখেছেন বিপুল জামান

শুরুর গল্প

২০১৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষার্থী তরুণ বিজন কুমার থিসিস পর্বে দেখেন গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও সংস্কৃতি অনুকূল নয়। একই সেশনের অন্য শিক্ষার্থীদের কী অবস্থা জানতে চেষ্টা করলেন তিনি। অন্য বিভাগেও একই অবস্থা দেখে ঠিক করলেন নিজেরাই আলাপ-আলোচনা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে গবেষণার কাজ এগিয়ে নেবেন। নিজেরা বসতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার চত্বরে, মাঠে, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায়। বেশ কয়েক মাস যাওয়ার পর শুরু হয় এর সাংগঠনিক যাত্রা। নাম দেন ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যাটফরম অব ইকোনমিক রিসার্চ। এই যাত্রায় বিজন কুমারের সঙ্গী ছিলেন সহপাঠী মাহমুদুল হাসান, জসীম উদ্দিন, নীলুফা ইয়াসমিন, বিদুর কুমার ও খাদিজা আক্তার।

গবেষকদের আশ্রয়স্থল

প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি দারুণ ফলপ্রসূ হয়। নিয়মিত বৈঠক ও গঠনমূলক আলোচনার ফলে শিক্ষাজীবনের গবেষণা সহজতর হয় তাদের জন্য। বিষয়টি জেনে দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষার্থীরাও যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সংগঠনটির আকাশ। সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয় ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীরা।

২০১৮ সালে এর ব্যাপ্তি আরও বৃদ্ধি পায়। শুধু অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীরাই নয়, বরং অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীরাও যোগাযোগ করে ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যাটফরম অব ইকোনমিক রিসার্চের সদস্যদের সঙ্গে। শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীরাই নয়, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও, এমনকি দেশের বাইরের উচ্চশিক্ষালয়গুলোর শিক্ষার্থীরাও তাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

শুরু থেকেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বৈরী পরিবেশের কথা উপলব্ধি করে একটি গবেষণা সহায়ক পরিবেশ তৈরির কথা ভাবতেন বিজন কুমার। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ লক্ষ্য করে তিনি সংগঠনের সদস্যদের কাছে প্রস্তাব করেন আরও বিস্তৃত পরিসরে কাজ শুরু করার। সর্বসম্মতিক্রমে তারা সিদ্ধান্ত নেন তারা এখন থেকে (২০১৮) শুধু অর্থনীতি বিষয়ে আবদ্ধ থাকবেন না বরং কাজ করবেন সোশ্যাল সায়েন্সের সব ডিসিপ্লিন, বিজনেস, আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ, পাবলিক হেলথ বিষয়ে। এর ফলে সংগঠনটির নাম পরিবর্তনেরও প্রয়োজন দেখা দেয়। নতুন নাম হয় ব্লুমিং নলেজ স্কুল অব রিসার্চ, সংক্ষেপে বিকে স্কুল অব রিসার্চ। পুরনো সতীর্থরা ভিন্ন পেশার ফলে বিকে স্কুল অব রিসার্চের সঙ্গে কার্যক্ষেত্রে যুক্ত নেই বটে কিন্তু শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে আছেন সবসময়।

বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে বিজন কুমারের বিকে স্কুল অব রিসার্চের অধীনে ৩৫০ তরুণ গবেষক গবেষণায় নিয়োজিত আছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও আছেন ভারত, নেপাল, ফিলিপিনস, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, ঘানা, নাইজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমানসহ ২২টি দেশের শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে আরও ১০০ জন গবেষক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। বিকে স্কুল অব রিসার্চে এখন কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পরিষদ না থাকলেও গবেষণার ওপর নির্ভর করে আছেন নির্দিষ্ট দায়িত্বশীল। সংগঠনের সামগ্রিক সমন্বয়ের কাজটি করে ডিরেক্টর হিসেবে বিজন কুমার। তিনি বর্তমানে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশের গবেষণার পরিবেশ পরিবর্তনের জন্য গবেষকদের সম্মান ও স্বীকৃতি দিতে হবে জানান এই গবেষক, সংগঠক। তিনি বলেন, ‘আগের থেকে সরকারি বরাদ্দ বাড়ছে কিন্তু তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। শুধু সরকারি ফান্ডে কিন্তু উন্নত মানের গবেষণা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি শিল্পপতি ও বেসরকারি সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে।’ তিনি মনে করেন, উন্নত গবেষণার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ক্লাস নেওয়ার জন্য প্রতি বিশজনে একজন শিক্ষক এবং গবেষণার তত্ত্বাবধানে প্রতি তিনজনে একজন শিক্ষক থাকা প্রয়োজন। তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নানা প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়, যা অনেক সময় গবেষণার অন্তরায়।

 লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

বিকে স্কুল অব রিসার্চের লক্ষ্য তরুণদের গবেষণায় আগ্রহী করে তোলা। গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখা।

বিকে স্কুল অব রিসার্চ কোনো কাজের জন্য অর্থ লেনদেন করে না। গবেষকরা সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে গবেষণা করেন, সময় ও শ্রম দেন। তবে এর ফলে তারা লাভবানও হন। গবেষণাপত্রটি গবেষকের নামেই প্রকাশ করে বিকে স্কুল। তা ছাড়া যুক্ত থাকায় তরুণ গবেষকের অভিজ্ঞতার পাল্লাও ভারী হয়, যা তাদের পেশাগত জীবনের জন্য সহায়ক প্রমাণিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, তরুণ গবেষকদের জন্য বিকে স্কুল বেশ কটি সেবা বিনামূল্যে প্রদান করে। সেগুলো হলো ফ্রি রিসার্চ কনসালট্যান্সি, ফ্রি মেন্টরিং, ফ্রি সুপারভিশন, ফ্রি এরর চেকিং, ফ্রি প্লেগারিজম চেকিং, রিসার্চ পেপার এডিটিং সার্ভিস, সেমিনারে ও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ।

স্বীকৃতি

গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বেশি সময় পার না হলেও বিকে স্কুল অব রিসার্চের অর্জনের পাল্লা কম নয়। এই প্রতিষ্ঠানের গবেষণা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সেমিনার কনফারেন্স এবং রিসার্চ প্রজেক্ট কমপিটিশনে নির্বাচিত হচ্ছে।  BIMSSCON 2020-†Z 1st Runner Up, BUP Research Project Competition 2023-তে সেরা ১০-এ ছিল। কেমব্রিজ, দুবাই, কাঠমান্ডু, দিল্লি, কলম্বোসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে বিকে স্কুল অব রিসার্চের গবেষণা নির্বাচিত হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত ফান্ড না থাকায় সেখানে প্রতিনিধিদল পাঠাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জার্নালে গবেষণা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে বেশ কটি পুরস্কার লাভ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২২ সালে লাভ করেছে জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড। ২০২৩ সালে বিজন কুমারের নেতৃত্বে বিকে স্কুল অব রিসার্চের ক্রমাগত উন্নতির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন রাইজিং ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ বিকে স্কুল অব রিসার্চের তিনটি গবেষণা তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। গবেষণার বিষয়গুলো হলো, কভিট-১৯ সময়ে বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জগুলো এবং সেগুলো উত্তরণের উপায়, কভিট-১৯ গাইডলাইনের ওপর শিক্ষার্থীদের মনোভাব ও মান্যতার পরিমাপ, রোহিঙ্গা নারী ও কিশোর কিশোরীদের ওপর কভিট-১৯-এর প্রভাব এবং তা থেকে উত্তরণে উপায়।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

এখন পর্যন্ত বিকে স্কুল অব রিসার্চের ২০টি গবেষণা বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হলেও নিজস্ব কোনো গবেষণা জার্নাল নেই। ভবিষ্যতে একটি আন্তর্জাতিক জার্নাল প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। এই জার্নাল মূলত তরুণদের (১৫-৩৫) গবেষণা প্রকাশ করবে। এ ছাড়া ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় দুটি পত্রিকা প্রকাশ করবে প্রতিষ্ঠানটি ডিসেম্বরের মধ্যেই। থাকবে নিজস্ব ওয়েবসাইট। বিজন কুমার বলেন, ‘একটি দেশ গবেষণায় শক্তিশালী না হলে উন্নত হতে পারে না। দেশে একটি গবেষণা সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে নতুন গবেষকদের পথকে সুগম করে তোলায় বিকে স্কুল অব রিসার্চের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। তাহলেই নতুন প্রজন্ম গবেষণায় আগ্রহ পাবে। নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করবে। আর তাতে ভর করে দেশ এগিয়ে যাবে। সুন্দর আগামীর জন্যই তো গবেষণা। আমরা এ লক্ষ্যেই কাজ করছি।’