কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলার মধ্যে মিঠামইন, ইটনা, অষ্টগ্রাম, নিকলী, কুলিয়ারচর ও করিমগঞ্জ এই ছয়টি উপজেলা নিয়ে বেষ্টিত বিশাল হাওরাঞ্চল। এ অঞ্চলে ছোট-বড় শতাধিক হাওর মিঠাপানির মৎস্য ভা-ারের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু ইজারাপ্রথা ও নিষিদ্ধ জাল দিয়ে অবাধে মাছ নিধনের কারণে হাওরে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। দেশীয় প্রজাতির অসংখ্য মাছ বিলুপ্তির পথে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হাওরে মাছের স্থায়ী আশ্রয়স্থলের অভাব এবং জ্যৈষ্ঠ মাসে পোনা ছাড়ার সময় মশারি জাল দিয়ে ডিমওয়ালা মাছ নিধনের কারণে মাছের পরিমাণ কমছে। এ ছাড়া কারেন্ট ও চায়না জাল দিয়ে মাছ ধরে মাছের বংশবৃদ্ধিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এসবের মূলে রয়েছে ইজারাপ্রথা। স্থানীয় প্রভাবশালীরা নদী-বিল লিজ নিয়ে জেলেদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের অবাধে মাছ ধরার সুযোগ করে দেয়। এ ছাড়া ইজারাদাররা চৈত্র মাসে ছোট-ছোট নদী ও বিলের পানি সেচে মাছ ধরেন। কৃষকরা সেই জমিতে বোরো রোপণ করে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার করেন। এর ফলে হাওরে মাছের প্রাকৃতিক খাবার সৃষ্টি হয় না।
হাওর পাড়ের মৎস্যজীবীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রকৃত জেলেরা নদীর ইজারা পায় না। নদী শাসন করে এখন প্রভাবশালীরা। প্রকৃত মৎস্যজীবীরা নদী ইজারা না পেয়ে তারা বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, কিশোরগঞ্জে ৬৪ হাজার ৩০৬ হেক্টর আয়তনের ১২২টি ছোট-বড় হাওর থেকে প্রতি বছর প্রায় ২২ হাজার টন মাছ উৎপাদন হয়। ৮০ থেকে ১২০ প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যায়। হাওরে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে এ বছর জেলায় ৪৫টি বিলে নার্সারি করা হচ্ছে। যেখানে এক থেকে দেড় মাস বয়সী মাছের পোনা লালন-পালন করে বিলগুলোতে ছাড়া হবে। তাছাড়া জেলেদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিকর চায়না জালের ব্যবহার, পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন, সেচ দিয়ে মাছ শিকার ও জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। নিষিদ্ধ জাল ঠেকাতে অভিযান চালানো হচ্ছে।
করিমগঞ্জ উপজেলার গুনধর এলাকার জেলে হেমেন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘২৫ বছর ধরে হাওরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করি। দিনদিন হাওরে মাছ কমে যাচ্ছে। মাছের উৎপাদন বাড়াতে কারেন্ট ও চায়না জালের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। হাওরে মৎস্য অভয়াশ্রমের সংখ্যা বাড়াতে হবে।’
নিকলী উপজেলার ডুবি গ্রামের জেলে রায়হান বলেন, ‘প্রকৃত জেলেদের মধ্যে জলমহাল ইজারা দেওয়া হলে এবং ডিমওয়ালা মাছ ধরা বন্ধ করতে পারলে হাওর আবারও দেশীয় মাছে ভরে উঠবে।’
নিকলী উপজেলা চেয়ারম্যান এ এম রুহুল কুদ্দুস ভূঞা (জনি) বলেন, ‘হাওরে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে প্রতি বছরই সরকারিভাবে মাছ ছাড়া হয়। তবে ছোট মাছগুলোই কিছু জেলে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে ধরে ফেলেন। অবৈধ এসব জালের ব্যবহার বন্ধ করতে পারলে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণেও হাওরে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা দিলীপ কুমার বলেন, ‘পরিবেশ দূষণ, সময়মতো বৃষ্টি না হওয়া, কারেন্ট জালের ব্যবহার ও সম্প্রতি চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহারের ফলে হাওরে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কারেন্ট জাল ও চায়না জালের বিরুদ্ধে আমরা অভিযান চালাচ্ছি। তাছাড়া যারা বিল ইজারা নেন, তারা যেন বিল সেচে মাছ না ধরেন, সেই প্রচারণাও চালাচ্ছি। প্রাকৃতিকভাবে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য মৎস্য আইন বাস্তবায়নে কাজ করছি। জলমহাল প্রকৃত নিবন্ধিত জেলেরা পাচ্ছেন কি না, তা আমরা খতিয়ে দেখব।’