সুতরা কি? এটি ব্যবহারের নিয়ম, মাসয়ালা ও প্রয়োজনীয়তা

নামাজি ব্যক্তির সামনে দিয়ে আসা-যাওয়া নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ। নামাজি ব্যক্তির সামনে দিয়ে মানুষের চলাচলের সম্ভাবনা থাকলে নামাজ শুরুর আগে সুতরা সামনে রেখে নামাজে দাঁড়ানো সুন্নত। কোনো বড় মসজিদে নামাজে দাঁড়ালে সামনে একটি বস্তু রাখা জরুরি। যার ফলে নামাজ অবস্থায় সামনে দিয়ে লোকজন চলাফেরা করতে না পারে।

সুতরা কি?

সুতরাহ শব্দটি আরবি। এর অর্থ হলো আড়াল। সুতরা হলো নামাজের সময় ব্যবহৃত একটি বস্তু, যা তার সামনে দিয়ে চলমান সবকিছু থেকে নামাজ অবস্থাকালীন তাকে আলাদা করে রাখে। কমপক্ষে তিন হাত বা এর কম দূরত্বে সুতরা রেখে নামাজ পড়া হয়। এর উচ্চতা হয় কমপক্ষে এক হাত। প্রস্থে যেকোনো পরিমাণ হতে পারে। সুতরাহ শব্দের অর্থ আড়াল।

সুতরা সম্পর্কিত হাদিস

হযরত ত্বালহা বলেন, আমরা যখন নামাজ পড়তাম তখন পশুরা আমাদের সামনে দিয়ে আসা যাওয়া করত। যখন রাসুল কে এই ব্যাপারে অবগত করা হল তখন তিনি বললেন, যদি উটের পালকির সমান কোন বস্তুও তোমাদের সামনে থাকে তাহলে সামনে দিয়ে গমনকারীরা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। (ইবনে মাজাহ)

হযরত আবু জুহাইম বলেন, রাসূল বলেছেন, যদি নামাজরত ব্যক্তির সম্মুখ দিয়ে গমনকারী ব্যক্তির জানা থাকত যে, তার উপর কি পাপের বোঝা চেপেছে, তবে চল্লিশ পর্যন্ত - দাঁড়িয়ে থাকাকেও সে প্রাধান্য দিত। হযরত আবু নছর বলেন, আমি জানিনা তিনি চল্লিশ দিন বলেছেন কিংবা মাস অথবা বছর। (বুখারী ও মুসলিম)

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর বলেন, রাসুল যখন ঈদের দিন নামাজের জন্য বের হতেন তখন স্বীয় বর্শা সাথে নিয়ে যাওয়ার আদেশ দিতেন এবং তার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হত। তার দিক হয়ে নামাজ পড়াতেন আর লোকেরা তার পিছনে দাঁড়াতেন। সফরকালেও তিনি সুতরা ব্যবহার করতেন। (বুখারী ও মুসলিম)

সুতরা রেখে নামাজ পড়ার নির্দেশ

নামাজির সামনে দিয়ে কেউ চলাফেরা করতে পারে, এমন সম্ভাবনা থাকলে সামনে সুতরা রেখে নামাজ পড়া ওয়াজিব। তা হতে পারে সফরে, বাড়িতে, মসজিদে একাকি কিংবা ইমামের সঙ্গে নামাজ আদায়ে। সর্বাবস্থায় সুতরাহ ব্যবহার করা জরুরি। হাদিসে এসেছে-

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সুতরা ছাড়া নামাজ পড়ো না।’ (ইবনে খুজাইমাহ)

অন্য হাদিসে এসেছে- ‘যে ব্যক্তি সক্ষম হয় যে, তার ও কেবলার মাঝে কেউ যেন না আসে; তাহলে সে যেন তা করে (সুতরা রেখে নামাজ পড়ে)।’ (মুসনাদে আহমাদ, দারাকুতনি, তাবারানি)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ নামাজ পড়বে, তখন সে যেন সামনে সুতরাহ রেখে নামাজ পড়ে।’ (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে হিব্বান, মুসতাদরাকে হাকেম)

হাদিসের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী সুতরাহ রেখে নামাজ না পড়া গুনাহের কাজ। ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারিতে উল্লেখ করেন, সুতরাহ না থাকা অবস্থায় কোনো নামাজির সামনে দিয়ে কেউ পার হয়ে গেলে তার নামাজের সাওয়াব কম হয়ে যায়।’

সুতরার বিধান

ইমামের সামনে সুতরা থাকলে মুক্তাদিদের জন্য পৃথক সুতরার দরকার নেই। তবে কোনো ইমাম যদি সুতরা না দেন, তাহলে মুক্তাদির সুতরা দিতে হবে। সুতরা মাটি থেকে অল্প উঁচুতে হতে হবে। কিছু না পেলে দাগ কেটে দেয়ার প্রচলন আছে, এটা ঠিক নয়।

জায়নামাজের শেষ প্রান্তকে সুতরা বলে গণ্য করা যাবে না। সুতরার সোজাসুজি না দাঁড়িয়ে একটু ডানে-বামে দাঁড়ানোর কথা বলা হয় এটাও ঠিক নয়। বিনা সুতরায় নামাজ পড়লে কেউ সামনে দিয়ে গেলে নামাজ নষ্ট হয় না। কিন্তু নামাজের ক্ষতি হয়। মানুষ চলাফেরা করতে পারে, এমন স্থানে সুতরা না রেখে নামাজ পড়া গুনাহের কাজ।

যে মসজিদের প্রশস্ততা ৪০ হাতের বেশি, এমন মসজিদে নামাজরত ব্যক্তির দুই কাতার সামনে দিয়ে অতিক্রম করা জায়েয। অর্থাৎ নামাজীর কাতারসহ মোট তিন কাতার দূরত্ব দিয়ে যাওয়া যাবে। এর চেয়ে ছোট মসজিদে মুসল্লির সামনে দিয়ে সুতরা ছাড়া অতিক্রম করা যাবে না। নামাজির সামনে দিয়ে যাওয়া মারাত্মক গোনাহের কাজ। এ কাজ থেকে সবার বিরত থাকা উচিৎ।

সুতরা হিসেবে জুতার বাক্সের ব্যবহার

সুতরা এক হাত পরিমাণ হতে হবে বলে ইসলামী আইনবিদরা অভিমত দিয়েছেন। তাই প্রশ্নে বর্ণিত জুতার বাক্সে জুতা রাখা এবং ওই বাক্স সামনে রেখে নামাজ পড়া জায়েজ হলেও সতর্কতামূলক নামাজির সামনে দিয়ে অতিক্রম করা থেকে বিরত থাকবে। (আদ্দুররুল মুখতার : ১/৬৩৭)