নির্ধারিত ‘শিল্পী’র অনুপস্থিতিতে রঙ্গমঞ্চে অনেকেই তো আসলেন! রনি তালুকদার, তানজিদ হাসান তামিম, এনামুল হক বিজয়; ইনিংসের গোড়া পত্তনে অভিজ্ঞ লিটন দাস আর তামিম ইকবালের অভাব পূরণে বিকল্প অনেকগুলো নাম। তবে বাঁচা-মরার ম্যাচে শেষ পর্যন্ত মেহেদি হাসান মিরাজেই ভরসা টিম ম্যানেজমেন্টের। বল হাতে, লোয়ার অর্ডারে ব্যাট হাতে নানান ভূমিকায় দলকে বাঁচিয়েছেন মিরাজ, ২০১৮ সালের এশিয়া কাপ ফাইনালে হুট করে তাকে ইনিংসের সূচনায় নামিয়ে দেওয়ার রাতে লিটনের দৃষ্টিনন্দন ব্যাটিংয়ের সাক্ষী হয়েই ছিলেন মাঠে। তবে কাল লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে মিরাজই বাংলাদেশের ত্রাণকর্তা। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে যে গোড়ায় গলদ হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি ঠেকিয়েছেন। তুলে নিয়েছেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় শতক। সেই সঙ্গে জানান দিলেন, যেকোনো ভূমিকায় সমানে লড়ে যেতে পারেন রূপসাপারের এই ছেলে।
বছর পাঁচেক আগে দুবাইয়ে এশিয়া কাপের ফাইনাল, প্রতিপক্ষ ভারত। তামিম ইকবালের হাত ভাঙল, বিকল্প হিসেবে সৌম্য সরকার এবং নাজমুল হোসেন শান্ত দুজনই সুপার ফোর পর্বে আস্থার প্রতিদান দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর ফাইনালে আচমকাই মিরাজকে লিটনের সঙ্গী হিসেবে ইনিংসের সূচনায় পাঠালেন অধিনায়ক মাশরাফী বিন মুর্ত্তজা। সেদিন ৫৯ বলে ৩২ রান করে আউট হয়েছিলেন মিরাজ। ইনিংসটায় রানের চেয়ে গুরুত্ব পেয়েছিল স্থায়িত্ব। কারণ ২১ ওভারে ১২০ রান এসেছিল উদ্বোধনী জুটিতে, যেখানে আগের ম্যাচগুলোতে প্রথম উইকেটের পতন ঘটছিল দলীয় ১০-২০ রানের ভেতর। এরপর ঘরোয়া টি-টোয়েন্টিতে মাঝে মাঝে ইনিংসের সূচনায় নেমেছেন মিরাজ, সেই সূত্রে টি-টোয়েন্টিতেও তাকে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। যদিও এই ভূমিকায় সফল নন মিরাজ; বরং লোয়ার অর্ডারে ব্যাট হাতে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু সাফল্য তাকে অলরাউন্ডারের তকমা ফিরিয়ে দিয়েছে। গত বছর আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৮১* আর ভারতের বিপক্ষে ১০০* রানের দুটো ম্যাচ জেতানো ইনিংস বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের পর ফের অলরাউন্ডার পরিচয়টা জোরালো করেছে মিরাজের। আর কাল তো ইনিংসের সূচনায় নেমে যেভাবে ব্যাট করলেন, তাতে স্রেফ অলরাউন্ডার নয় পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান তকমাটাই দিয়ে দেওয়া যায় তাকে।
ম্যাচের দ্বিতীয় ওভারেই অফস্পিনার মুজিব-উর-রহমানকে আক্রমণে এনেছিল আফগানিস্তান, আগের ম্যাচে মাহেশ থিকশানার সাফল্য দেখেই হয়তো। মিরাজ শুরুর সময়টা তাকে সামলেছেন। শুরুতে ধীরস্থির, প্রথম বাউন্ডারিটা মারলেন নিজের খেলা ১৭তম ডেলিভারিতে। ফজল হক ফারুকির স্লোয়ারে কাভার ড্রাইভে। আস্তে আস্তে ইনিংসটা বড় করেছেন, গুরুত্ব দিয়েছেন জুটি গড়ার পেছনে। নাঈম এবং তাওহীদ চার বলের ভেতর বিদায় নিলেও মাথা গরম করেননি মিরাজ; বরং বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের গোড়ার দিক থেকেই যার সঙ্গে সন্ধি, সেই নাজমুল হোসেন শান্তর সঙ্গে জুটি বেঁধে পুরো ফায়দা নিয়েছেন লাহোরের ব্যাটিং স্বর্গের। থিতু হয়ে আস্তে আস্তে হাত খুলেছেন। অপেক্ষা করেছেন আফগান বোলিংয়ের দুর্বল অংশের জন্য। চোখ সয়ে আসার পর তুলেছেন ফায়দা। ১১৫ বলে ৬ বাউন্ডারি আর ২ ছক্কায় তুলে নিয়েছেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় শতক। ভারতের বিপক্ষে শতকটা ছিল আটে নেমে, আর দ্বিতীয়টি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে।
দুই ইনিংসের মাঝবিরতিতে সম্প্রচার সংস্থার উদ্যোগে আলাপ জুড়েছিলেন ধারাভাষ্যকার অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, দীপ দাসগুপ্ত ও আমির সোহেল। তিনজনই মিরাজের ব্যাটিং সামর্থ্যে বিস্মিত। জিম্বাবুয়ের সাবেক অধিনায়ক ও কিংবদন্তি অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার বলেছেন, ‘মেহেদি (মিরাজ) খুবই স্মার্ট একজন ক্রিকেটার, সে তার স্মার্টনেসের সবটুকু ব্যাটিংয়ে কাজে লাগিয়েছে।’ দুই ইনিংসের মাঝে নাজমুল হোসেন শান্তও বললেন, ‘তামিম এবং লিটনের মতো নিয়মিত উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানরা না থাকায় তাকে (মিরাজ) ইনিংসের সূচনায় পাঠানো হয়। কাজটা সহজ ছিল না, সে দারুণ ব্যাট করেছে।’ দুজনের জুটি চলার মাঝেও মাঠের স্টাম্প মাইকে শোনা গেছে ক্র্যাম্পে আক্রান্ত শান্তকে মিরাজ উদ্বুদ্ধ করছেন, ‘আমার কষ্ট হচ্ছে, তবু আমি খেলতেছি সময় নিয়ে’।
শান্তর শতক উদযাপনের ১ রান আগেই মিরাজ মাঠ ছাড়েন, মুজিব উর রহমানের বলে ছক্কা মারার পরই হাতে টান পড়ায় আর ব্যাট করেননি মিরাজ। আসেননি বোলিংয়েও। তবে কাজের কাজটা ঠিক করে দিয়েছেন। নড়বড়ে শুরুর বদলে বলিষ্ঠ একটা আরম্ভ এনে দিয়েছেন বাংলাদেশকে। তাতে বাঁচা-মরার ম্যাচে বাংলাদেশ পেয়েছে বড় পুঁজির দেখা।