বগুড়ার শেরপুরে এক নারী গার্মেন্টস কর্মীকে অপহরণ করে ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনায় অভিযুক্তদের কাছ থেকে ‘শাস্তি’ হিসেবে এক লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছেন গ্রামের প্রভাবশালী কয়েকজন মাতব্বর। পরবর্তীতে জরিমানার সেই টাকা ভুক্তভোগী পরিবারকে না দিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এতে করে ভুক্তভোগী পরিবারের মাঝে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কিন্তু গ্রামের প্রভাবশালী মাতব্বরদের ভয়ে আইনের আশ্রয়ও নিতে পারছেন না তারা। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ‘আমরা গরিব মানুষ। গ্রামের বিচার না মানলে অনেক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।’ এমনকি তাদের গ্রামছাড়া করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের কানাইকান্দর পশ্চিমপাড়া গ্রামের আব্দুল লতিফের মেয়ে জোসনা (২০) (ছদ্মনাম) ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করেন। তিনি ছুটি নিয়ে গত ৩১ আগস্ট রাত আনুমানিক সাড়ে বারোটার দিকে বগুড়ার শেরপুর শহরের ধুনটমোড় টার্মিনালে এসে নামেন। এরপর বাড়ি যাওয়ার জন্য একটি অটোরিক্সায় ওঠেন। এ সময় তার সঙ্গে যাত্রীবেশী আরও চার বখাটেও ওঠেন ওই অটোরিক্সায়।
অটোরিক্সাটি শেরুয়া বটতলা বাজার এলাকায় পৌঁছামাত্রই যাত্রীবেশী বখাটেরা তাকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করা শুরু করে। এসময় শারীরিকভাবেও হেনস্তা করা হয় তাকে। এমনকি অটোরিক্সা থেকে ওই তরুণীকে নামিয়ে হাওয়াখানা নামক স্থানে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক শ্লীলতাহানীর চেষ্টা চালায় তারা। এ সময় তার চিৎকারে পালিয়ে যায় বখাটেরা।
ঘটনার দুদিন পর শনিবার (০২ সেপ্টেম্বর) রাতে ঘটনাটি জানিয়ে ধড়মোকাম গ্রামের আব্দুল মোমিন, ছহির উদ্দিনসহ অজ্ঞাত পরিচয়ের আর দুইজনকে অভিযুক্ত করে শেরপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।
এদিকে অভিযুক্তদের বাঁচাতে গ্রামের প্রভাবশালী তিন-চারজন মাতব্বরসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র মাঠে নামে। এরই ধারাবাহিকতায় ঘরোয়াভাবে গ্রাম্য সালিশ ডেকে অভিযুক্তদের নিকট থেকে এক লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেন তারা। কিন্তু জরিমানার টাকা ভুক্তভোগীর পরিবারকে না দিয়ে তারা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী ওই তরুণীর মা রুবিয়া বেগম অভিযোগ করে বলেন, শুধুমাত্র দুই হাজার টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়ে আমার মেয়েকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আর কোনো টাকা পাইনি আমরা। পাশের গ্রামের প্রভাবশালী মাতব্বর শফি কামাল ও ছহির উদ্দিন এসে তিনশত টাকার স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে গেছেন। এমনকি ঘটনাটি নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করার হুমকিও দিয়ে গেছেন। এতে করে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা। তাই আইনের আশ্রয় নেবেন বলে জানান তিনি।
ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চাইলে অভিযুক্ত শফি কামাল ও ছহির উদ্দিন নিজেদের নির্দোষ দাবি করে সাংবাদিকদের বলেন, তাদের মধ্যে একটু ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল। সেটি সমাধান করে দেওয়া হয়েছে। শ্লীলতাহানীর চেষ্টা বা জরিমানা আদায়ের কোনো ঘটনা ঘটেনি। এসব গুজব বলেও উড়িয়ে দেন তারা।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ফেরদৌস জানান, ‘ঘটনাটি আমি শুনেছি। তবে আপস-মিমাংসার বিষয়ে আমার জানা নেই। থানায় অভিযোগ হয়েছে। আইন অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে অভিযোগ তদন্তকারি কর্মকর্তা শেরপুর থানার উপ পরিদর্শক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘অভিযোগটি তদন্তাধীন রয়েছে। তাই কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’ তবে ভুক্তভোগীর মা দাবি করেছেন, তাকে বিভিন্ন কায়দায় হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। সেটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরবর্তীতে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।