ভারতে ‘জিততে চান’ প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় নির্বাচনের আগে বিদেশিদের, বিশেষ করে পরাশক্তিগুলোর রাজনীতির ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর ‘নজিরবিহীন’ তৎপরতার কারণে সরকারও চাপে আছে।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশের রাজনীতি যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। ভারত ও চীন আপাতত রাজনীতি নিয়ে উল্লেখযোগ্য হস্তক্ষেপ না করলেও যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে আগামী শুক্রবার ভারত সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিতে সফরে যাচ্ছেন তিনি। শুক্রবার সন্ধ্যায় তার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে জি-২০ সম্মেলন।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র বলছে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যেকোনো অবস্থায় প্রতিবেশী ভারতকে পাশে চায় সরকার। শুধু পাশে আছে সেটাই নয়, ভারত বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে আছে এটি প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে চান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সাম্প্রতিককালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সমালোচনা বেড়েছে। অন্যদিকে চীনকে ইস্যু করে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে আড়চোখে দেখছে, এমন দাবি করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন নিজেও। ভারতও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি দৃষ্টি কুঁচকে রেখেছে, এমন তথ্য জানিয়েছেন দলটির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা। তারা মনে করেন, বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের দৃষ্টি কুঁচকে রাখার সময় এখন আর নেই।

আওয়ামী লীগের ওই নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরেই ভারত বিনা শর্তে বাংলাদেশের পাশে থাকবে তা স্পষ্ট করতে সবরকম চেষ্টা করা হবে। ভারত প্রকাশ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে আছে, থাকবে সেই প্রত্যাশা ও প্রস্তুতি নিয়েই প্রধানমন্ত্রী শুক্রবার ঢাকা ত্যাগ করবেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও সংসদ উপনেতা মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে চলি। এখানে নীতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পর্ক ওঠানামা করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার পররাষ্ট্র নীতিতে অবিচল থেকে গত ১৪ বছর দেশ পরিচালনা করে আসছে।’

ভারতকে পাশে পাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্ক ঐতিহাসিক ও পুরনো। যারা সম্পর্কের ওঠানামা নিয়ে কথা বলছেন, তারা হয়তো সম্পর্কের গভীরতার বিষয়ে অবগত নয়।’

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায় থেকে দাবি করা হয়, এ সফর নিয়ে দেশের রাজনীতিতে গত দুই মাস ধরেই আলোচনা চলছে। এ ছাড়া রাজনীতিতে আলোচনা আছে যে, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পরই রাজনীতি ও ক্ষমতার অনেক কিছু স্পষ্ট হবে।

প্রধানমন্ত্রীর দুদিনের ভারত সফরে শুক্রবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকটিকেই গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হচ্ছে। ওই বৈঠকে সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানি, ভারতীয় ঋণ, শুল্ক বাধা ও ভারতীয় পণ্যের শুল্ক বৃদ্ধিসহ নানা এজেন্ডা রয়েছে। এসব ছাপিয়ে বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের পক্ষে না বিপক্ষে সেটা।

আওয়ামী লীগ ও সরকারের একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, নির্ধারিত বৈঠকের আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংক্ষিপ্ত একটি বৈঠক হবে। দ্বিপক্ষীয় সেই বৈঠকে মূলত ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের পক্ষে রাখতে বিশেষ আলোচনা হবে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের অতীত বর্তমান টেনে প্রধানমন্ত্রী ভারতের সমর্থন পেতে চাইবেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র এ প্রতিবেদককে বলেন, যেকোনো পরিস্থিতিতে ভারতকে পক্ষে আনার কর্মকৌশল গ্রহণ করে সফরে যাচ্ছেন টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সূত্র আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষিতেও ভারতের সহযোগিতা চেয়ে আসছে শেখ হাসিনার সরকার। এ চাওয়া কতটা ফলপ্রসূ হবে, সেটাও পরিষ্কার হয়ে যাবে ভারত সফরে।

এদিকে ভারতও মনে করে চীনের পকেটে ঢুকে আছে শেখ হাসিনার সরকার। তা না হলে চীনের রাষ্ট্রদূতকে তিস্তা পরিদর্শনে পাঠানো কেন? চীন থেকে সাবমেরিন কেনার বিষয়টিও ভারত ভালো চোখে নেয়নি। এ ছাড়া চীনের অতিরিক্ত সম্পৃক্ততা ও জামায়াতকে রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আনার ব্যাপারেও ভারত বঙ্গবন্ধুকন্যার সরকারের ওপর বিরাগভাজন হয়েছেন বলে জানা গেছে। সম্পর্কের এই টানাপড়েনের মধ্যে ভারত সরকারের কতটা আস্থা অর্জন করতে পারবেন শেখ হাসিনা, সেটা সামনের দিনগুলোতে আরও পরিষ্কার হবে। তবে ভারতকে পাশে পাবেন, এ ব্যাপারে বড় প্রত্যাশা রয়েছে শেখ হাসিনার।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে এখনো নীরব দর্শকের ভূমিকায় আছে প্রতিবেশী দেশটি। এ নীরবতা ভাঙতে বিশেষ অনুরোধ রাখবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এজন্য দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরবেন তিনি। ভারতকে নিজেদের নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়টি জানিয়ে বাগে আনার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। ভারতের নীরবতা ভাঙাতে প্রয়োজনে তর্কযুদ্ধেও লিপ্ত হবেন শেখ হাসিনা। দুই দেশের আবেগের যে সম্পর্ক রয়েছে, সেখানেও আঘাত করা হবে। মূলত ভারতের নীরবতা ভাঙাতে যত পদক্ষেপ ও যত কৌশল গ্রহণ করার প্রয়োজন পড়ে, সফরে তার সবকিছুই করা হবে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্কে ঘাটতি হয়নি। কখনো কখনো ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে, কিন্তু সম্পর্কে দুই দেশ অবিচল।’