এমপি পদ হারাতে হলো মিষ্টিকে

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৫ এএম

মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার জেরে মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় পদ হারালেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে গতকাল দুপুরে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে তিনি পদত্যাগ করেন। এ ঘটনাকে দখল-চাঁদাবাজি ঠেকাতে সরকারের কঠোর বার্তা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। প্রধামন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক তাকে অপরাধী হিসেবেই গণ্য করতে চায় সরকার। আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়, এমন কর্মকা-ে সম্পৃক্ত কেউ রেহাই পাবে না। মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কোনো শিথিলতা দেখানো হবে না। রাড্ডার ঘটনা তদন্তে মিষ্টির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

এ ঘটনার মধ্যে দিয়ে তারেক রহমানের সরকারের আরেকটি একটি নজির স্থাপন হলো। স্বাধীনতার পরে এত কম সময়ে সরকারপ্রধানের নির্দেশে কোনো সংসদ সদস্যের পদত্যাগের ঘটনা নজিরবিহীন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’র ব্যানারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নাম আসে এমপি মিষ্টির। তিনি বিএনপির প্রয়াত নেতা ও সাবেক এমপি নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ছোট বোন এবং প্রয়াত কাউন্সিলর সাইদুর রহমান নিউটনের স্ত্রী।

ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে সরকার। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারসহ লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার করা হয়। ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা মিরপুরের শাহ আলী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়। অভ্যন্তরীণ তদন্তে মিষ্টির সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তাকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দ্রুত সময়ের মধ্যে পদত্যাগ না করলে তার বিরুদ্ধে দল থেকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি জাতীয় সংসদে গিয়ে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এর অল্প সময়ের মধ্যেই তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, বুধবার রাতেই প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান মিষ্টিকে সংসদ সদস্য পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন।

রাড্ডার ঘটনায় আসামি গ্রেপ্তার, মালামাল উদ্ধার, মিষ্টির পদত্যাগ ও আসন শূন্যসব কিছুতেই সরকারের এত দ্রুত পদক্ষেপের ঘটনা দেশে নজিরবিহীন। গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানিয়েছিলেন, অপরাধের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মিষ্টির পদত্যাগের মাধ্যমে সরকার বার্তা দিল রাজনৈতিক পরিচয়ে কোনো সুরক্ষা মিলবে না। এ ছাড়া এই ঘটনায় বুধবার রাতে বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তর, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। উত্তর বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন মিষ্টি। একই সময়ে দল ও অঙ্গ সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের নির্দেশ, সংসদ সদস্যের পদত্যাগ এবং আসন শূন্য ঘোষণাতিনটি ধাপ একই দিনে। এটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে আরও একটি কারণে। অভিযোগের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই রাজনৈতিক দায় স্বীকার করা। এ বিষয়ে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়। এ ধরনের একটা পদক্ষেপের জন্য জনগণ অপেক্ষা করছিল। দলের জন্য, দেশের জন্য যারা বদনাম নিয়ে আসবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। জনগণের বেশিরভাগই এই সিদ্ধান্তকে অভিনন্দিত করেছে।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী ভালো অ্যাকশন নিয়েছেন। শুধু ওনি পদত্যাগ করলে হবে না। এর পেছনে আর কেউ ছিল কিনা, পুলিশের কি ভূমিকা ছিল, সব আমরা জানতে চাই। তবে যে উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন তা প্রসংশনীয়।’

সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সাধারণত কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত শেষ হওয়ার পর দায় নির্ধারণ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন আসে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তদন্ত চলাকালেই দলীয় ও রাজনৈতিক পর্যায়ে এমপি মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় সরকারের ‘কোনো অপরাধীকে ছাড় নয়’ অবস্থান সামনে এসেছে। তবে মিষ্টির পদত্যাগকে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় তার অপরাধ প্রমাণিত বলে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত শেষ হয়নি। মিষ্টি নিজেও হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বিএনপির সিদ্ধান্ত যেটা হবে, তা হবে : পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে গতকাল বেলা ১টা ৪০ মিনিটে জাতীয় সংসদে স্পিকারের কার্যালয়ে যান এমপি মিষ্টি। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাত করে ৫ মিনিটের মধ্যে তিনি সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে যান। এক প্রশ্নের উত্তরে মিষ্টি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি স্পিকারের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।’ আপনি পদত্যাগ করছেন কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তদন্ত হোক’। পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন কিনা, প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বিএনপির সিদ্ধান্ত যেটা হবে, তা হবে।’

সংরক্ষিত-২৩ আসন শূন্য ঘোষণা : স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে মিষ্টির সাক্ষাতের পর তার পদত্যাগের বিষয়টি বিজ্ঞপ্তি আকারে জানায় সংসদ সচিবালয়। সচিবালয়ের সচিব মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ পদত্যাগ করায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৩২৩ মহিলা আসন-২৩ ১ অক্টোবর শূন্য হয়েছে।’

পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন মিষ্টি : ‘মাননীয় স্পিকার, আমি ফেরদৌসী আহমেদ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য (সংরক্ষিত মহিলা আসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছি। আমি সম্পূর্ণ সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় জাতীয় সংসদের সদস্য (সংরক্ষিত মহিলা আসন-২৩) পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। অতএব, আমার পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করে পদত্যাগ কার্যকর করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আপনার সদয় মর্জি হয়।’

ইসিকে অবহিত করা হবেস্পিকার : এদিকে মিষ্টির পদত্যাগের বিষয়ে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিধান মোতাবেক পদত্যাগ করা মাত্র তার আসনটি শূন্য হয়ে গেছে। আমরা গেজেটের জন্য পাঠিয়েছি। গেজেট হলে নির্বাচন কমিশনকেও জানিয়ে দেব। এক প্রশ্নে স্পিকার বলেন, ‘সংসদের বিধান হলো, এমপিরা যখন পদত্যাগ করেন, তারা কোনো কারণ উল্লেখ করেন না।’

অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থাস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে তদন্তের ভিত্তিতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে এবং দলীয়ভাবেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই দেখছে। কোনো অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এমন কোনো ঘটনার কথা বলা যাবে না। আমরা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য চেষ্টা করছি।’

দীর্ঘদিনের মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধ : ঘটনার পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সামনে আসে। বিশেষ করে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সঙ্গে জায়গাটির সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধ। এই সমিতির সঙ্গে মিষ্টির সম্পর্কের বিষয়টিও প্রকাশ্যে আসে। জানা যায়, ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকার সময় মিষ্টি ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন। এর আগে ২০০৪ সালে রাড্ডা সেন্টারের জায়গাটি সমিতির নামে বরাদ্দ চেয়ে করা একটি আবেদনে তার নাম সভাপতি হিসেবে ছিল। তবে বর্তমানে ওই সমিতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন মিষ্টি। অতীতের এই সাংগঠনিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেটিও তিনি অস্বীকার করেছেন।

দল থেকেও বহিষ্কার হতে পারেন : নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে মিষ্টিকে দল থেকেও পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। অন্যথায় তাকে প্রাথমিকভাবে বহিষ্কার করা হতে পারে। তবে গতকাল রাত ৯টায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার পদত্যাগ বা বহিষ্কারের খবর জানা যায়নি। এ বিষয়ে বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মো. মুনির হোসেন বলেন, তিনি কোনো পদত্যাগপত্র জমা দেননি। তাকে বহিষ্কার করে পত্র দেওয়ার কোনো নির্দেশনাও পাইনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত