‘আমরা জীবনেও ভোট দেই নাই। ভোট ক্যামতে দেয়, হেইয়াও জানি না। হুজুর এই এলাকার নারীগো পর্দা করতে কইছে, ভোট দিতে মানা করছে, হেলিগ্যা আমরা কহনো ভোট দিতে যাই নাই। আমার স্বামী কহনই আমারে ভোট দিতে যাইতে কয় নাই। উল্ডা মানা করছে। না যাইতে যাইতে অহন আর ইচ্ছাও করে না।’
নিজের ভোট দেওয়া নিয়ে বলছিলেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের গৃদকালিন্দিয়া গ্রামের ধনীদার বাড়ির সোলেমান মিয়ার স্ত্রী ষাটোর্ধ্ব খাইরুন্নেছা।
মওদুদুল হাসান জৈনপুরী (র.) নামের এক পীরের উপদেশ মেনে এই ইউনিয়নের নারীরা বাংলাদেশ স্বাধীনের পর থেকে কোনো জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন না। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও তাদের এই মনোভাবের কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। প্রায় ৫০ বছর ধরে এসব নারীকে ভোটকেন্দ্রমুখী করতে দৃশ্যত সরকারি-বেসরকারি তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।
শাশুড়ির মতোই ভোট দেন না পাশর্^বর্তী রূপসা উত্তর ইউনিয়ন থেকে খাইরুন্নেছার ছেলের বউ হয়ে আসা রাবেয়া বেগমও (৩৫)। তিনি বলেন, ‘আমার শ্বশুর-শাশুড়ি আমাকে ভোট দিতে যেতে নিষেধ করেছেন। তবে আমার স্বামী ভোট দিতে যেতে কখনো নিষেধও করেননি, আবার যেতেও বলেননি। যেহেতু এলাকার কোনো নারীই ভোট দিতে যান না, তাই আমিও যাই না।’
খাইরুন্নেছা বলেন, ‘প্রার্থীরা জানে মহিলারা ভোট দেয় না। হেলিগ্যা হেরা আমগো কাছে ভোট চাইতেও আহে না।’ কখনো এই এলাকার নারীদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করতে সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে কাউকে কাজ করতে দেখেননি তিনি।
এ ব্যাপারে ইউনিয়নের গৃদকালিন্দিয়া, কাউনিয়া, চর মান্দারীসহ প্রায় প্রতিটি গ্রামের নারীদের মনোভাব একই রকম লক্ষ করা গেছে। ইউনিয়নের ১৯ হাজার ৯৪৫ জন ভোটারের মধ্যে পুরুষ ১০ হাজার ৪৪৬ আর নারী ৯ হাজার ৪৯৯ জন।
ইউপির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. আমির হোসেন (৬৫) বলেন, প্রায় ৫৫ বছর আগে ইউনিয়নে হঠাৎ একবার কলেরা মহামারী দেখা দেয়। মহামারী থেকে রক্ষা পেতে দোয়ার আয়োজন করা হয়। তখন জনৈক পীর মওদুদুল হাসান জৈনপুরী নারীদের পর্দা মেনে চলার জন্য উপদেশ দেন। ইউনিয়ন ঘুরে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে একই রকম তথ্য জানা গেছে।
গৃদকালিন্দিয়া গ্রামের তাছলিমা বেগমের নাম ২০১৫ সালে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় নির্বাচন, ২০১৯ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন এবং ২০২২ সালে ইউপি নির্বাচন হলেও তিনি ভোট দেননি। তাছলিমা বলেন, ‘আমি কখনো ভোট দেই নাই। আমাদের বাড়ির কোনো নারী ভোট দেয় না, হুজুরের নির্দেশ।’
তাছলিমার বাবা মো. তছলিম বলেন, ‘আমি হুজুরকে দেখেছি। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, এই ইউনিয়নের যেন কোনো মহিলা ভোট দিতে না যায়, সবাই যেন পর্দার মধ্যে থাকে। তার আদেশ মেনে কোনো নারী ভোট দিতে যান না। তাই আমি আমার মেয়েদের কখনো ভোট দিতে যেতে বলিনি, ভবিষ্যতেও বলব না।’
মওদুদুল হাসান জৈনপুরীর (র.) ভাতিজা মাওলানা তারগিব আহমেদ সিদ্দিকী জৈনপুরী বলেন, ‘ধর্ম প্রচার করার জন্য আমার চাচা বড় হুজুর সৌদি আরব থেকে এ দেশে আসেন। তিনি নারীদের পর্দার মধ্যে থাকার জন্য ভোট না দেওয়ার জন্য বলেছিলেন। এখন অনেক কিছু বদল হচ্ছে, নারীরা হাটবাজার করে।’ তার মতে, দেশের আইন অনুযায়ী নারীদেরও ভোট দেওয়ার হক আছে। যার ইচ্ছা ভোট দিতে যেতে পারে।
ইউপির (সংরক্ষিত ওয়ার্ড ১, ২, ৩) সদস্য সাজেদা আক্তার বলেন, ‘নির্বাচনে আমরা নারী সদস্যরাও পুরুষের ভোটে নির্বাচিত হই, যা অত্যন্ত কষ্টের বিষয়। ২০২২ সালে আমি সম্ভবত ৬৫৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হই। এর মধ্যে মাত্র ২০ নারী ভোট দিয়েছেন।’
ইউপি চেয়ারম্যান মো. শরীফ হোসেন বলেন, এই ইউনিয়নের বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, ভিজিএফ কার্ডসহ সরকারের সব সুযোগ-সুবিধায় নারীরা আছেন। বাজার, পোশাক কারখানাসহ সব জায়গায় নারীরা আছেন। শুধু ভোটকেন্দ্রে নেই, এটা দুঃখজনক। তিনি বলেন, ‘আমার নির্বাচনে আমার কেন্দ্রে প্রায় ১০০ নারী ভোট দিয়েছেন। এরা আমার আত্মীয়-স্বজন। আমি তাদের বুঝিয়ে নিয়ে এসেছিলাম। আমি না দাঁড়ালে হয়তো তারাও ভোট দিত না। তবে প্রতিটি নির্বাচনের আগে নারীদের সচেতন করতে সভা-সমাবেশ করা হয়েছে।’
ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি ইসকান্দার আলী বলেন, পীরের নামে গুজব ছড়িয়ে নারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। গেল ইউপি নির্বাচনে কিছু নারী ভোট দিয়েছেন। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে নারীদের ভোট দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান বিল্লাল হোসেন খান বলেন, ‘আমরা সব সময়ই নারীদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করেছি। কিন্তু কিছু স্বার্থান্বেষী মহল নারীদের ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করে আসছে।’
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তোফায়েল হোসেন বলেন, ২০২২ সালে ইউপি নির্বাচনের আগে তারা ওই ইউনিয়নের নারীদের উদ্বুদ্ধ করতে সভা করেছিলেন। কিন্তু তা খুব একটা কাজে আসেনি। ওই নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছিল ৫ হাজার ৫৯৪টি। আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ জন নারী ভোট দিয়েছিলেন। এখানে নারী-পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান।
জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে জেনে নারীদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করব। প্রয়োজনে পুলিশ সুপারকে সঙ্গে নিয়ে তাদের সচেতন করতে আলাদাভাবে সভা করব।’ সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) চাঁদপুরের সভাপতি ডা. পীযূষ কান্তি বড়ুয়া বলেন, কুসংস্কারকে আঁকড়ে রেখে এখানকার নারীরা নাগরিক অধিকার ভোগ করতে পারছেন না। তাদের পিছিয়ে রাখা আমাদের একটি বড় অপরাধ। এই অন্ধকার থেকে নারীদের মুক্তির আলোয় আনা দরকার।