একটার সক্ষমতা আরেকটাকে আক্রান্ত করবে

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক। তিনি বিভিন্ন সময়ে হাতিরঝিল প্রকল্পসহ বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি, বিআরটি, এমআরটি ও সাবওয়ে প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। সম্প্রতি রাজধানীতে চালু হলো এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থার নানা সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে আর ফ্লাইওভারের পার্থক্য কী?

ড. এম শামসুল হক : মোটা দাগে কোনো পার্থক্য নেই। দুটোই এলিভেটেড। উড়ালসড়ক বা ফ্লাইওভার হচ্ছে দ্বিতল রাস্তা, এক্সপ্রেসওয়ে হচ্ছে দোতলা রাস্তা উইথ এক্সপ্রেস কন্ট্রোল সার্ভিস। তবে এক্সপ্রেসওয়ে মাটিতেও হতে পারে। কিন্তু ফ্লাইওভার এবং ওভারপাস সবসময় ওপরে হয়। ফ্লাইওভারের তুলনায় এক্সপ্রেসওয়েতে র‍্যাম্পের সংখ্যা কম থাকে। এক্সপ্রেসওয়ে অনেকটা ছিদ্রহীন পাইপের মতো। একদিক থেকে উঠলে স্বল্প সময়ে অন্যপ্রান্তে পৌঁছে যাবে। এক্সপ্রেসওয়েতে মোটামুটি ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো র‍্যাম্প থাকে না। অর্থাৎ এই ধরনের সড়কে কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই উচ্চগতিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে উল্লেখযোগ্য অংশ পার হয়ে যাওয়া যায়। আর তাই সড়কের মধ্যে এটি সবচেয়ে উচ্চ মানের। এক্সপ্রেসওয়েকে ফ্রিওয়ে বা সুপার হাইওয়ে নামেও ডাকা হয়। সড়কে কোনো মোড় থাকে না, ক্রস মুভমেন্ট, পার্কিং অ্যাকটিভিটি বা পথচারী চলাচল না করার অর্থ হচ্ছে ভালো মানের রাস্তা। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে অনেক র‍্যাম্প থাকার কারণে বাধাও বেশি পড়বে। ফলে এটি ফুল এক্সপ্রেস কন্ট্রোল এক্সপ্রেসওয়ে হবে না।

দেশ রূপান্তর : ঢাকা এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠানামার জন্য মোট ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩১টি র‍্যাম্প রয়েছে। এগুলো দিয়ে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে গাড়ি ওঠাবে ও নামাবে। কিন্তু আপনি তো বললেন এক্সপ্রেসওয়েতে মোটামুটি ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো র‍্যাম্প থাকে না। এতে নতুন করে যানজটের সমস্যা সৃষ্টি করবে না?

ড. এম শামসুল হক : অবশ্যই। যে কোনো শহরে বিশেষ করে যেখানে গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রিণহীনভাবে বেড়ে যায়, গাড়ি বলতে ছোট গাড়ির কথা বলছি তাহলে ওপরের যে ব্রডব্যান্ড কানেকশন আছে সেটা যখন লোকাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার যখন ইন্টারফেসটা হবে, কানেক্টিভিটিটা এস্টাবলিস্ট হবে তখন ডেফিনিটলি একটার সক্ষমতা আরেকটাকে আক্রান্ত করবে। যেসব দেশে, বিশেষ করে উন্নত বিশে^ এক্সপ্রেসওয়েকে যেভাবে বানানো হয় একে বলা হয় ধমনী রোড। যে কোনো বড় আরবান এরিয়াতে এরকম একটা কি দুইটা ধমনী সড়ক থাকে যেটা শহরের বাইরে থেকে এসে শহরের বাইরে চলে যায়। উদ্দেশ্য হলো যে, শহরের ভেতরে যারা কাজ করে তাদের বেশিরভাগ মানুষই লোকাল ট্রাফিক হয়। কিন্তু এটা যদি একটা ক্যাপিটাল সিটি হয় তাহলে এই সিটিতে অন্যান্য জায়গা থেকে মানুষজন আসতে চাইবে এবং শহরটির মানুষজনও অন্যান্য শহরে যেতে চাইবে। তাহলে দূরপাল্লার যে ট্রিপগুলো হবে সেগুলো যেন নিচের রাস্তায় না থাকে সেজন্য এই রোডকে বলা হয় ধমনী সরক। এখানে ট্রিপগুলো লোকাল না, লংট্রিপ। আবার আরবান অ্যাক্টিভিটিকে সাপোর্ট করার জন্য গ্রিন মার্কেট, হোল সেল মার্কেট অথবা শপিং মলের যেসব পণ্য আছে সেগুলো রাতের বেলা দূরপাল্লার রাস্তা দিয়ে এসে নিয়ারবাই জায়গাতে নেমে যাবে। এবং আরবান এরিয়ার হোল সেল অ্যাক্টিভিটি, কনস্ট্রাকশন অ্যাক্টিভিটি, গ্রিন মার্কেটের পণ্য আসার এসব কাজ মিনিমাম ইম্পেক্টে হবে। যেটা আমদের দেশে এলোমেলো। গ্রিন রোডে গেলেই দেখবেন টাইলসের মার্কেট আর দোকানের সামনের রাস্তায় ছোট ছোট ট্রাক সব জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে। আধুনিক শহরের ফুটপ্রিন্ট এটা না। আধুনিক শহরের চাহিদা আছে কিন্তু সেই চাহিদা মেটাতে কোনো পরিকল্পনা নেই।

বিআরটি পুরো পৃথিবীতে একটা সফল দাওয়াই। কিন্তু আমাদের এখানে মন্ত্রীরা এটার নামই শুনতে পারেন না। কেন? কারণ এটা দিয়ে এখানে কোনো কাজই হয় না। কিছুদিন পর শুনবেন মেট্রোর ঘটনাও হিতে বিপরীত হয়েছে। তখন বলবে যে মেট্রো রেল খারাপ। আসলে বিআরটি, মেট্রো এগুলো সবই ভালো। কার বা কাদের হাতে পড়েছে বিষয়গুলো সেটা দেখতে হবে। এবং ঢাকা শহরের নিজস্ব অবস্থাটা কী? ছোট গাড়িকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে নাকি উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে? গণপরিবহন কি বিশৃঙ্খল নাকি শৃঙ্খলার মধ্যে আছে? এসব ব্যবস্থাপনার ওপর আসলে বড় দাওয়াই নির্ভর করে।    

দেশ রূপান্তর : পুরো কাজ শেষ না করে ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করা কি ঠিক হলো? উদ্বোধনের দিন যে তীব্র যানজট দেখা গেল সেটা কি অতিউৎসাহর জন্য নাকি প্রথম দিন থেকেই যানজটের নতুন সংকটের মুখে পড়লাম আমরা?

ড. এম শামসুল হক : প্রথমে যে কোনো ফ্যাসিলিটি আসলে এবং বিশেষ করে রাজনৈতিক স্ট্যান্টের জন্য যেসব উদ্বোধন করা হয় সেখানে কিছু ইমোশনাল ট্রাফিকও থাকে। মানুষজন দেখবে, ব্যবহার করবে যে বিষয়টা কেমন, আবার কিছু ট্রাফিক হবে কম্পেয়ার করতে চায় বলে- তারা দেখবে যে এটার কোনো বেনিফিট পাওয়া যায় কি না। সো প্রথম কিছুদিন যাওয়ার পর মানুষ যখন ওরিয়েন্টেড হয়ে যায় সে বুঝতে পারে অথবা লোকমুখে শুনেও জানতে পারে যে কোন জায়গাটা দিয়ে, কখন বা কীভাবে ব্যবহার করলে বিষয়টি থেকে বেনিফিট পাওয়া যায় তারপরে এর মূল্যায়ন করা যাবে। আমাদের এখানে ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ের পার্শিয়াল উদ্বোধন হয়েছে, মতিঝিলের, কারওয়ানবাজারের র‌্যাম্পও হয়নি। মাঝখানে কিন্তু আরও কতগুলো র‌্যাম্প আছে। এখন যেটা হয়েছে, যারা উত্তরা থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে উঠবেন তারা কিন্তু সবাই চেষ্টা করবেন মানিক মিয়া দিয়ে বের হয়ে যেতে। তারমানে কী, মাঝের যে র‌্যাম্পগুলোতে আমার লোডটা ডিস্ট্রিবিউটেড হয়ে যেত সেটা এখন এক জায়গায় এসে জড়ো হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : তাহলে পুরো কাজ শেষ হলে, সব র‌্যাম্প চালু হলে পরিস্থিতি কি বদলাবে মনে করেন?

ড. এম শামসুল হক : হ্যাঁ, একটু ডিস্ট্রিবিউট হবে, যেটা বললাম। কিন্তু পিক আওয়ারে ঢাকার যানজটের কোনো উন্নতি হবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ একমাত্র দাওয়াইয়ে সমস্যা যায় না। ডাক্তার যখন রোগীকে ওষুধ দেন তখন কিন্তু রোগ সারাতে তিনি আরও কতগুলো কথা বলেন। রোগীকে হয়তো হাঁটতে বলবেন, ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম করতে বলতে পারেন, চিনি না খেতে বলতে পারেন ইত্যাদি। তো একদিক দিয়ে মেডিসিন অন্যদিক দিয়ে অ্যাডভাইজারি ট্রিটমেন্ট। সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে রোগীকে সেগুলো সবই মানতে হবে। তো এখন র‌্যাম্পগুলো রাস্তার যেখানে নামবে, সেই জায়গায় যদি ঠিক না থাকে তাহলে এক্সপ্রেসওয়েতে ১০ মিনিটে এসে নিচের রাস্তায় ১ ঘণ্টা বসে থাকা লাগবে। আপনি দেখেন, রাস্তার ক্যাপাসিটির কথা চিন্তা না করে গত কয়েক বছরে যদি ১০ লাখ মোটরসাইকেলের লাইসেন্স দিয়ে দেওয়া হয় তাহলে সমস্যা তো হবেই। রাস্তার ক্যাপাসিটির হিসাবটা আমার নেই। আর এই কমনসেন্স ছাড়া যানবাহনের রেজিস্ট্রেশনগুলো দিয়ে দিচ্ছে। এক্সপ্রেসওয়ে তো দারুণ, ব্রডব্র্যান্ড কানেকশন, কিন্তু নামবে যখন সেই রাস্তার কোনো হিসাব নিকাশ তো তারা করেনি। বাসরুট ফ্র্যাঞ্চাইজের কথাই ধরেন, এটাকে যদি আমরা ইপ্লিমেন্ট করতে না পারি, যেখানে কোনো খরচ লাগে না। সেটাও ভুল পথে আছে।

দেশ রূপান্তর : বাসরুট ফ্র্যাঞ্চাইজের চেষ্টা তো ঢাকার মেয়র দুজন করছেন, অনেক কথাই তো বললেন এ নিয়ে...

ড. এম শামসুল হক : তারা এটা পারবে না তো। তাদের কেউ টেকনিক্যাল লোক না। বোঝার মতো একটা লোকও নেই। বুঝলে এটা ছয় মাসও লাগে না ইমপ্লিমেন্ট করতে।

দেশ রূপান্তর : এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পরিবহন মালিকদের সিন্ডিকেট এসব সমস্যা না?

ড. এম শামসুল হক : আপনি যে দুটি সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের কথা বললেন, সেখানে যদি টেকনিক্যাল লোক থাকতেন আমি জানি তিনি আগে এটার সমাধান করতেন। চ্যালেঞ্জটা কী? এখানে অনেকের স্বার্থ, গোষ্ঠী, পেশিশক্তি, হ্যানা ত্যানা... পরিবহন মালিক সমিতির প্রেসিডেন্ট ভাবছেন আমার তো একটা সংগঠন আছে সেখানে মাত্র পাঁচটা কোম্পানি হয়ে গেলে আমি ইলেকশন করব কার সঙ্গে... ইত্যাদি। একবার ক্ষমতার স্বাদ পেলে কেউ তো আর ছাড়তে চায় না, এটা বোঝাও একটা সক্ষমতার ব্যাপার। বাস মালিকদের কয়েকজন নেতাকে ডেকে নিয়ে সব ছেড়ে দিতে বললে কি তারা ছাড়বে?

দেশ রূপান্তর : উপায় কী?

ড. এম শামসুল হক : এটা তারা পারবে না। এখানে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে হবে। একটা পদ্মা ব্রিজ করতে গিয়ে আপনি ৩০ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে পুনর্বাসন ও কয়েক হাজার হেক্টর জমি অ্যাকোয়ার করেছেন। তার মানে কী? জনগণের সুবিধার জন্য কিছু করতে গেলে আপনাকে কিছু কাজ করতে হয় যা অনেক বড় সিদ্ধান্ত। ঢাকাকেও বসবাসযোগ্য নগরী করতে গেলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আছে। ভাই তোমরা এতদিন এই বিজনেসে আছো এখন ঢাকার যে অবস্থা তা যানজট বলেন আর পল্যুশান বলেন এটা ঠিক করা লাগবে, তোমাদের আমি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। এটা না হলে আপনার সব উন্নয়ন কিন্তু মাঠে মারা যাবে। কাজগুলো সব টেকনিক্যাল। টেকনিক্যালি যখন সমাধান হয়ে যায়, ইমপ্লিমেন্টে যদি কোনো পলিটিক্যাল সাপোর্ট লাগে এ জন্য মন্ত্রীরা, সচিবরা আছেন, আর এজন্যই রাজনীতি আছে। সেদিকে না গিয়ে ফিল্ডে আপনি যদি জোর করে চাপান তাহলে তো হবে না। আগের এক মেয়র বিআরটিএর বাস সার্কুলার করে কী যে হাস্যকর কাজ করলেন। কারণ তার টেকনিক্যাল জ্ঞান নেই। আর যে কোনো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কিছু বেনিফিশিয়ারি থাকে। সেখানে শৃঙ্খলা আনতে গেলেই তারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। হাতিরঝিলের কথাই ধরেন, সেখানে পুলিশের কিন্তু মন বেজার হয়েছে। বাস যদি যত্রতত্র না থামে, যাত্রী না ওঠায়, কেউ যদি আইন না ভাঙে তাহলে পুলিশের কী লাভ? কাজেই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গেলে পরিবহন মালিক, শ্রমিক ছাড়াও অনেকেরই মন বেজার হবে। এখানেই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্ব আসে। এই সরকার যেই ক্ষমতাবান, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে নির্দেশনা দিতে পারেন, সেক্ষেত্রে আমি মনে করি রাজধানীর সড়কের এসব সমস্যা ৬ মাসের মধ্যে সমাধান হতে পারে।