‘টাকা দিলে ছেঁড়া দলিলেও কাজ হবে’

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের বহুরিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অনিয়মই এখন নিয়ম হয়ে গেছে। এখানে টাকার বিনিময়ে কাগজপত্র বৈধ হয় এবং টাকা না দিলে বৈধ কাগজপত্রও গ্রহণ করা হয় না। টাকা ছাড়া কোনো কাজই হয় না ওই অফিসে।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, বহুরিয়া ইউনিয়নের উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা ফরহাদ আলী নিজেকে টাঙ্গাইল জেলা উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তাদের সভাপতি দাবি করে সেবা গ্রহীতাদের বলেন, ‘টাকা দিলে ছেঁড়া দলিলেও কাজ হবে। টাকা না দিলে কাজ হবে না।’ টাকা না পেলে কাগজপত্র নিয়ে আলমারিতে তুলে রাখতে বলেন ওই কর্মকর্তা।   

বহুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফটিক মিয়ার ছেলে কৃষক জুলহাস মিয়া পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমির নামজারি (খারিজ) করতে যান ওই ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। এ জন্য উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা ফরহাদ আলী তার কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি করেন। জুলহাস ১০ হাজার টাকা দিতে চাইলে ফরহাদ আলী দাবিকৃত ৩০ হাজার টাকার কমে খারিজের আবেদন গ্রহণ করেননি। ওই উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তাকে বারবার অনুরোধ করলেও তিনি আবেদন গ্রহণ করেননি। এ সময় তিনি ৩০ হাজার টাকা দিলে খারিজ হবে, না দিলে কাগজপত্র নিয়ে আলমারিতে তুলে রাখার পরামর্শ দেন। এ ছাড়া স্যারদের নাকি টাকা দিতে হয়। তা ছাড়া সভাপতি হিসেবে তিনি যেভাবে করে দেবেন সেটাই টাঙ্গাইল জেলার নিয়ম বলে ওই কর্মকর্তা জুলহাস মিয়াকে সাফ জানিয়ে দেন।    

কামারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ভ্যানচালক তারা মিয়া বলেন, তার দুই শতাংশ বসতবাড়ির নামজারি (খারিজ) করতে গেলে ওই কর্মকর্তা ১০ হাজার টাকা দাবি করে বলেন, টাকা দিলে এক মাসের মধ্যে খারিজ হয়ে যাবে। অনেক কষ্ট করে চাহিদামতো ১০ হাজার টাকা তিনি দেন। কিন্তু অতিরিক্ত আরও কিছু টাকা না দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হন এবং কয়েক মাস পর খারিজ দেন।

এ ছাড়া খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার নামেও ফরহাদ আলী নিরীহ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও জানা গেছে, বহুরিয়া ভূমি অফিসের পশ্চিম পাশে ১৫ শতাংশ জমিতে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বাড়িতে বসবাস করেন আমজাদ সিকদার, আজাবর সিকদার তার ভাতিজা শাকিল সিকদার। কিন্তু বিএস পর্চায় ওই বাড়ির জমি সরকারি খাস সম্পত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা ফরহাদ আলী ও তার স্থানীয় দালাল সানোয়ার হোসেন ও তার বন্ধু আমজাদ হোসেন তাদের কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করেন।

বহুরিয়া ইউনিয়নের গোহাইল বাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ও বহুরিয়া ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কমান্ডার ফজলুল হক ফজলু জানান, টাকা ছাড়া ওই ভূমি অফিসে কোনো কাজ হয় না।

বহুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের তিনবারের সদস্য মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান মিয়া জানান, ওই অফিসের উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তার চিহ্নিত কয়েকজন দালাল রয়েছে। কাগজপত্র ঠিক থাকলেও ‘সঠিক নেই’ বলে দালালদের কাছে পাঠান।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বহুরিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা ফরহাদ আলীর সঙ্গে কথা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, কাগজপত্র সঠিক থাকলে তার অফিসে কোনো টাকা লাগে না। এ ছাড়া তার অফিসে কোনো দালাল নেই বলেও তিনি দাবি করেন।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুচী রানী সাহা বলেন, ওই উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কেউ লিখিত বা মৌখিক কোনো অভিযোগ করেননি। তবে তার নাম ভাঙিয়ে টাকা নেওয়া হয় বলে তিনি শুনেছেন। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।