সোনালি আঁশ পাটের সোনালি ইতিহাস ছিল চাঁদপুরে। নৌপথে যোগাযোগ সুবিধার কারণে ব্রিটিশ আমল থেকে এই অঞ্চলের পাট ব্যবসার সুখ্যাতি ছিল ভারতবর্ষ জুড়ে। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই সোনালি গৌরব আজ অতীত। পাটের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে কৃষকরা প্রতি বছর ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এতে অনেকে পাটচাষ থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ধনপদ্দি গ্রামের কৃষক আবদুল মতিন বকাউল। চলতি মৌসুমে ৪০ গন্ডা জমিতে পাটচাষ করেছেন। পাটের বীজ বোনা থেকে শুরু করে পানিতে জাগ দিয়ে আঁশ বের করা পর্যন্ত গ-াপ্রতি খরচ হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। অথচ গন্ডাপ্রতি পাট বিক্রি করে আয় হয়েছে মাত্র তিন হাজার টাকা।
আবদুল মতিন বলেন, ‘পাটের চাহিদা না থাকায় পাইকারের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হয়। গত দুই বছরের পাট ঘরে পড়ে আছে। দাম না পাওয়ায় বিক্রি করতে পারিনি।’
আবদুল মতিনের মতো জেলায় প্রায় ২৭ হাজার কৃষক পাটচাষ করে লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাটের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না বলে মনে করছেন তারা। প্রতি বছর লোকসান গুনে পাটচাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা।
চাঁদপুরে সবচেয়ে বেশি আবাদ করা হয় দেশি ও তোষা পাট। বাজারে বর্তমানে দেশি পাট বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং তোষা পাট বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকায়।
এদিকে কৃষক পাটচাষে আগ্রহ হারানোয় পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে কৃষি বিভাগ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে জেলায় পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ৪২০ হেক্টর। কিন্তু আবাদ হয়েছে ৪ হাজার ১০৫ হেক্টর। চলতি অর্থবছরে ৪ হাজার ৪২০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে আবাদ হয়েছে ৩ হাজার ৬৯৩ হেক্টর।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষকদের পাটচাষে আগ্রহী করে তুলতে সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ।’
জানা যায়, চাঁদপুর পুরানবাজার ডাকাতিয়া নদীর তীরে ১৯৬২ সালে ডাব্লিউ রহমান ও ১৯৬৩ সালে স্টার আল কায়েদ নামের দুটি জুট মিল গড়ে তোলা হয়। দেশ স্বাধীনের পরে এগুলো জাতীয়করণ করা হলেও ১৯৮৩ সালে আবার প্রাইভেট মালিকানায় হস্তান্তর করা হয়। এ ছাড়া ১৯৯২ সালে মেসার্স হাজীগঞ্জ জুট মিল ও ২০২২ সালে মতলব উত্তর উপজেলায় হাশেম খান ডাইভার্সিফাইড নামে আরও দুটি জুট মিল চালু করা হয়। বর্তমানে একটি মিলও উৎপাদনে নেই।
ডাব্লিউ রহমান জুট মিলের ইনচার্জ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এখানকার পাটকলে উৎপাদিত পাটের বস্তা, চট ও সুতলি দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হতো ভারত, তুরস্ক, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। কিন্তু বাজারে প্লাস্টিকের আধিক্যসহ বিভিন্ন কারণে একে একে বন্ধ হয়ে যায় চারটি মিল। এতে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন অন্তত পাঁচ হাজার শ্রমিক।
জেলা পাট অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চাঁদপুরে বিভিন্ন পণ্যের জন্য পাটের বস্তার চাহিদা রয়েছে ১৮ লাখ ৫ হাজার ৭২০ পিস। বছরে প্রায় ১২ কোটি ৬৩ লাখ ৯৯ হাজার ৩৫০ টাকার বস্তা প্রয়োজন হয়, যা জেলার বাইরে থেকে সংগ্রহ করা হয়।
চাঁদপুর পাট অধিদপ্তরের মুখ্য পরিদর্শক মহিউদ্দিন আহাম্মদ ভূঁঞা বলেন, প্লাস্টিক পণ্য রোধ করার পাশাপাশি পাটের বাজার বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে পাট অধিদপ্তর। দৈনন্দিন জীবনে পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করে পাটের ব্যাগ ব্যবহার করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।