আমদানিতে নানা শর্তারোপ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি বাড়ানোয় দেশের বিদেশি বাণিজ্যের ঘাটতি কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছে ৬৩ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম। গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্য (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, হঠাৎ করে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় গত বছর দেশে ডলারের সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশি বাণিজ্যে বিশেষ করে আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে। এতে ঋণপত্র (এলসি) খোলা অনেকটা কমে যায়। পাশাপাশি কঠোর নজরদারির কারণে অর্থ পাচারও কমে আসে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক দাবি করেছে। এলসিতে কড়াকড়ির কারণে সে সময় ব্যবসায়ীরা বিরোধিতা করলেও ডলার সংকটের এই সময়ে কিছুটা সুফল পেতে শুরু করেছে দেশ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাণিজ্যে ঘাটতি পুরোপুরি কমবে। তবে আমদানি নিয়ন্ত্রণের কারণে দেশে পণ্যের ঘাটতি দেখা দেওয়ার পাশাপাশি রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, বাণিজ্য ঘাটতি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে বিশে্ব পণ্যমূল্য আগের চেয়ে অনেকটা কমেছে। এফএওর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বিশে্ব খাদ্যপণ্যের দাম গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। যদিও ডলারের বিপরীতে টাকার বড় অঙ্কের অবমূল্যায়নের কারণে বাংলাদেশ সেই সুবিধা নিতে পারছে না। উল্টো খাদ্যপণ্যের দাম বেশি হওয়ায় গত আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম মাসে দেশের পণ্য আমদানি হয়েছে ৪৯৯ কোটি মার্কিন ডলার। একই সময়ে রপ্তানি হয়েছে ৪৩৫ কোটি ডলারের পণ্য। এতে ৬৩ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে দেশ। বর্তমান বিনিময় হার হিসাবে দেশীয় মুদ্রায় (প্রতি এক ডলার ১০৯ টাকা ধরে) এর পরিমাণ ৬ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে বাণিজ্যে ঘাটতি ছিল ২১০ কোটি ডলার। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে বাণিজ্যে ঘাটতি কমেছে ৭০ শতাংশ।
শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমা নয়, অর্থবছরের প্রথম মাসে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত রয়েছে। গত জুলাইয়ে ৫৪ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত ছিল এই সূচকে, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময় চলতি হিসাব ঘাটতিতে ছিল ৪৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ বছরের শুরুতে চলতি হিসাবে এখন ইতিবাচক ধারায় রয়েছে।
চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হলো নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। সেই হিসাবে উন্নয়নশীল দেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা ভালো।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে ১৯৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। আগের বছর পাঠিয়েছিলেন ২০৯ কোটি ডলার। রেমিট্যান্স কমেছে ৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
এদিকে, দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) সামান্য বেড়েছে। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে জুলাই মাসে বাংলাদেশ যেখানে ৪৮ ডলারের এফডিআই পেয়েছিল, চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে ৫০ কোটি ডলারে উঠেছে। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে সরাসরি যে বিদেশি বিনিয়োগ আসে তা থেকে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মুনাফার অর্থ নিয়ে যাওয়ার পর যেটা অবশিষ্ট থাকে, সেটাকে নিট এফডিআই বলা হয়। আলোচিত সময়ে নিট বিদেশি বিনিয়োগও বেড়েছে। এ সূচকটি আগের বছরের চেয়ে ৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়ে ১৮ কোটি ডলার হয়েছে। আগের অর্থবছর একই সময়ে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ১৭ কোটি ডলার।
এ ছাড়া আলোচিত সময়ে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক অবস্থা অব্যাহত আছে। অর্থবছরের প্রথম মাসে পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ (নিট) যা এসেছিল তার চেয়ে দদুই লাখ ডলার বেশি প্রত্যাহার হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাইয়ে পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছিল তিন কোটি ডলার।