অরুন্ধতী রায়ের ‘ইউরোপিয়ান এসে প্রাইজ’ জেতার খবরটি পেলাম ঘোষণার (১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩) দিন দুয়েক পরে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনলাইন ভার্সনে পড়লাম ফ্রান্স থেকে দেওয়া খটোমটো নামের এই পুরস্কার ৪৫ বছর ধরে দেওয়া হচ্ছে, এবারেই প্রথম কোনো ভারতীয় লেখক সম্মানজনক এই পুরস্কারটি পেলেন। মূলত আজীবন সম্মাননা কিংবা লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট হিসেবে দেওয়া হলেও পুরস্কার দেওয়ার সময় জুরিরা লেখকের ‘আজাদি : ফ্রিডম ফ্যাসিজম ফিকশন’ শীর্ষক প্রবন্ধ সংকলনের ফরাসি অনুবাদটিকে আমলে নিয়েছেন।
অরুন্ধতী রায়ের লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে তার প্রথম এবং তখন পর্যন্ত একমাত্র উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংসের’ মাধ্যমে। পরবর্তী বিশ বছর তিনি আর কোনো আখ্যান লেখেননি, শুধুই নন-ফিকশন বা প্রবন্ধ লিখেছেন যেগুলো খুব বেশি মনোযোগ দিয়ে আগাপাশতলা পড়া হয়নি। তার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমৌস্ট হ্যাপিনেস’ পড়বার পর আমার মনে হলো যে কাব্যিক ভাষার জাদুতে দ্য গড অব স্মল থিংস আমাদের মোহিত করে রেখেছিল সেটি যেন অনেকটাই উধাও হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ক্ষুরধার ভাষায় বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে প্রবন্ধ রচনা করতে করতে হয়তো তিনি হয়ে উঠেছেন মূলত একজন প্রবন্ধ লেখক এবং অ্যাকটিভিস্ট পরিচয়টিই তার মুখ্য পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চার্লস ভেইলন ফাউন্ডেশন, এই পুরস্কার যারা দিয়ে থাকেন, এই মর্মে মত প্রকাশ করেছেন যে অরুন্ধতী রায়ের প্রবন্ধগুলো আসলে তার জন্য যুদ্ধাস্ত্র। এই সময়ে এসে কোনো লেখক যদি ভাবেন নিজের লেখা দিয়ে তিনি পৃথিবী বদলাতে পারবেন তাহলে তা ভীষণ উদ্ধত, উগ্র এমনকি খানিকটা নির্বোধের মতনও মনে হতে পারে, কিন্তু এই প্রচেষ্টার প্রশংসাই তারা করতে চান।
অরুন্ধতী রায়ের দুটি উপন্যাসের একটিও ভারতের সমসাময়িক রাজনীতির কলুষতা আর ‘বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র’ হিসেবে গর্বের অসারতা দেখাতে ব্যর্থ হয়নি। দ্য গড অব স্মল থিংসে কেরালার কমিউনিস্ট পার্টির এক নেতার চরিত্র ছিল, আজাদি গ্রন্থের এক প্রবন্ধে রায় জানিয়েছেন, তার জন্মস্থানে তাকে অ্যান্টি কমিউনিস্ট তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আবার অন্যদিকে মাওয়িস্ট আন্ডারগ্রাউন্ড দলের গ্রেপ্তারকৃত সদস্যদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত বইপত্রের মধ্যে ‘অরুন্ধতী রয়ের কিছু লেখা পাওয়া গেছে’ বলে এক খবরে প্রকাশ হয়, স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে একটি সংবাদপত্রে ছোট্ট এই খবরটি দেখতে পান লেখক।
প্রথম উপন্যাসে নিম্নবর্নের হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের বিবরণ আধুনিক ভারত রাষ্ট্রের তথাকথিত গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে আহত তো করেছিল বটেই, ভেলুথা নামের পারাভান চরিত্রটির সঙ্গে সিরিয়ান খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নারীর প্রেমের সম্পর্ক দেখানোতে অশালীনতা আর অনৈতিকতার দায়ে মামলা পর্যন্ত করা হয় লেখকের বিরুদ্ধে। আবার দ্বিতীয় উপন্যাসে কাশ্মীরের মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে মুসলিম, চাঁড়াল, হিজড়া, পিতৃপরিচয়হীন শিশু যে কোনো একটি হিসেবে ‘প্রান্তিক’ মানুষদের নিয়ে একটি বিরাট আখ্যান তিনি রচনা করেছেন যা গণতন্ত্রের তেরঙ্গা ঝাণ্ডা ওড়ানো আধুনিক ভারত রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক চরিত্রের স্বরূপ উন্মোচন করে। বিজেপির ‘এক ধর্ম এক রাষ্ট্র’ নীতিকে তিনি এই উপন্যাসের শত্রু হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
আজাদি বইয়ের বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ আসলে তার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপলক্ষে দেওয়া বক্তৃতার লিখিত রূপ। প্রথম প্রবন্ধ ‘ইন হোয়াট ল্যাঙ্গুয়েজ ডাজ দ্য রেইন ফল ওভার টরমেন্টেড সিটিজ?’ শীর্ষক ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি মাতৃভাষার বদলে ইংরেজিতে লেখালেখি করার কারণ জানান। এই প্রবন্ধেই তিনি বলেন যে, একই উৎস থেকে উৎপত্তি হওয়া দুটি ভাষা হিন্দি আর উর্দুর মধ্যে হরফের পার্থক্যজনিত কারণে একটিকে হিন্দুদের অন্যটিকে মুসলমানদের ভাষা হিসেবে ধরে নেওয়া একটি ঐতিহাসিক ভুল। কোনো একটি ভাষাকে নিজের ভাবা কিংবা না ভাবা নিয়ে আরও বহু আলাপই আছে। সঙ্গে একটি চমকপ্রদ তথ্যও তিনি দিলেন। দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমৌস্ট হ্যাপিনেস উপন্যাসের ৪৮টি অনুবাদের মধ্যে দুটি হয়েছে হিন্দি এবং উর্দুতে। লেখক জানালেন উর্দু ভাষায় ভালোবাসা বা প্রেমের জন্য বহু শব্দ থাকলেও যোনির জন্য কোনো শব্দ নেই। ভ্যাজাইনার জন্য লাগসই একটি মাত্র শব্দবন্ধ পাওয়া গেছে আর তা হলো ‘আউরত কা শরমগাহ’ কিংবা নারীর লজ্জাস্থান। নারীর সতীত্বের সঙ্গে সম্ভ্রম বা ইজ্জতকে গুলিয়ে ফেলার প্রবণতা সহজে প্রকাশিত হয় উর্দুর মতন সমৃদ্ধ একটি ভাষায়, নারীর জননাঙ্গের জন্য কোনো সঠিক প্রতিশব্দ না থাকাতে।
‘ইনটিমেশন অব অ্যান এন্ডিং : দ্য রাইজ অ্যান্ড দ্য রাইজ অব দ্য হিন্দু নেশন’ শীর্ষক বক্তৃতায় অরুন্ধতী রায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির কীর্তিকলাপের বিশদ বর্ণনা এবং তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, যা আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ নামের মিলিট্যান্ট সংগঠনটির মাধ্যমে শুরু হয়েছিল, তার মতাদর্শিক জায়গাটি বিশ্লেষণ করে দেখান। তার বিশ্লেষণে উঠে আসে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হলে কী কী বিপদ কোন কোন দিক থেকে ঘনিয়ে আসবে। তার দ্বিতীয় উপন্যাসের মূল উপজীব্য আসলে এটিই।
‘দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অব লিটারেচার’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বলেন হায়দ্রাবাদের এক কলেজে বক্তৃতা দিতে গিয়ে দেখা হওয়া এক অধ্যাপক তাকে উপদেশ দিয়েছিলেন যে, ফিকশন লিখে আর সময় নষ্ট করবার দরকার নেই, রাজনৈতিক লেখাপত্রের দিকেই বরং তার বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। আবার পাশে বসা এক সাহিত্যের অধ্যাপক কানে কানে বলেন, ‘আপনি আবার কবে সাহিত্যে ফেরত যাবেন? ওটাই আপনার সত্যিকারের স্থান, বাদবাকি যা লিখছেন সেগুলো কেবল সাময়িকভাবে গুরুত্বপূর্ণ’। দুই অধ্যাপকের পরস্পরবিরোধী উপদেশ শুনে রায় হাসিমুখে স্মরণ করেন নিজের প্রিয় লেখক জন বার্জারের হাতে লেখা মেসেজ, যাতে তিনি লিখেছিলেন ‘তোমার ফিকশন আর নন-ফিকশন তোমার দুই পায়ের মতন, যা দিয়ে তুমি পৃথিবীর বুকে হাঁটতে পারো’।
আমি নিজে পাঠক হিসেবে নিজের প্রিয় লেখকের প্রবন্ধের জন্য পুরস্কারপ্রাপ্তিতে অত্যন্ত আনন্দিত এবং বার্জারের সঙ্গে একমত। রায়ের প্রবন্ধগুলো ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাপেক্ষে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার উপন্যাসের গুরুত্ব মোটেও কম নয়। মাত্র দুটি উপন্যাসেই তিনি তার দেখা পৃথিবীকে বর্ণনা করেছেন সততা আর দক্ষতার সঙ্গে। কানাডিয়ান লেখক গাই ভ্যান্ডারহেইগের মতে, ‘ইতিহাস আমাদের জানায় কী ঘটেছিল আর রাজনৈতিক উপন্যাস আমাদের জানায় যা ঘটেছিল তাতে মানুষ আসলে কেমন অনুভব করেছিল’। অরুন্ধতী রায়ের উপন্যাসের চরিত্ররা কাল্পনিক। কিন্তু ভারতের নাগরিক প্রান্তিক জনগণ যে জুলুম আর নিপীড়নের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন, তা বাইরে থেকে বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে না দেখে ভেতর থেকে অনুভব করতে চাইলে রায়ের কাল্পনিক চরিত্রদের কাছে আমাদের যেতেই হবে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক
farhanafrommymensingh@gmail.com