সারা দেশে এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন ৮৫০, বৈধ মাত্র ২৭

সারা দেশে প্রায় ৮৫০টি এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) অটোগ্যাস স্টেশন রয়েছে, যেখান থেকে গাড়িতে গ্যাস ভরা হয়। এগুলোর মধ্যে নিবন্ধন ছাড়াই প্রকাশ্যে অন্তত ৮২৩টি স্টেশনে চরম ঝুঁকিপূর্ণভাবে অটোগ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে। বাকি ২৭টির মধ্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) থেকে মাত্র ২১টি নিবন্ধন নিয়েছে। এ ছাড়া ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের সুপারিশ করা হয়েছে। নির্ধারিত ফিস জমা দিলে এদের নিবন্ধন দেওয়া হবে। আরও ১৩টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন চেয়ে কমিশনে আবেদন করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিবন্ধন ছাড়া অটোগ্যাস স্টেশনে মৃত্যুঝুঁকিসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত এসব স্টেশন নিবন্ধনের আওতায় আনা দরকার। জীবনমরণের এ বিষয় নিয়ে হেলাফেলার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে এ খাতের ব্যবসায়ীদের দাবি, নিয়ম মেনেই তারা ব্যবসা করতে চান। কিন্তু নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় নানারকম জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা আর উৎকোচের কারণে ইচ্ছে থাকলেও অনেকেই নিবন্ধন নিতে পারছেন না।

বর্তমানে যানবাহনে এলপিজির ব্যবহার বাড়তে থাকায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেকটা ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরনো পেট্রোলপাম্পের ভেতরে একসঙ্গেই এলপিজি স্টেশন তৈরি করা হচ্ছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বাসাবাড়ি কিংবা বিভিন্ন ভবনের দেয়াল ঘেঁষে কিংবা নিরাপদ দূরত্ব বজায় না রেখেই নির্মিত হয়েছে অসংখ্য স্টেশন। অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণভাবে সিলিন্ডারে এলপিজি ভরা এবং তা পরিবহন করা হচ্ছে। ফলে যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটে মৃত্যুঝুঁকি এবং মূল্যবান সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

বিস্ময় প্রকাশ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সবার চোখের সামনে নিবন্ধন ছাড়া এলপিজি স্টেশন কীভাবে চলে সেটা আমার বোধগম্য নয়। এতগুলো স্টেশন নিবন্ধনবিহীনভাবে গাড়িতে এলপিজি বিক্রি করছে অথচ কেউ দেখছে না। এটা তো সাংঘাতিক ব্যাপার।’ ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই বেশ কিছু শর্ত পূরণের পরই এ ধরনের স্টেশনগুলোর নিবন্ধন দেওয়া হয়। এখানে ছাড় দেওয়া কিংবা হেলাফেলা করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এখানে জীবনমরণের প্রশ্ন রয়েছে। এটা তো একটা বোমার মতো। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যেতে পারে। লাইসেন্স ছাড়া বন্দুক ব্যবহারের চেয়েও ভয়াবহ বিষয় এটি। ফলে বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের খুবই গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার’ যোগ করেন তিনি।

জানতে চাইলে বিইআরসির চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী জ্বালানি হিসেবে যানবাহনে এলপিজির (অটোগ্যাস) ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি এলপিজি স্টেশন স্থাপনের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অটোগ্যাস স্টেশন স্থাপন ও পরিচালনার জন্য বিইআরসি থেকে লাইসেন্স নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা করলে সেটা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ।

তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু ব্যবসায়ী বেআইনিভাবে এলপিজি স্টেশন ও এলপিজি সরবরাহ করছে। দ্রুত লাইসেন্স গ্রহণের জন্য সম্প্রতি বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনকে চিঠি দিয়েছি। একই সঙ্গে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য স্টেশনগুলোতে এলপিজি সরবরাহকারী অপারেটরদেরও চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সবাই নিবন্ধনের আওতায় আসবেন। এরপরও যদি কেউ নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা করেন তাহলে তার বিরুদ্ধে কমিশন আইনগত ব্যবস্থা নেবে।’

দেশ জুড়ে ঠিক কতগুলো এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন আছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য এবং সদস্য হতে আবেদন করা স্টেশন মিলে বর্তমানে চালু আছে ৭৬৮টি। এর বাইরেও প্রায় ১০০ স্টেশন চালু রয়েছে। তবে সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ সিরাজুল মাওলা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা দেশে প্রায় ৯০০ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন চালু রয়েছে।

তিনি দাবি করেন, ‘নিবন্ধন নিয়েই সবাই ব্যবসা করতে চান। কিন্তু এ নিবন্ধন নিতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। সময় বেশি লাগে। অনেক রকমের বাড়তি খরচও হয়। তাছাড়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের শর্ত পূরণ করাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনেক কঠিন ব্যাপার।’

সিরাজুল মাওলা বলেন, ঝামেলা থেকে রেহাই পেতে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে একটা প্রতিষ্ঠান থেকেই সব প্রক্রিয়া শেষে নিবন্ধন নিতে চান ব্যবসায়ীরা। এজন্য বিভিন্ন সময়ে কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে আবেদনও করা হয়েছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

এলপিজি স্টেশনের জন্য বিইআরসি থেকে নিবন্ধনের জন্য প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্রের পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের অনাপত্তিপত্র, সড়ক ও জনপথ বিভাগের অনাপত্তি/ইজারা চুক্তি, বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও ফায়ারের ছাড়পত্র/লাইসেন্স এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়।

এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, আলাদা আলাদা এসব দপ্তরে ঘোরাঘুরি করতে অনেক সময় চলে যায়। অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানি যেমন করে আবার মোটা অঙ্কের ঘুষও দিতে হয় অসাধু কর্মকর্তাদের। এসব কারণে বেশিরভাগই নিবন্ধন নিতে অনাগ্রহ দেখান।

এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে গত ২৮ মে বিইআরসিকে এ সংক্রান্ত একটি আবেদন করা হয়। এতে বলা হয়, পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করে সরকার এলপিজি ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রায় ২২ রকমের তথ্য ও কাগজপত্রসহ সব ধরনের শর্ত পূরণের পরও বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে আবেদন বাতিল করে দেয়। এ অবস্থায় নিবন্ধনের জন্য ব্যবসায়ীরা বিইআরসিতে আবেদন করবেন। বিইআরসি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় শর্তপূরণের মাধ্যমে নিবন্ধনে সহায়তা করলে তারা উদ্বুদ্ধ হবেন।

এ বিষয়ে বিইআরসির একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারাও ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে কমিশন থেকেই এলপিজি স্টেশনের নিবন্ধন দিতে চান। কিন্তু অন্যান্য যেসব প্রতিষ্ঠান এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত তাদের বেশিরভাগই রাজি নয়। কারণ কেউই নিজেদের কর্তৃত্ব ছাড়তে চায় না। আবার এখানে অবৈধ লেনদেনেরও একটা বিষয় রয়েছে। সরাসরি কমিশনের মাধ্যমে নিবন্ধন দেওয়া হলে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেরই বাড়তি আয় বন্ধ হয়ে যাবে।

বিষয়টি জানতে গত শনিবার টেলিফোনে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক সুলতানা ইয়াসমীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে পাল্টা প্রশ্ন করেন নিবন্ধনবিহীন অটোগ্যাস স্টেশন কি আছে?

আছে জানানো হলে সুলতানা ইয়াসমীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী নিবন্ধন ছাড়া অটোগ্যাস স্টেশন চালু করার কোনো সুযোগ নেই। এরপরও কেউ করলে সেটা আইনত দন্ডনীয়।’

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নিবন্ধন পেতে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের যেসব শর্ত রয়েছে, তা শিথিল করার বিষয়টি নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এখতিয়ার। তারা শর্ত পরিবর্তন করলে আমরাও সেটা পালন করব। তবে এর আগে শর্ত শিথিল করার কোনো সুযোগ নেই।’