গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত টানা বর্ষণের জেরে শুক্রবারও দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা পানিতে ডুবে ছিল। বৃষ্টি হলে রাজধানী ঢাকার এমন জনদুর্ভোগের চিত্র নতুন নয়। বছরের পর বছর এমন দুর্ভোগের সাক্ষী নগরবাসী। অথচ প্রতি বছরই জলাবদ্ধতা নিরসনে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয় সরকার। দুই সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকেও বলা হয় নানা উদ্যোগ গ্রহণের কথা। তবে বর্ষা এলেই ফুরিয়ে যায় এসব গলাবাজি। বেরিয়ে আসে জলাবদ্ধতার নগ্ন চিত্র।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একসময় রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব ছিল ঢাকা ওয়াসার। পরে রাজধানীর সব নালা ও খাল দুই সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে ঢাকা ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থা গত ১২ বছরে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি।
কারণ হিসেবে নদী, খাল-বিলের মতো প্রাকৃতিক জলাশয় দখল ও ভরাটকে দায়ী করছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি তারা দায়ী করছেন অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণকেও। তারা মনে করছেন ঢাকা এখন এমন এক পর্যায়ে এসেছে যেখানে জলাবদ্ধতা পুরোপুরি নিরসন করা সম্ভব নয়। তবে সরকার থেকে নেওয়া প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে কাজ করলে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হবে বলে জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি ড্রেনেজ ব্যবস্থা থেকে শতভাগ সুবিধা পেতে জনগণকেও সচেতন হওয়ার পরামর্শ তাদের।
ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ধারাবাহিকভাবে নগরের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ধ্বংস করা হয়েছে, সবখানে কংক্রিটের ভবন গড়ে উঠেছে। এখন আসলে পরিকল্পনা করে বা প্রকল্প নিয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, ৩০ বছর আগে ঢাকায় দুই হাজারের বেশি পুকুর ছিল, সেগুলো এখন কীভাবে ফিরে পাওয়া যাবে? ঢাকা শহরকে যে অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে এখানে আসলে ভারী বর্ষার পানি নিষ্কাশনের সুযোগ নেই। এটি আসলে আমাদের এতোদিনের পাপের ফসল। এখন টাকা খরচ করে জলাবদ্ধতা সমস্যার পুরোপুরি সমাধান করা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, ড্রেনেজে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ পানি যাবে, বাকিগুলো যাওয়ার কথা ভূগর্ভে বা নদী ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাধারে, কিন্তু এটা হচ্ছে না। পানি নিষ্কাশনের ব্যাপারটি পুরোটাই হয়ে গেছে ড্রেনেজ নির্ভর। প্রকল্পগুলো আইডিয়ালি কাজ করলে সমস্যা একটু হয়তো কমবে, কিন্তু ভারী বর্ষার জলাবদ্ধতা মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতায় যাওয়া আর সম্ভব না।
জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন লেক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, ড্রেন ক্লিনিং এবং খাল পরিষ্কারে পাঁচ কোটি করে মোট ১৫ কোটি টাকা খরচ করবে। এ ছাড়া পাম্প হাউসের যন্ত্রপাতি আধুনিকীকরণ, উন্নয়ন ও ক্রয়বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রেখেছে ৯০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ‘খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি’ নামের প্রকল্পে ব্যয় ধরেছে ২০৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ মনে করেন, বৃহস্পতিবার রাতে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, এত পানি একসঙ্গে নিষ্কাষণের ক্ষমতা ঢাকার নেই। এমন পরিস্থিতির জন্য ঢাকা শহরকে প্রস্তুত করা হয়নি।
এর থেকে উত্তরণের জন্য বিকল্প হিসেবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করার দিকেও মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
এই নগর পরিকল্পনাবিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, পানি সংরক্ষণের জন্য শহরে জলাধার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ছাদে বা বিকল্প উপায়ে পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করার দিকে নজর দিতে হবে। তাহলে এতো দুর্ভোগ হবে না।
তিনি বলেন, শহর যত বড় হয়েছে জলাবদ্ধতার মতো সমস্যা তত বেড়েছে। এখন দ্রুত নিচু এলাকায় পানি জমছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির ধরনে পরিবর্তন হয়েছে। দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ সময় বৃষ্টি হচ্ছে না, আবার হঠাৎ করে কয়েক ঘণ্টা মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। এমন বড় আকারের পানি অল্প সময়ে নিষ্কাশন করার মতো যথেষ্ট ড্রেন বা জলাশয় নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে শহরের রূপান্তর হওয়ার দরকার ছিল, কিন্তু শহরে খাল-বিল ও নানা জলাশয় উজাড় হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অনেকসময় ড্রেন বন্ধ হয়ে থাকে। সেখানে যেমন সিটি কর্পোরেশনের দায় আছে, জনগণেরও দায় আছে। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি দাঁড়ায় এমন যেটি বৃহস্পতিবার রাতে দেখা গেল। এজন্য নিয়মিত ড্রেন ও খাল পরিষ্কার রাখতে হবে, সেই সঙ্গে জনগণকে সচেতন হতে হবে।