কথায় আছে, ‘সবুরে মেওয়া ফলে।’ নাজমুল হোসেন শান্ত যেন এর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট প্রমাণ। তার পেছনে ধৈর্য ধরে লম্বা সময় ব্যয় করার সুফল পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে যে শান্তকে রাখা নিয়ে হয়েছিল প্রচুর সমালোচনা, বছর ঘুরতেই বদলে গেছে হাওয়া। যাকে একসময় মনে করা হতো বাংলাদেশ দলের জন্য অভিশাপ, তাকেই এখন ভাবা হচ্ছে আশীর্বাদ। আসছে বিশ্বকাপে বাঁহাতি এই ব্যাটারই যে বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডারের অন্যতম সেরা অস্ত্র। স্কিলে উন্নতি, খেলার ধরন ও মানসিকতায় পরিবর্তন এনেই নিজেকে নতুনরূপে মেলে ধরছেন শান্ত।
গত বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপের আগে শান্তকে দলে ভাবেননি বেশিরভাগই। কিন্তু তাকে দলে রেখে সবাইকে চমকে দেন নির্বাচকরা, জন্ম দেন আলোচনা-সমালোচনার। আস্থা রাখার প্রতিদান অবশ্য দেন শান্ত। নেদারল্যান্ডস ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে খারাপ করলেও জ্বলে ওঠেন তিনি জিম্বাবুয়ের সঙ্গে। ব্রিসবেনের ওই ম্যাচে উপহার দেন ৫৫ বলে ৭১ রানের ইনিংস। পরে পাকিস্তানের বিপক্ষেও করেন ফিফটি। সেই থেকে যেন তার বদলে যাওয়ার শুরু। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওই ম্যাচের পর থেকে এখন পর্যন্ত শান্ত খেলেছেন ১১ টি-টোয়েন্টি, যেখানে ৩ ফিফটিতে রান ৩২৮, গড় ৪১ ও স্ট্রাইক রেট ১১৬.৭২। এই সংস্করণে এর আগের ১৪ ম্যাচে রান ১৮.৩০ গড়ে তার রান ছিল ২৩৮, স্ট্রাইক রেট ১০৪.৮৪।
ওয়ানডেতেও নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছেন শান্ত। গত এক বছরে এই সংস্করণে ১৭ ম্যাচে ৪৪.৯৩ গড়ে ৭১৯ রান করেছেন তিনি। ক্যারিয়ারের দুটি সেঞ্চুরি ও পাঁচটি ফিফটি এই সময়েই এসেছে তার ব্যাট থেকে। টেস্টে এই সময়ে চার ম্যাচে দুটি সেঞ্চুরি ও এক ফিফটিও পেয়েছেন টপ অর্ডার এই ব্যাটার। নিজের দুর্বলতার জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করেই আজকের এই অবস্থানে এসেছেন শান্ত। একটি অনলাইন পোর্টালের সঙ্গে আলাপচারিতায় নিজের এই বদল নিয়ে ২৫ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার বলেন, ‘২০২২ অক্টোবরের আগে যেটা হয়েছে, পারফর্ম করছিলাম না। কিন্তু আমি স্কিল ও মানসিক দিকগুলোর উন্নতিতে মনোযোগ দিয়েছি। যদিও আমার সময় ভালো কাটছিল না, তবে আমার নিজের ওপর বিশ্বাস ছিল এবং সে অনুসারে কাজ করেছি। নির্দিষ্ট জায়গা নিয়ে কাজ করেছি, এখন আমি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু সাফল্য পেতে শুরু করেছি।’ গত জুলাইয়ে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সাদা বলের সিরিজটা ভালো যায়নি শান্তর। দুই সংস্করণ মিলিয়ে পাঁচ ম্যাচ খেলে ১৫ রান ছুঁতে পারেননি একটিতেও। তবে ব্যর্থতার সেই অধ্যায় দ্রুতও পেছনে ফেলেন শান্ত। নিজেকে মেলে ধরেন এশিয়া কাপের মঞ্চে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৮৯ রানের ইনিংস খেলে বার্তা দেন ছন্দে ফেরার। পরের ম্যাচেই দারুণ এক সেঞ্চুরি করেন তিনি আফগানিস্তানের সঙ্গে।
হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে শান্তর এশিয়া কাপ শেষ হয়ে গেলে, বুকে কাঁপুনি ধরে যায় অনেকেরই। বিশ্বকাপে পাওয়া যাবে তো ফর্মে থাকা ব্যাটারকে, জাগে এমন প্রশ্ন। এই এক বছরে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠেছেন তিনি দলের। ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড সিরিজ দিয়ে আশঙ্কার কালো মেঘ উড়িয়ে দলে ফেরেন শান্ত। সঙ্গে পান নেতৃত্বভার। সব চাপ সামলে ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে অভিষেকে খেলেন বাংলাদেশের সর্বোচ ইনিংস (৭৬)। বিশ্বকাপের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ফিল্ডিং করলেও ব্যাটিং করেননি তিনি। আগামীকাল দ্বিতীয় প্রস্তুতি ম্যাচে শিরোপাধারী ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ।
আফগানিস্তান সিরিজে ব্যর্থতার দায় নিজেকে দিয়ে শান্ত বলেন, কত দ্রুত ছন্দে ফেরা যায় সেটা সবচেয়ে জরুরি। ‘এইসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার অভ্যাস আছে, যেহেতু আমার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটাই ছিল হতাশার। যখন দুই-তিনটা ম্যাচ খারাপ যায়, আমি জানি সেখান থেকে কীভাবে বের হতে হবে। আমি ভুল করেছি, তাই ওই (আফগানিস্তান) সিরিজে রান করতে পারিনি। কোথায় ভুল করেছি সেটা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয়, একজন প্রতি ম্যাচে রান করতে পারবে না, এক-দুইটা ম্যাচে খারাপ খেলতেই পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কত দ্রুত আপনি ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন। কোথায় ঘাটতি আমি কেবল সেসব জায়গায় মনোযোগ দিচ্ছি এবং সে সব নির্দিষ্ট জায়গা নিয়ে কাজ করছি।’ বিশ্বকাপে শান্ত কেমন করেন সেটিই এখন দেখার।