এ যেন গভীর রাতে আরেক অন্ধকার

এ যেন রহস্য রোমাঞ্চ এক গোয়েন্দা উপন্যাস। গভীর রাতে দিল্লি পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের শ দুই শীর্ষ কর্তা গোপনে বসলেন। চূড়ান্ত হলো পরিকল্পনা। পরের দিন কাকভোরে একের পর এক অপারেশন। হানা দেওয়া হতে লাগল বিভিন্ন সমাজকর্মী, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সিপিআইএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরির অফিসে। নিউজ ক্লিক পোর্টালের সাধারণ কর্মী থেকে সম্পাদক প্রবীর পুরকায়স্থ, সিনিয়র জার্নালিস্ট গীতা হরিহরণকে তুলে আনা হলো থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। হানা দেওয়া হলো পরঞ্জয় গুহ ঠাকুরতার বাসায়। আক্রমণ নেমে এলো বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সুহেল হাশমি, সাংবাদিক বর্ষা সিংহের ওপরেও। গান্ধীজয়ন্তীতে বীজ বোনা হলো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের।

শুধু দিল্লি নয়, ‘দেশবিরোধী শক্তি’ রুখতে মুম্বাইয়ে সোশ্যাল অ্যাকটিভিস্ট তিস্তা শেতলবাদের বাড়িতেও ওই একই দিনে, প্রায় রাত থাকতে হানা দিল দিল্লি পুলিশ। শোনা যাচ্ছে অনেকের বিরুদ্ধে কুখ্যাত ইউএপিএ বা দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। সব সাংবাদিক, সমাজকর্মী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। পরিস্থিতি সত্যিই ভয়ংকর। লিখতে লিখতে মনে হচ্ছে, আগামী দিন পুলিশের তালিকায় কার নাম থাকবে! আপনি বা আমি কেউই আজ আর নিরাপদে নেই।

পরিস্থিতি যে ভালো নয়, তা একটু চোখ-কান খোলা রাখলে যে কেউ বুঝতে পারেন। ভারতের গণতান্ত্রিক আবহাওয়া ক্রমেই বদলে যাচ্ছে এটা বোঝা আজকের উন্নত প্রযুক্তির দুনিয়ায়, চেষ্টা করলে যে কেউই, দেশে-বিদেশে জেনে নেওয়া খুব একটা কঠিন কাজ নয়।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তলানিতে পৌঁছাচ্ছে, সেটা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতে ভারতের মিডিয়া স্বাধীনতার সূচক যেভাবে নামছিল তাতে বোঝাই যেত, এই ধস চট করে আটকানো মুশকিল। উত্তর প্রদেশ থেকে মণিপুর প্রতিটি বিজেপি শাসিত রাজ্যে সত্যি কথা লেখা দিনকে দিন কঠিন হয়ে পড়ছিল। গণধর্ষণের মতো মারাত্মক অভিযোগের রিপোর্ট করতে যাওয়ার ‘অপরাধে’ কেরলের সাংবাদিক কাপ্তানকে জেলে পুরে দেওয়ার ঘটনা নিশ্চিত অনেকেই জানেন। এই কয়েক দিন আগে সীমা মুস্তাফার মতো সিনিয়র এক সাংবাদিকের নেতৃত্বে এডিটর গিল্ডের পাঁচ প্রতিনিধি মণিপুরের জাতি-দাঙ্গা নিয়ে ইনভেস্টিগেশন করে ফিরে আসার পথে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে এফআরআই করে। সে যাত্রা বিভিন্ন মহল থেকে প্রবল চেঁচামেচি হওয়ার কারণে তারা নির্বিঘেœই ঘরে ফিরে এসেছিলেন। তবে এখন যে ঘটনা ঘটে চলেছে সারা দিন ধরে, তাতে খোলাখুলিভাবে এটা বলতেই হয়, আমার দেশের সাংবাদিক স্বাধীনতা আক্ষরিক অর্থেই এখন নিতান্তই মিথ।

এই ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক কৌশল নিশ্চিত কোনো কাকতালীয় নয়। হঠাৎ পরিকল্পনাহীনভাবে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি বা ধরপাকড় নিয়ে, আন্তর্জাতিক মহলেও যে অল্প হলেও সরগরম হবে তা বোঝার ক্ষমতা নরেন্দ্র মোদি সরকারের আছে। তবুও তিনি এ কাজটি করছেন, তার দুটো ব্যাখ্যা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে শোনা যাচ্ছে। একে তো সাধারণভাবে যেমন আমরা বলে থাকি যে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা, যা পৃথিবীর সব দেশেই চিরকাল দক্ষিণপন্থি রাজনীতি করে, এ-ও তারই পরম্পরা। বেশ কয়েক বছর ধরেই কিন্তু সরকার এ কাজটি করে চলেছে। বিনোদ দুয়ার মতো অত্যন্ত জনপ্রিয়, ভেটারেন জার্নালিস্ট, তাকেও এর আগে নানাভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। তল্পিবাহক সাংবাদিক ছাড়া সবাইকে ভয় দেখিয়ে শায়েস্তা করার এই প্রবণতা নতুন নয়।

তা ছাড়া, বিরোধী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করাও বিজেপি সরকারের কাছে নতুন নয়। তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে বিরোধী রাজনৈতিক দলকে ভয় দেখাতে তাদের বাড়িতে কেন্দ্রীয় এজেন্সি, সিবিআই, ইডি বা এনআইএকে পাঠানো থেকে সামান্য অজুহাতে রাহুল গান্ধীর মতো নেতাকে সংসদ থেকে বহিষ্কার হেন কোনো দুষ্কর্ম এই সরকারের তালিকায় নেই, যা কয়েক বছর ধরে হয়ে চলেছে।

যত বড় মুখ করে সত্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হোক না কেন, রাহুল গান্ধীর আদানি প্রসঙ্গে মোদি সরকার যে কিঞ্চিৎ চাপে পড়ে যায়, তা বিজেপি নেতাকর্মীদের রাহুলকে নিয়ে কুৎসা বা সংসদে সরকারপক্ষের সদস্যদের শরীরের ভাষা দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। পাশাপাশি, ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই মোদি সরকার যেভাবে তথাকথিত আর্বান নকশাল বলে দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও অধিকার আন্দোলনের নেতাদের জেলে পুরছে তাতে পরিষ্কার, যুক্তিতর্ক নয়, মোদি সরকারের পছন্দ মোসাহেবি বা চাটুকারিতা। দ্বিতীয় যে ঘটনা বা কারণ এই মুখ বন্ধ করার, সেটা আপাত অবিশ্বাস্য মনে হলেও ওয়াকিবহাল মহলে কানাঘুষা যথেষ্ট যে নরেন্দ্র মোদির সরকার ’২৪ সালের নির্বাচনে হারতে চলেছে। ফলে সে মরিয়া চেষ্টা চালাবেই নিজেদের কুর্সি বজায় রাখতে।

গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের সবচেয়ে শক্তিশালী সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা সব ফ্যাসিবাদী দেশেই শাসকদের বৈশিষ্ট্য। ভারতে তো আগেই বলেছি তলানিতে এসে ঠেকেছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারতের স্থান ১৮০ দেশের মধ্যে ১৬১তম। এরপরও যখন শাসকেরা গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে চেঁচান, তখন সত্যিই লজ্জা লাগে। ‘এ কোন সকাল রাতের চেয়েও অন্ধকার’।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক