কোথায় গেলেন সত্য

এ সময়ের তরুণদের সামনে আমরা যখন ঢাকার শিল্প-সংস্কৃতির সোনালী যুগের গল্প বলি; ওদের কাছে খানিকটা যেন অবিশ্বাস্য লাগে; রূপকথার গল্পের মতো মনে হয়। এই রূপকথার রাজকুমারদের আমরা হেঁটে বেড়াতে দেখেছি বর্ধমান হাউজের সামনে সবুজ গালিচায়; তবক দেয়া পানে ঈষৎ লাল ঠোঁট নড়িয়ে আনন্দ-আড্ডা দিতে দেখেছি কত জায়গায়! এরা আপাদমস্তক নিরাপোষ ছিলেন; রাজনৈতিক ছিলেন; সত্যযুগের স্বপ্নে বিভোর মৌলিক মানুষ ছিলেন। তাই বলে এরা কখনো পথে-ঘাটে বিপ্লব ফেরি করেননি; দেশপ্রেমের ঝালমুড়ি বেচেননি উদ্দেশ্যমূলক খ্যাতিবাজারে।

এরা তাদের কবিতায় প্রশ্ন করে বসতেন, তোমার যা বলার ছিল বলছে কি তা বাংলাদেশ? যে বাংলাদেশের স্বপ্ন পুষে নিজ হাতে বিনির্মাণের চেষ্টা করেছেন তারা!

কবি আসাদ চৌধুরী চলে গেলেন; এই ক্লিশে বাক্যটা লিখবো না; কারণ আসাদ চৌধুরী তাঁর কবিতার এই প্রশ্নটা হয়ে ফিরে আসে।

যে যুগে সবাই একটু মেধাবী হলেই সিএসপি হবার স্বপ্ন দেখতেন; আসাদ চৌধুরী তখন খদ্দরের পাঞ্জাবি পরে বাংলা একাডেমির অল্প বেতনের চাকরিটা বেছে নিয়েছিলেন। আসলে তিনি এই কবিতা বাড়িটা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চাননি।

শিশুকালে তাঁকে শিশু একাডেমির জাতীয় প্রতিযোগিতার বক্তৃতা ও বিতর্কের বিচারক হতে দেখে ভাবতাম; বড় হয়ে এই মানুষটির মতো সদাহাস্য হতে হবে। একজন মানুষ এমন বিরক্তিহীন হতে পারেন কী করে! জীবনকে কেঁদে ভাসিয়ে না দিয়ে হেসে উড়িয়ে দেবার ক্ষমতা অর্জন করেন কী করে! একটা শিশুকে এতোটা গুরুত্ব দিয়ে শোনেন বোঝেন; প্রতিযোগিতা শেষে গল্প করেন। একবার তিনি কী মনে করে কানের কাছে ফিস ফিস করে বলে গেলেন, বড্ডড ভালো বলেছো এবারও। প্রত্যেক বছরই দেখা হতো। এ যেন স্নেহের ছায়ায় বড় করার মতো একটা সিনেমাটোগ্রাফি।

পরে সিভিল সার্ভিসে যোগ দিলে জাতীয় বেতারভবনে দেখা হলে, আঞ্চলিক পরিচালক আশফাকুর রহমান খান পরিচয় করিয়ে দেন। নামটা শুনেই চমকে ওঠেন। অনেকক্ষণ হাসেন। কাঁধে পিঠে হাত দিয়ে বলেন, মুখখানা একই রকম আছে! তা আমাদের মতো জীবন পোড়াতে কেন এলে! ব্যাংক-ট্যাংকে চলে যেতে; অনেক বেতন সেখানে।

আমি হেসে বললাম, এই যে জীবনটাকে উদযাপন করলেন, কবিতা লিখলেন, টিভিতে সাহিত্য অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করলেন, শিশু একাডেমিতে আমাদের পরিচর্যা করলেন; প্রত্যেক বছর একুশে বইমেলায় আপনার দরাজ কণ্ঠ শুনে বর্ণমালার ঘুম ভাঙে; এর চেয়ে সাকসেকফুল লাইফ আর কী হয়!

উনি ধরে বসলেন, বাংলা একাডেমির জন্য কিছু অনুবাদ কাজ করে দাও!

আমি তখন নতুন চাকরি, টুকটাক ‘বিষণ্ণতার শহর’-এর বিচূর্ণীভাবনা আর টিভির খ্যাপে ব্যস্ত। উনি একটু অভিমানই করেছিলেন। কিন্তু ঐ যে বিরক্তি তো তাঁর অভিধানে ছিল না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান পতনে একদল লোক আছে যারা আশুরার মতো মাতম করে। কিন্তু আসাদ চৌধুরী হাল ছেড়ে মাতম করার লোক নন।

উনি শহীদদের প্রশ্ন করেন—


‘শেষ কথাটি সুখের ছিল?
ঘৃণার ছিল?
নাকি ক্রোধের,
প্রতিশোধের,
কোনটা ছিল?’

জীবনের একটি দিনও নষ্ট করেননি তিনি বিষাদে। যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ; লড়ে গেছেন জীবনের আনন্দযজ্ঞ রচনায়। অপসংস্কৃতি নিয়ে সেমিনারে কেঁদে ভাসানো কাগুজে ও ভাষণে বাঘ তিনি ছিলেন না। তিনি ছিলেন সংস্কৃতিযোদ্ধা। কোথায় নেই তিনি!

সেই যে ষাটের দশকে শাহবাগ বেতার কেন্দ্রে সোনালী যুগের কবিদের আড্ডা; সেটা শেরে বাংলানগরের জাতীয় বেতার ভবনে ডিকন্সট্রাক্ট করার চেষ্টায় তিনি নিয়মিত আসতেন আমাদের কাছে। কবিতা পাঠ, কথিকা পাঠ, সাহিত্য আলোচনা; অন এয়ারে; অফ এয়ারে; গরম সিঙ্গাড়া চা; আর তারপরে সেই তবক দেয়া পান। উনি এলেই আসর জমে যেত। এই যে আমরা খুব একটা বেশি সম্মানি দিতে পারি না; উনার স্কুটার ভাড়াতেই চলে যায় প্রায় সবটা; কিন্তু এসব গার্হস্থ্য হিসাবের লোক তো তিনি নন। তিনি এলেই আমাদের লবি, অফিস কক্ষ, স্টুডিও হেসে উঠতো। অনুষ্ঠানের পর ওপরের স্টুডিও থেকে সেতারের সুর ভেসে এলে উনি উন্মুখ হতেন। তাঁকে নিয়ে যেতাম সংগীত স্টুডিওতে। তাঁকে দেখেই সংগীত পরিচালক সুজেয় শ্যাম হেসে উঠতেন। উনাদের এই হাসিরা অনেক আনন্দস্মৃতির রোমন্থন। অনেক না বলা কথার মাঝে উঁকি দিতো; কৃষ্ণচূড়া ফোটা সেই আনন্দনগরীর দিনগুলো।

‘কোন ঘাসে ছিল
দুঃখ তোমার
কোন ঘাসে ছিল
প্রেম’

এইসব ম্যাড়মেড়ে দিন, পার্থিব সুখের ইঁদুর দৌড়ের মৃত্যুর শহর ঘেঁষে আসাদ চৌধুরীর এক নিজস্ব শহর ছিল; যে শহরে আক্ষেপ ছিল—

‘আগুন ছিলো মুক্তি সেনার
স্বপ্ন—ঢলের বন্যায়—
প্রতিবাদের প্রবল ঝড়ে
কাঁপছিলো সব—অন্যায়।

এখন এ—সব স্বপ্নকথা
দূরের শোনা গল্প,
তখন সত্যি মানুষ ছিলাম
এখন আছি অল্প।’

আসাদ চৌধুরী একজন মৌলিক মানুষ ছিলেন, সামষ্টিক শিষ্ট সমাজ, সাম্যের আঁজলা ভরা জল, সংকল্পের অদম্য প্রাণ প্রবাহ, জীবন চর্যায় সিম্পল লিভিং হাই থিংকিং-এর জিদের আনন্দ; কখনো কোন ফাপা, বাহিরী চটক, নতুন টাকার জেল্লার কেল্লা তাঁকে আকৃষ্ট করেনি। সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসা ঘর’ ছবির বুড়োটার মতো গ্রীবা উঁচু করে হেঁটে বেড়াতেন সোন্নত সাহসে।

আমি ডয়চে ভেলে কোলনে গেলে; শুনলাম সে অফিসে তাঁর আনন্দস্মৃতিগুলো জমা হয়ে আছে। কবি আসাদ চৌধুরী যেখানে কাজ করেছেন; সেখানেই হয়তো কোন নোট প্যাডের আঁকিবুকিতে লেখা হয়ে আছে—

‘টু উইমেন ছবিটা দেখেছ বারবারা?
গির্জার ধর্ষিতা সোফিয়া লোরেনকে দেখে নিশ্চয়ই কেঁদেছিলে
আমি কাঁদিনি, বুকটা শুধু খাঁ খাঁ করেছিল—
সোফিয়া লোরেনকে পাঠিয়ে দিয়ো বাংলাদেশে
তিরিশ হাজার রমণীর নির্মম অভিজ্ঞতা শুনে
তিনি শিউরে উঠবেন।’

জার্মানিতে আসাদ চৌধুরী যেরকম আসর জমিয়েছিলেন; তাতে নেহাত বাংলাদেশকে গভীরভাবে ভালোবেসে না ফেললে কেউ ফিরে আসার কথা নয়; উদিত দুঃখের ও সেনাশাসনের দেশে।

কিন্তু আসাদের মুক্তিযুদ্ধ তো তাঁর কলম থেকে কোনোদিন বিদায় নেয়নি। কোনোদিন তিনি বিদূষক হয়ে কবিতার অমোঘ অস্ত্র জমা রাখেননি রাজকীয় স্বয়ম্বর সভায়। ঐ যে সত্যযুগের সত্যান্বেষী মানুষ হলে যা হয়; তার কলম বারবার বিব্রত করে মিথ্যার রাজপ্রাসাদকে—

‘কোথায় পালালো সত্য?
দুধের বোতলে, ভাতের হাঁড়িতে! নেই তো
রেস্টুরেন্টে, হোটেলে, সেলুনে,
গ্রন্থাগারের গভীর গন্ধে,
টেলিভিশনে বা সিনেমা, বেতারে,
নৌকার খোলে, সাপের ঝাঁপিতে নেই তো।’

মাঝে মাঝে আক্ষেপ হয়; কোথাও সত্য খুঁজে না পেয়েই কী উনি তাঁর প্রিয় শহর-প্রিয় দেশ ছেড়ে আবার পশ্চিমে চলে গেলেন; নাকি এ কেবলই সন্তানের প্রতি মায়া; যার কাছ থেকে অসংখ্য সময় চুরি করে এই আমাদের দিয়েছিলেন; সেই শিশুকাল থেকে। তাঁর মেয়ে নুসরাতের সঙ্গে কোলনে ডয়চে ভেলেতেই দেখা হয়েছিল। আমি রাতের শিফটে বসে সংবাদ বিশ্লেষণ লিখছিলাম; হঠাতই সে এলো তার বাবার পুরনো অফিস দেখতে; যেখানে ওর শৈশব স্মৃতি মিশে আছে। প্রিয় মানুষের কন্যার মাঝে সেই বাবার বৈশিষ্ট্য; অফুরন্ত প্রাণ প্রবাহ আর হাসি।

আসাদ চৌধুরীর কবিতার বারবারা হেইডেনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ভদ্রমহিলা খুব সম্ভবত আসাদের কাছ থেকে জীবনানন্দ দাশের কবিতা সম্পর্কে জেনেছিলেন। ফ্রাংকফুর্ট বইমেলায় দেখা হলে, উনি ঠিকই জীবনানন্দ দাশ আর আসাদ চৌধুরীর গল্প করেছিলেন। বারবারা কী আসাদ চৌধুরীর কাছ থেকেই বাংলা শিখেছিলেন! আমার তো তাই মনে হয়।

‘বারবারা
ভিয়েতনামের উপর তোমার অনুভূতির তরজমা আমি পড়েছি—
তোমার হৃদয়ের সুবাতাস
আমার গিলে—করা পাঞ্জাবিকে মিছিলে নামিয়েছিল
প্রাচ্যের নির্যাতিত মানুষগুলোরজন্যে অসীম দরদ ছিল সে লেখায়
আমি তোমার ওই একটি লেখাই পড়েছি
আশীর্বাদ করেছিলাম, তোমার সোনার দোয়াত কলম হোক।
আমার বড়ো জানতে ইচ্ছে করে বারবারা, তুমি এখন কেমন আছ?’

আসাদ চৌধুরী সেরকম কবি নন যে উনার মৃত্যুতে অভ্যাসবশত বিলাপ করে আমরা ভুলে যাবো তাঁকে। যত দিন যাবে তাঁর কবিতার শব্দাবলী ফেস্টুনে লেখা শ্লোগান হয়ে হয়ে আমাদের সামনে আসবে। শিশু একাডেমি, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন এমনকি জাতীয় কবিতা উৎসবে এসে সত্যকে আঁতিপাতি করে খুঁজবেন তিনি। সত্যান্বেষীর কী কখনো মৃত্যু হয়!

‘কবিতায় নেই, সঙ্গীতে নেই
রমণীর চারু ভঙ্গিতে নেই
পাগলের গাঢ় প্রলাপেও নেই
নাটকের কোন সংলাপে নেই
শাসনেও নেই, ভাষণে নেই
আঁধারেও নেই, আলোতেও নেই
রেখাতেও নেই, লেখাতেও নেই,
উত্তরে নেই, প্রশ্নেও নেই
লেবাসে নেই, সিলেবাসে নেই
পারমিটে নেই, বোনাসেও নেই
হতাশায় নেই, আশাতেও নেই
প্রেম—প্রীতি ভালবাসাতেও নেই
এমন কি কালোবাজারেও নেই
কোথায় গেলেন সত্য?’