উৎপাদন বাড়ে দামও বাড়ে!

বাংলাদেশে বর্তমানে মাছের চাহিদা ৪২ লাখ টনের কিছু বেশি। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে বছরে তেলাপিয়া উৎপাদিত হয় প্রায় ১৩ লাখ টন। তেলাপিয়ার চাষও সহজ। এই মাছ যেকোনো জলাশয় ও পুকুরে চাষ করা যায়। পুকুরের গভীরতাও যেকোনো ধরনের হতে পারে। খাবারের ক্ষেত্রেও কোনো সমস্যা নেই। যেকোনো ধরনের খাবার খেতে পারে। এই মাছ খেলে তুলনামূলকভাবে রোগ-ব্যাধিও কম হয়। অন্যান্য মাছের চেয়ে এর দাম অনেকটাই কম। যে কারণে বাংলাদেশে তেলাপিয়া মাছের জনপ্রিয়তা বেড়েছে।

অন্যদিকে পাঙ্গাশ মাছও জনপ্রিয় সাধারণের কাছে। পুকুরের চাষ করা পাঙ্গাশ এবং সাগরের পাঙ্গাশ মাছের দামের মধ্যে অনেক তফাৎ। কেউ কেউ বলেন এই দুই ধরনের মাছ হচ্ছে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তের কাছে খুবই জনপ্রিয়। ফলে এই মাছ যে গতিতে চাষ হচ্ছে, ঠিক একই গতিতে ফুরিয়েও যাচ্ছে। চাহিদার এমন প্রাবল্য লক্ষ করে, এখানেও শুরু হয়েছে ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য। দেশের এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে এই ফড়িয়া দল দৌরাত্ম্য প্রদর্শন না করছে। যে কারণে, এখন আর বলার সুযোগ নেই ভাতে-মাছে বাঙালি। শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধিই যে এই সমস্যার সৃষ্টি করেছে, তেমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। এই ফড়িয়া দলসহ বাজারে মাছের দাম বাড়ার আরও কারণ রয়েছে। এ বিষয়ে শনিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘৮৫ টাকা কেজির তেলাপিয়া পাঙ্গাশ বাজারে ২৫০ টাকা’ প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেলাপিয়া ও পাঙ্গাশ উৎপাদনে বর্তমানে তাদের খরচ হচ্ছে ৬৫-৭৫ টাকা। তারা আড়তে বিক্রি করছেন ৭৫-৮৫ টাকা। কিন্তু সেই মাছ খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকায়। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈরী আবহাওয়ার জন্য দুই বছর ধরেই নীরবে মাছ উৎপাদনে ভাটা পড়েছে। কিন্তু মাছের দাম বাড়ার পেছনে বড় কারণ ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য।

এক দশকে বিপুলসংখ্যক মানুষ মাছ চাষে যুক্ত হয়েছে। ফলস্বরূপ স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। এতে প্রতি বছর গড়ে ৪৬ লাখ টন মাছ উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু দেশের একশ্রেণির মানুষ ইলিশ বা রুই, কাতলার মতো দামি মাছ কিনতে পারছে। আর বেশিরভাগ মানুষকেই নির্ভর করতে হয় কমদামি চাষের সিলভার কার্প, পাঙ্গাশ ও তেলাপিয়া কিংবা সাগরের লইট্টা ও অন্যান্য মাছের ওপর।

তবে মূল্যস্ফীতি বাড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষ ভরসার কমদামি সিলভার কার্প, তেলাপিয়া, পাঙ্গাশ বা লইট্টা মাছ কেনার সক্ষমতা হারিয়েছে। এতে করে শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী পর্যাপ্ত আমিষ গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২১-২৩ সময়ে মাছের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। গড়ে সব ধরনের মাছে বেড়েছে ৩৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত। এর মধ্যে কেবল পাঙ্গাশ মাছের দাম বেড়েছে ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ, তেলাপিয়ায় ৬৬ থেকে ৯৮ শতাংশ ও লইট্টা মাছের কেজিতে বেড়েছে ১৩০ শতাংশ। দেশের বাজারে হঠাৎ করে মাছের দাম বৃদ্ধির জন্য বৈরী আবহাওয়া, খাদ্য ও অন্যান্য সরঞ্জামের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করেছেন গবেষকরা। তারা জানাচ্ছেন, সাধারণত এপ্রিল-জুনে বৃষ্টি হলে পানি বাড়ে। এ সময় দেশীয় মাছ খাল-বিলের পানিতে ডিম ছাড়ে ও প্রজনন করে। আর মে-আগস্ট সময়ে মাছের বৃদ্ধি ঘটে। শীতকালে মাছের খুব বেশি বৃদ্ধি হয় না। কিন্তু এ বছর এপ্রিল-জুলাই অনেকটা বৃষ্টিহীন ছিল। খাল-বিলগুলোয় পর্যাপ্ত পানি ছিল না। আবার আগস্ট থেকে যখন বৃষ্টিপাত শুরু হয়, তখন মাছের প্রজনন মৌসুম প্রায় শেষ। এটি যে কেবল চলতি বছর হয়েছে তা নয়। বিশ^জুড়ে প্রাকৃতিক বৈরী পরিস্থিতি চলছে দুই বছর ধরে। ফলে দেশের সামগ্রিক মৎস্য খাত নীরবে ঝুঁকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের দেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে অনেক আগে। সময়ের ব্যবধানে মৎস্য উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৬ গুণ। অনেক শিক্ষিত তরুণ চাকরির দিকে না ঝুঁকে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। ব্যাংকগুলো মাছ চাষে সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে। বাজারে মাছের ব্যাপক চাহিদার কারণে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিও পাচ্ছে। আবার অদ্ভুত কারণে, বাজারে মাছের দামও বাড়ছে। কেন এমনটি হচ্ছে কারণগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের দিকে না গেলে, সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।