সোমবার দুপুরের চেন্নাই-আমেদাবাদ ইন্ডিগো ফ্লাইটের ফ্রন্ট রো-র আইল সিটে বসে থাকতে দেখলাম তাকে। একটু অবাকই হলাম সাধারণ যাত্রীদের ভিড়ে এভাবে দেখে। তিনি শুবমান গিল মধ্যবিত্তের ইন্ডিগোতে কেন? যেখানে শুধুই ইকোনমি ক্লাস। এখনকার দিনে ভারতের হট শট সেলেবদের কেউ একান্ত অনন্যোপায় না হলে ইন্ডিগোতে ট্র্যাভেল করেন না। ভিস্তারা বা এয়ার ইন্ডিয়া নেন। যে ফ্লাইটে বিজনেস ক্লাস আছে। তাছাড়া বিশ্বকাপের মধ্যেও তো একগাদা চার্টার্ড উড়ছে। যেকোনো একটায় উঠে পড়লেই হতো।
আর এত বড় তারকা সোয়া দুই ঘণ্টার ফ্লাইটে সবার সঙ্গে মিশে যাওয়া মানে অনিবার্যভাবে যা হবে। একটু পরপর যাত্রীরা উঠে কথা বলছে। সেলফির জন্য আবেদন করছে। তারকারা এমন সব সময় যে মডেল নেন, চারটে সিট পেছনে বসে দেখছি, ইনি তা-ও নিচ্ছেন না। ফলে দর্শনার্থীর ভিড় এসেই চলেছে। প্রথমে মনে হচ্ছিল ব্যাপারটা উপভোগ করছেন। একটু পর কাছ থেকে মুখচোখ দেখে মনে হলো না। কারণ মুখেচোখে যথেষ্ট উদ্বেগের ছাপ। খুব সহজবোধ্য কারণ ডেঙ্গু আক্রান্ত তিনি আফগানিস্তান ম্যাচও খেলতে পারবেন না। টপ ফর্মে থাকার সময় পরপর দুটো ম্যাচ জীবনের প্রথম বিশ্বকাপে মিস। দুশ্চিন্তা তো হবেই।
মাপ করবেন। ফ্রন্ট রো আইলের যাত্রীর নাম ইচ্ছাকৃত ভুল পরিবেশন করেছি। শুবমন গিল কী করে হবেন? তিনি তো চেন্নাইতে চিকিৎসাধীন এবং বোঝা যাচ্ছে না শনিবার ভারত-পাক ম্যাচের আগে সুস্থ হবেন কি না? ইন্ডিগো ফ্লাইটে যিনি গণ উচ্ছ্বাসের শিকার হচ্ছিলেন তিনি ক্রিকেট খেলে থাকলেও তা জীবজগতের নজরে আসেনি। তিনি ভারতীয় বোর্ড সচিব এবং অলিখিতভাবে বিশ্বকাপ সংগঠন কমিটির মুখ-জয় শাহ। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে জয়কে নিয়ে যা উৎসাহের প্রাবল্য লক্ষ্য করলাম, সেরা ফর্মের জগমোহন ডালমিয়াকে ঘিরেও দেখিনি।
কিন্তু তার মুখ চিন্তাক্লিষ্ট। কাল দুপুরে ভারতীয় ত্রিমুখী স্পিন আক্রমণের সামনে যেমন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের প্রবল অস্বস্তিতে পড়তে হচ্ছিল তিনিও মাত্র পাঁচ দিনে পড়া বিশ্বকাপ উইকেট সামলাতে ক্রমান্বয়ে সমস্যায় পড়ছেন। ভারতীয় বোর্ড ভরা কবিদের মধ্যেও আমিরশাহিতে আইপিএল করে দেখিয়েছে। যা ছিল টার্নিং উইকেটে ডাবল সেঞ্চুরির সমতুল্য। কিন্তু দুর্জনেরা বলছে সেখানে আইএমজি সংগঠনের মূল কাজটা সেরে দিয়েছিল। এবার পুরো দায়িত্বে ভারতীয় বোর্ডের নিজস্ব আমলারাই। সিইও হেমাঙ্গ আমিনের নেতৃত্বে টিম। তারা যে দুর্দান্ত কাজ করছে এমন এক্সক্লুসিভ এখন অবধি কাউকে করতে দেখিনি।
রচিন রবীন্দ্রর কাপ মহাকাশে নতুন তারা হিসেবে আবির্ভাব। বিরাট কোহলির রান চেজে আবার দুর্দান্ত ব্যাটিং। কে এল রাহুলের উইনিং স্ট্রোকের ছয় মেরে হতাশায় বসে পড়া। দক্ষিণ আফ্রিকার রানের পাহাড় তোলা। বাংলাদেশের তামিম-বিতর্ক দূরে সরিয়ে ম্যাচ জেতা। রামধনু ফুটতে শুরু হওয়া উচিত কাপ-আকাশে। কিন্তু ইতিমধ্যে যা প্রতীয়মান তা আর যাই হোক রামধনু নয়। বরং মেঘলা আকাশ। নইলে কেউ ভাবতে পারে যে পাকিস্তান দ্বিতীয় ম্যাচ খেলছে বিশ্বকাপে অথচ তার কোনো মিডিয়া এদেশে আসার ভিসা পায়নি। না ঢুকতে পেরেছে কোনো ফ্যান। বাংলাদেশের সাংবাদিকরা তা-ও শেষ মূহুর্তে টিমের প্রথম ম্যাচের আগে হুড়মুড়িয়ে ধর্মশালা পৌঁছতে পেরেছিলেন। পাকিস্তানি মিডিয়া তো ধরেই নিচ্ছে এই প্রথম বিশ্বকাপের ইতিহাসে ভারত-পাক ম্যাচ তারা মিস করবে।
আমেদাবাদে ঢুকে এখনো বহু প্রতীক্ষিত ম্যাচ নিয়ে চারপাশ তপ্ত হতে দেখছি না। অবশ্যই হবে ভারত পরশু দিন দিল্লিতে আফগানিস্তান ম্যাচ খেলে এখানে এসে পৌঁছলে। কিন্তু সীমান্তের ওপারে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়ে গিয়েছে ভিসা না পাওয়া নিয়ে। করাচি থেকে এদিন নামি পাক সাংবাদিক শাহিদ হাসমি জানালেন, তিনি ভারতীয় ভিসার জন্য ৫৮ দিন আগে আবেদন করে বসে আছেন। তা-ও অফিশিয়াল এআরওয়াই চ্যানেল বলে আবেদন করতে পেরেছেন। বাকিরা তো আবেদনই করতে পারছেন না। পাকিস্তানে ভারতীয় ভিসা পাওয়ার পদ্ধতি হলো নির্দিষ্ট কুরিয়ার কোম্পানির মাধ্যমে পাসপোর্ট দিয়ে ভারতীয় দূতাবাসে আবেদন করতে হয়। দিনসাতেক বাদে পাসপোর্ট ফেরত পাওয়া যায়। এবার কুরিয়ার কোম্পানি পাসপোর্ট গ্রহণই করছে না। কাজেই পাক সাংবাদিকরা ধরে নিচ্ছেন এদিন তাদের বোর্ড চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপ ও ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলা যতই দ্রুত গতিতে ঘটুক, আমেদাবাদের ম্যাচে প্রেস বক্সে বসা বোধ হয় ভাগ্যে নেই। ভিসা পেলেও পরের ম্যাচগুলো কাভার করতে পারবেন।
পাকিস্তান বোর্ড এদিন সাংবাদিক নিরাপত্তা নিয়েও সরকারিভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কাপ ইতিহাসে এটাও নজিরবিহীন। সাধারণ ফ্যানের মনে হবে বিশ্বকাপ তো আর ইসরায়েলে হচ্ছে না যে সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠকদের কাছে নিশ্চয়তা চাওয়া হবে। কিন্তু নামি পাক প্রেজেন্টার জাইনব আব্বাসের ভারত ছাড়ার পর এই উদ্বেগের জন্ম। স্টার স্পোর্টসের হয়ে কাজ করতে ভারতে আসার ভিসা পান জাইনব। কিন্তু এদেশে ঢোকা মাত্র কেউ বা কারা তার বছরছয়েক আগের কাশ্মীর এবং ধর্ম নিয়ে ভারতবিরোধী টুইট নতুন করে তুলে ধরে। তার পরিপ্রেক্ষিতে উত্তেজিত এক রাজনৈতিক ব্যক্তি আদালতে জাইনবের বিরুদ্ধে পিআইএল করার দাবি তোলে। গুজব রটে যায় যে, এর ভিত্তিতে এফআইআর হয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। জাইনবের বিয়ে হয়েছে লাহোরের অভিজাত কারদার পরিবারে। পাকিস্তানের প্রথম ক্রিকেট অধিনায়ক আব্দুল হাফিজ কারদারের নাতির সঙ্গে। তারা বলেন, ঝুটঝামেলায় না থেকে তুমি বরং দেশে ফিরে এসো। শোনা যাচ্ছে আইসিসিও পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে আশঙ্কায় তাকে অ্যাসাইনমেন্ট অসমাপ্ত রেখে ভারত ছাড়ার অনুমতি দেয়।
এমন ঘটনা আজ পর্যন্ত হওয়া এক ডজন বিশ্বকাপে নেই। চেন্নাইতে টিকিট বিক্রি নিয়ে আর এক বিতর্ক। মোট ৩৮ হাজার সিটের পাঁচ হাজার খালি ছিল এমন হাইভোল্টেজ ম্যাচে। বোর্ড সূত্রে বলা হচ্ছে, অনেকে স্পনসর টিকিট নিয়ে লোক পাঠ্যনী। টি সাইটগুলো খালি ছিল, তাই কি? তাহলে সাধারণ মানুষ বুক মাই শোর মাধ্যমে টিকিট কিনতে গিয়ে দুদিনের মধ্যেই অল সোল্ড শুনল কেন? টিকিটগুলো ফের কেন ফ্যানদের কেনার জন্য কাউন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হলো না? ধর্মশালার আউটফিল্ড নিয়ে প্রশ্নের প্রদীপ নিভছে না কেন? কেন আইসিসির পিচ প্রস্তুতকারক অ্যান্ড আটকিন্স আগেই বলেননি, মাঠ খেলার জন্য তৈরি নয়? কে উত্তর দেবে? কেন আমেদাবাদে ঢোকার এখনো অনুমতি পাননি পাকিস্তানের আইসিসি প্রতিনিধি পর্যন্ত?
কাপের ভেতর যে পরিমাণ টার্বুলেন্স প্রথম ক’দিনে ঘটছে তাতে সাকিব বনাম তামিম হাঁদা-ভোঁদার গল্প মনে হচ্ছে না?